সিন্ডিকেটের কারসাজি

প্রান্তিক তাঁতিদের শুল্কমুক্ত কাঁচামাল হরিলুট

করোনা পরিস্থিতিতে টানা লোকসানে ধ্বংসস্তূপ থেকে ঘুরে দাঁড়াতে মহাজনী ঋণ, এনজিওর টাকা ধার নিয়ে পৈতৃক তাঁতের ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন দেশের প্রান্তিক তাঁতিরা। তাদের টিকে থাকার প্রচেষ্টায় সহযোগিতা দিতে বিভিন্ন সময় প্রণোদনা, ঋণ সহায়তা ও শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিয়েছে সরকার। তবে ক্ষুদ্র তাঁতিদের সরলতা ও অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে তাদের বঞ্চিত করে সরকারি সব সহায়তা লুটপাট করে চলেছে বিভিন্ন সিন্ডিকেট। দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে এমনই কয়েকটি সিন্ডিকেটের খোঁজ মিলেছে পাবনার গয়েশপুরে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৯ সালের ১১ এপ্রিল ৯ কোটি ৬৭ লাখ ৫০ হাজার টাকার সুতা ও সোডিয়াম সালফাইডসহ বিভিন্ন কাঁচামাল শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানির অনুমতি পায় পাবনার গয়েশপুর ২নং ওয়ার্ড প্রাথমিক তাঁতি সমিতি। প্রান্তিক তাঁতিদের নামে এসব কাঁচামাল আমদানি হলেও তারা এসবের কিছুই জানতে পারেননি।

সরকারের আমদানি-রপ্তানি বিভাগের অফিস আদেশ থেকে জানা গেছে, চারটি শর্তে তাঁতি সমিতিকে শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রধান শর্তই হলো শুল্কমুক্ত এসব কাঁচামাল সমিতির তাঁতে ব্যবহার করতে হবে। কোথাও বিক্রি বা হাতবদল করা যাবে না। কিন্তু একটি চক্র গয়েশপুর ২নং প্রাথমিক তাঁতি সমিতির সভাপতি নূর ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক আবদুল হাকিমকে সঙ্গে নিয়ে এসব কাঁচামাল আমদানি করে তা অবৈধভাবে বিক্রি করে দিয়েছেন। এতে ওই সমিতির ১৩০ জন প্রান্তিক তাঁতি বঞ্চিত হয়েছেন।

বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৫১টি তাঁতি সমিতির নামে ২০১৮ ও ’১৯ সালে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার কাঁচামাল এলসির মাধ্যমে আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়া হয়। এর মধ্যে প্রায় ৪৫ কোটি টাকার কাঁচামাল আমদানি করা হয় পাবনা জেলার পাঁচটি প্রাথমিক তাঁতি সমিতির নামে। তবে সেখানকার প্রান্তিক তাঁতিরা এর কোনো সুবিধা পাননি।

গয়েশপুর ২নং ওয়ার্ড প্রাথমিক তাঁতি সমিতির সদস্য আনছার আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের সমিতির ১৩০ জন তাঁতির ১ হাজার ২৯০টি তাঁতের বিপরীতে কোটি কোটি টাকার শুল্কমুক্ত সুতা, রং ও রাসায়নিক দ্রব্য আমদানি করা হয়েছে বলে শুনেছি। অথচ আমরা এর কিছুই জানতে পারিনি। সমিতির সভাপতি ও সম্পাদক সাঁথিয়ার ব্যবসায়ী নয়নের মাধ্যমে এগুলো বিক্রি করে টাকা আত্মসাৎ করেছেন। সরকারের শুল্কমুক্ত কাঁচামালের সুবিধার কিছুই আমরা পাইনি।’

সরকারের দেওয়া শুল্কমুক্ত কাঁচামালের সুবিধার কথা কিছুদিন আগে জানতে পেরে সমিতির সভাপতি ও সম্পাদকের কাছে গেলে তারা উল্টো ভাড়াটে গুন্ডা দিয়ে প্রান্তিক তাঁতিদের মারধর করেন জানিয়ে আনছার আলী আরও বলেন, ‘তাঁতিদের জন্য করোনাকালীন প্রণোদনার টাকাও তারা আত্মসাৎ করেছেন। এসবের প্রতিকার দাবিতে আমরা তাঁত বোর্ডে লিখিত অভিযোগের পাশাপাশি মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভা করেছি।’

