গবেষকদের সতর্কতা

দীর্ঘমেয়াদি করোনায় মৃত্যুর সুনামি সামনে!

দীর্ঘদিন ধরে কভিডের নানা রকম লক্ষণ ছিল শরীরে। টানা ১৩ মাস ধরে একটার পর একটা শারীরিক সমস্যা রীতিমতো যন্ত্রণার কারণ হয়ে উঠেছিল। আর তা থেকে হতাশা, বিষণœতায় আত্মহত্যা করেন যুক্তরাষ্ট্রের চলচ্চিত্র নির্মাতা নিক গুথের স্ত্রী হেইডি ফেরার। হেইডির দেহে করোনার লক্ষণ প্রকাশ পায় গত গ্রীষ্মে। সে সময় তার পায়ে ব্যথা শুরু হয়, শুরু হয় হজমের সমস্যাও। শরীরজুড়ে ছিল তীব্র ব্যথা। চোখে দেখার সমস্যাও শুরু হয় তার। সব মিলিয়ে গত মাসে মৃত্যুর আগপর্যন্ত মাসের পর মাস এই সমস্যাগুলো তাকে সহ্য করতে হয়েছে; যা রীতিমতো মানসিকভাবেও বেশ যন্ত্রণা দিয়েছে।

বিশ^জুড়ে অসংখ্য মানুষ হেইডির মতো করোনা-পরবর্তী জটিলায় ভুগছেন। মেডিকেল স্কুল অ্যাট ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটির ‘মেডিসিন’ বিভাগের সহ-অধ্যাপক ন্যাটালিয়া ল্যামবার্ট বলছেন, ‘মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়া এই ভাইরাসে হয়তো আপনিও আক্রান্ত হয়েছেন, কোনো উপসর্গ আপনার দেখা দেয়নি। তবে অভ্যন্তরীণ ক্ষতি কিছু না কিছু হয়েছেই, যা হয়তো আপনাকে সারা জীবনে বয়ে বেড়াতে হবে। একে আমরা বলছি ‘লং কভিড’ বা দীর্ঘমেয়াদি করোনা।’

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথের পরিচালক ডা. অ্যান্থনি ফাউসি জানান, কভিড আক্রান্তদের ১০ থেকে ৩০ শতাংশ মানুষ দীর্ঘকালীন বিভিন্ন স্বাস্থ্য জটিলতায় ভুগছেন। আর গতকাল যুক্তরাজ্যের এক গবেষণার বরাতে বিবিসি জানিয়েছে, দেশটিতে এখন অন্তত ২০ লাখের মতো মানুষ দীর্ঘমেয়াদি করোনায় আক্রান্ত। ওই গবেষণায় আরও দেখা যায়, করোনা-পরবর্তী এসব জটিলতার কারণে সেরে ওঠার পরেও প্রতি হাজারে অন্তত ২৯ জন করে মানুষের মৃত্যু হচ্ছে।

সম্প্রতি ব্রিটেনে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্র এবং ল্যানসেটে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে দাবি করা হয়েছিল, করোনা সংক্রমণ জটিল হলে তা মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলতে পারে। পাশাপাশি হৃদরোগ, স্মৃতিভ্রমের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।

গত বুধবার সিএনএনের এক প্রতিবেদনের সঙ্গে ভিডিওকলে স্ত্রীর মৃত্যুর আগের নানা রকমের শারীরিক জটিলতার বিষয়ে আলোচনা করেন নিক গুথ। তিনি বলেন, স্নায়বিক সমস্যা শুরু হওয়ার পর থেকেই হেইডি কখনো এক ঘণ্টার বেশি ঘুমাতে পারতেন না বলে জানান নিক। তিনি বলেন, তারা চিকিৎসকদের কাছে এসব সমস্যার সমাধান চেয়েছেন, কেন এমন হচ্ছে তার উত্তর চেয়েছেন; কিন্তু এর বদলে চিকিৎসকরা অন্য সমস্যার দিকে গুরুত্ব দিয়েছেন। ফলে হেইডি যা ভোগ করছিল তা থেকে সে বেরিয়ে আসতে পারেনি। নিক আফসোস করে বলেন, যারা দীর্ঘকালীন করোনার জটিলতায় ভুগছেন, তাদের সমস্যা অনেকেই বুঝতে পারছেন না।

ডা. ল্যামবার্ট জানান, তার কাছে আসা রোগীদের সিংহভাগই প্রচণ্ড অবসাদগ্রস্ত ছিলেন, কোনো কাজের শক্তিই যেন নেই তাদের। সেই তীব্র অবসাদ তাদের ভুগিয়েছে গড়ে প্রায় ৯৯ দিন। গত বছরের জুলাইয়ে নিজের জরিপ, ‘লং হউলার সার্ভে’ প্রকাশ করেন তিনি। এই জরিপে দীর্ঘদিন ধরে করোনায় ভোগা রোগীদের উপসর্গ তাদের জীবনমরণ যুদ্ধের কথা জানিয়েছে। আর অবসাদ ছিল সব উপসর্গের মাঝে সবচেয়ে সাধারণ ঘটনা।

কভিড-১৯ মহামারীর এ পর্যায়ে ভ্যাকসিন ও ভাইরাসের নতুন বৈশিষ্ট্যের দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে বিশ্ব। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কভিড-পরবর্তী জটিলতাসংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ জ্যানেট ডিয়াজ মনে করেন, এগুলোর পাশাপাশি লং কভিডের দিকেও মনোসংযোগ করা প্রয়োজন। ডিয়াজ বলেন, প্রতি ১০ জনে ১ জন আক্রান্তের মধ্যে এক মাস পরও দীর্ঘমেয়াদি উপসর্গ থাকে। তবে কত দিন পর্যন্ত সেই উপসর্গ স্থায়ী হবে, সে সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি; বিশেষ করে বয়স্ক এবং আগে থেকে জটিলতায় ভোগা মানুষরা কভিড-১৯সংক্রান্ত গুরুতর রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে বেশি থাকেন। তবে লং কভিড আক্রান্ত রোগীদের সবার পরিস্থিতিই যে একই রকম হয়, তা নয়। রোগের তীব্রতার মাত্রা বিভিন্ন জনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন রকমের হতে পারে। এমনকি শিশুসহ কম বয়সীদের ক্ষেত্রেও এটা হতে পারে।

ডিয়াজ জানান, অনেকের ক্ষেত্রেই করোনার বেশ কিছু লক্ষণ যেমন ক্লান্তি, শ্বাসকষ্ট, ঘুমের ব্যাঘাত, উদ্বেগ, জ¦র, পেটের সমস্যাসহ বেশ কিছু জটিলতা মাসের পর মাস থেকে যাচ্ছে। করোনা নিয়ে নানা ধরনের গবেষণা চলতে থাকলেও করোনা-পরবর্তী চিকিৎসা বা রোগীর মানসিক অবস্থা নিয়ে এখনো সেভাবে গবেষণা হয়নি। ফলে দীর্ঘকালীন বিভিন্ন শারীরিক জটিলতা একসময় এ ধরনের রোগীকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আর সেটায় মৃত্যু হতে পারে পরিসংখ্যানের বাইরে নীরব সুনামির মতো।