চার বছর পর সচিব সভায় থাকবেন প্রধানমন্ত্রী

নজরে খাদ্য, স্বাস্থ্য, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও অর্থ সচিব

প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে আগামী ৪ জুলাই সচিব সভা অনুষ্ঠিত হবে। ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠেয় ওই সভার এজেন্ডা সচিবদের কাছে পাঠানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে ৪ বছর ২ দিন পর সচিব সভা অনুষ্ঠিত হবে। সরকারপ্রধানের উপস্থিতিতে ২০১৭ সালের ২ জুলাই সর্বশেষ সচিব সভা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর বিভিন্ন সময় সচিব সভা অনুষ্ঠিত হলেও তাতে প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন না।

সচিব সভায় আলোচনার জন্য ৬টি বিষয় নির্ধারণ করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য নেওয়া পদক্ষেপ, কভিড-পরবর্তী উত্তরণ, সরকারি কাজে আর্থিক বিধিবিধান অনুসরণ, প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা এবং বন্যা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা। এ ছাড়া বিবিধ প্রসঙ্গে যেকোনো বিষয়ই আলোচনার টেবিলে জায়গা পেতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সব সচিবই সচিব সভায় উপস্থিত থাকবেন। তাদের মধ্যে অনেকেই বক্তব্য দেবেন। কিন্তু খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, অর্থ বিভাগের সচিবদের ওপর ফোকাস থাকবে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিবকে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, নিরাপদ খাদ্য এবং পুষ্টি বিষয়ে সর্বশেষ অবস্থা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠাতে বলা হয়েছে। একইভাবে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য নেওয়া পদক্ষেপসংক্রান্ত তথ্য স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিবকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আর্থিক বিধিবিধান ও প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো সম্পর্কেও জানাতে বলা হয়েছে সংশ্লিষ্টদের।

সরকারের নীতিনির্ধারকরা গত এক বছরে কভিডের পাশাপাশি খাদ্য নিয়ে সবচেয়ে উদে¦গের মধ্যে ছিলেন। দেশের সরকারি খাদ্য মজুদ তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল। টাকা থাকলেও সরকার সময়মতো চাল ও গমের মতো খাদ্য সামগ্রী কিনতে পারেনি। অভ্যন্তরীণ সংগ্রহ তো হয়ইনি, এমনকি বিদেশ থেকেও পর্যাপ্ত পরিমাণ চাল কিনতে ব্যর্থ হয়েছে খাদ্য অধিদপ্তর। একের পর এক চাল ও গম কেনার টেন্ডার বাতিল হয়েছে। টেন্ডারে অংশ নিয়ে দর চূড়ান্ত করে কার্যাদেশ পাওয়ার পরও অনেক আন্তর্জাতিক সরবরাহকারী চাল ও গম সরবরাহ না করায় তাদের জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। এ অবস্থায় বোরোর বাম্পার ফলন হয় দেশে। সরকার অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে রেকর্ড ৬ লাখ ৫০ হাজার টন ধান ও ১২ লাখ ৩৫ হাজার টন চাল কেনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। ২৩ জুন পর্যন্ত ২ লাখ ২৬ হাজার টন বোরো ধান, ৪ লাখ ৯৫ হাজার টন সেদ্ধ চাল ও ৪০ হাজার টন আতপ চাল সংগ্রহ করেছে। এতে করে গত বারের চেয়ে মজুদ বেড়েছে।

চাল সংগ্রহে ব্যর্থতার বছরে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিবের দায়িত্ব সামলেছেন নাজমানারা খানুম। এই ব্যর্থতার পরও সরকার তাকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছে মূলত তার পরিচ্ছন্ন ইমেজের কারণে। নাজমানারা খানুম বিসিএস ১৯৮৬ ব্যাচের প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা। তিনি দেশের প্রথম নারী বিভাগীয় কমিশনার। এর আগে খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকর দায়িত্ব পালন করেন নাজমানারা খানুম। প্রশাসনের নারী ক্যাডার কর্মকর্তাদের সংগঠন বিসিএস উইমেন নেটওয়ার্কের সভাপতি তিনি।

এদিকে দেশে করোনা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। শনাক্ত ও মৃত্যু দুটোই বাড়ছে। গতকাল শনিবার এক দিনে করোনায় ৭৭  জনের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে ৪ হাজার ৩৩৪ জন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কভিড-১৯সংক্রান্ত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি গত বুধবার সারা দেশে ১৪ দিন সম্পূর্ণ শাটডাউনের সুপারিশ করেছে। তাদের এ সুপারিশেই এক সপ্তাহের কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করার প্রস্তুতি নিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।