এ প্রসঙ্গে পাবনা তাঁত বোর্ডের ভারপ্রাপ্ত লিয়াজোঁ অফিসার জাকির হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকার প্রান্তিক তাঁতিদের শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়ে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিলেও তাঁতিদের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে একটি চক্র আমদানি প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে প্রান্তিক তাঁতিরা সুবিধা পাচ্ছেন না।’

অবশ্য অভিযুক্ত গয়েশপুর ২নং ওয়ার্ড প্রাথমিক তাঁত সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবদুল হাকিম সব অভিযোগ মিথ্যা বলে দাবি করছেন। তবে শুল্কমুক্ত সুবিধায় উত্তোলিত কাঁচামাল কী করেছেন তা জানতে চাইলে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি।

দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা গেছে, পাবনায় শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানি করেছে গয়েশপুর ২নং ওয়ার্ড, গয়েশপুর ৩নং ওয়ার্ড, আতাইকুলা ৬নং ওয়ার্ড, দোগাছি ৩নং ওয়ার্ড এবং একদন্ত ইউনিয়ন ৩নং ওয়ার্ড প্রাথমিক তাঁতি সমিতি। এর মধ্যে তিনটি সমিতিতে আমদানি করা শুল্কমুক্ত কাঁচামালের কিছুই পাননি প্রান্তিক তাঁতিরা। সব কাঁচামাল অবৈধভাবে কালোবাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। ওই সমিতিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১২ কোটি ৪৮ লাখ টাকার কাঁচামাল আমদানি করেছে গয়েশপুর ৩নং ওয়ার্ড প্রাথমিক তাঁতি সমিতি। কাঁচামাল না দিয়ে সমিতি থেকে তাঁতিদের প্রত্যেককে এক হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সদস্যরা।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সমিতিটির সভাপতি আইয়ুব হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শুল্ক ছাড়া কাঁচামাল এলসির মাধ্যমে আমদানির সময় এবং অর্থ কোনোটাই নেই প্রান্তিক তাঁতিদের। সাঁথিয়ার একজন ব্যবসায়ী আমাকে এলসির মাধ্যমে আমদানির কথা বলেন। তাঁতিদের লাভের বিষয়টি চিন্তা করেই আমি তার কথায় রাজি হয়ে যাই। সেই ব্যবসায়ী আমদানির পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে লভ্যাংশ হিসেবে ৬ লাখ টাকা দেয়। সেই টাকা আমি সমিতির ৫৫৮ জন সদস্যের প্রত্যেককে এক হাজার টাকা করে করোনাকালীন সহায়তা হিসেবে দিয়েছি।’ তবে সাঁথিয়ার ওই আমদানিকারক ব্যবসায়ীর নাম বলতে রাজি হননি আইয়ুব হোসেন।

একইভাবে আতাইকুলা ৬নং ওয়ার্ড প্রাথমিক তাঁতি সমিতির নামে ৮ কোটি ৩৮ লাখ টাকার কাঁচামাল আমদানি করা হয়েছে। সমিতির ১৭২ সদস্যের কাউকেই কাঁচামাল দেওয়া না হলেও প্রত্যেককে ৭০০ টাকা করে ‘লভ্যাংশ’ হিসেবে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে।

এদিকে শুল্কমুক্ত আমদানি সুবিধা নিয়ে তাঁতিদের বঞ্চিত করার বিষয়টি জানতে পেরে পাবনার ভুক্তভোগী তাঁতিরা তাঁত বোর্ডে লিখিত অভিযোগ করেছেন। অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার কথা জানিয়েছেন বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) কামনাশিষ দাস।

তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তাঁতিদের জন্য সরকারের শুল্কমুক্ত সুবিধা এভাবে হরিলুট হওয়ায় তাঁত বোর্ড ইতিমধ্যে শুল্কমুক্ত আমদানি সুবিধার প্রকল্প বন্ধ করে দিয়েছে। একই সঙ্গে সরাসরি তাঁতিদের কাছে সরকারি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য মন্ত্রণালয় কাজ শুরু করেছে।’