করোনা থেকে পুরোপুরি মুক্তির জন্য ৮০ শতাংশের বেশি মানুষকে টিকা দেওয়া প্রয়োজন। যদিও দেশে গত ফেব্রুয়ারিতে গণটিকাদান কর্মসূচি শুরু হলেও এখন পর্যন্ত জনসংখ্যার ৩ শতাংশকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে।

স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, শুরু থেকেই বাংলাদেশ টিকা কেনা নিয়ে জটিলতায় পড়ে গেছে। এ জটিলতায় কিছুটা সরকারি কর্মকর্তারাও দায়ী। মে মাসের শেষ সপ্তাহে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকের পর একজন অতিরিক্ত সচিব করোনার টিকার দাম সাংবাদিকদের কাছে প্রকাশ করায় চীন বিরক্ত হয়েছে। এ নিয়ে চীনের আনুষ্ঠানিক চিঠির জবাবে বাংলাদেশ দুঃখ প্রকাশও করেছে। বিষয়টি সামলে নিয়ে চীন যখন অনেকটা নমনীয় হয়েছিল, সে সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রী গণমাধ্যমে সিনোফামের্র সঙ্গে চুক্তি সইয়ের কথা জানান। এ নিয়েও চীন আবারও বিরক্ত হয়। সরকারি কর্মকর্তাদের কারণে টিকা সংগ্রহে ব্যর্থতার বিষয়টি প্রশাসনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এ ছাড়া করোনাভাইরাস বিস্তার শুরু হওয়ার পর দফায় দফায় সচিব বদল হয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের। শুরুর সময় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব ছিলেন মো. আসাদুল ইসলাম। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কার্যক্রম যথাযথভাবে তদারকি করতে না পারায় তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তার জায়গায় আনা হয় আবদুল মান্নানকে। তিনি এসে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ ঢেলে সাজান। কিন্তু সাফল্য তারও অধরা থেকে যায়। নানা বিতর্কে জড়ালে তাকেও অল্প দিনের মধ্যে সরিয়ে দেওয়া হয়। গত ৪ এপ্রিল সেখানে আনা হয় বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের লোকমান হোসেন মিয়াকে। তিনি চরম পরীক্ষার মধ্য দিয়ে সময় পার করছেন।

ভূমিকম্প, অগ্নিকান্ড, বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতিকেও রাখা হয়েছে সচিব সভার এজেন্ডায়। মে মাসের শেষ সপ্তাহে সিলেটে দফায় দফায় ভূমিকম্প হয়েছে। ২৯ মে সাত দফায় ওই অঞ্চলে ভূমিকম্প হয়েছে। ভূমিকম্প হলে যেন পরিকল্পিতভাবে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা যায়, সে জন্য প্রধানমন্ত্রী বারবার নির্দেশনা দিচ্ছেন।

বর্ষা আসার সঙ্গে সঙ্গেই বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। সারা দেশে বন্যা পরিস্থিতির সার্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ ও তথ্য সংগ্রহের জন্য পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় কন্ট্রোল রুম স্থাপন করেছে। ওই রুম থেকে ২৪ ঘণ্টা বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বন্যা, অগ্নিকা-, নদীভাঙন, ভূমিকম্পসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে সরকার বিভিন্ন ধরনের আর্থিক সহায়তা দিয়ে থাকে। এসব সহায়তা দেওয়া হয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় থেকে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের সচিব পদে রয়েছেন বিসিএস নবম ব্যাচের প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা মো. মহসীন।

২০১৭ সালের ২ জুলাই যে সচিব সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল, সেখানে ২৬ দফা নির্দেশনা দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। এসব নির্দেশনা অনুসরণ করার জন্য তৎকালীন মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম একই বছরের ২৩ জুলাই সব সচিবকে অনুরোধ করে চিঠি পাঠিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার মধ্যে ছিল রপ্তানি আয় ও বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য সমুদ্র, স্থল ও বিমানবন্দরের কার্যক্রম সার্বক্ষণিক চালু রাখা, রাস্তাঘাট নির্মাণের সময় প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ, গ্রামে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাসে প্রকল্পের পেপার ওয়ার্ক শেষ করে শুষ্ক মৌসুমে কাজ শুরু করা, ফাস্টট্রাকভুক্ত প্রকল্পে গুরুত্ব দেওয়া, সরকারি কর্মচারীদের দুর্নীতি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া, অন্তঃক্যাডার বৈষম্য দূর করে ন্যায়সংগত পদোন্নতি নিশ্চিত করা, তরুণ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণে অগ্রাধিকার দেওয়া, আদালতে বিচারাধীন মামলা পরিচালনার জন্য বর্তমান ব্যবস্থার পাশাপাশি অভিজ্ঞ আইনজীবী নিয়োগ করার ব্যবস্থা করা। এসব নির্দেশনার মধ্যে অনেক সিদ্ধান্তই বাস্তবায়ন করেছে সরকারের বিভিন্ন বিভাগ ও মন্ত্রণালয়।