প্রেমের কারণে ঘরছাড়া কিশোরী-তরুণ

সালিশ করতে গিয়ে নিজেই বিয়ে করলেন চেয়ারম্যান

প্রেমের টানে বিয়ে করতে বাড়িছাড়া কিশোরী ও তরুণের বিষয়ে ডাকা সালিশ বৈঠকে পছন্দ হওয়ায় ওই কিশোরীকে ইউপি চেয়ারম্যান নিজেই বিয়ে করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। পটুয়াখালীর বাউফলের কনকদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের বিবাহিত চেয়ারম্যান মো. শাহিন হাওলাদারের (৬০) বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ।

এদিকে সালিশ বৈঠকে এমন বিচার পেয়ে কিশোরীর সঙ্গে পালানো তরুণ (২৫) আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন। তিনি গত শুক্রবার রাত থেকে বাউফল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি আছেন।

ইউপি চেয়ারম্যান শাহিন হাওলাদার ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। তিনি গত ২১ জুন অনুষ্ঠিত ইউপি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তার প্রথম স্ত্রী আছেন। সেই সংসারে তাদের এক ছেলে ও এক মেয়ে আছে। ছেলে বিবাহিত। চেয়ারম্যানের সঙ্গে বিয়ে হওয়া কিশোরী স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী। তার বাবা পেশায় শ্রমিক।

সালিশ বৈঠকে গিয়ে ১৪ বছরের কিশোরীকে ৬০ বছরের একজন ইউপি চেয়ারম্যানের বিয়ের ঘটনায় ফেইসবুকে ও এলাকায় আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠেছে।

এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চেয়ারম্যানের সঙ্গে বিয়ে হওয়া কিশোরীর এক তরুণের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক। বিয়ের উদ্দেশ্যে গত বৃহস্পতিবার রাতে ওই কিশোরী ও তরুণ পরিবারের কাউকে কিছু না জানিয়ে ঘর ছেড়ে পালায়। বিষয়টি কিশোরীর বাবা কনকদিয়া ইউপি চেয়ারম্যান শাহিন হাওলাদারকে জানান। চেয়ারম্যান শাহিন হাওলাদার আনুষ্ঠানিকভাবে ওই কিশোরী ও তরুণকে বিয়ে দেওয়ার কথা বলে দুই পক্ষের পরিবারের সদস্যদের গত শুক্রবার কনকদিয়া ইউপি কার্যালয়ে যেতে বলেন। সে অনুযায়ী শুক্রবার সকাল ৯টার দিকে দুই পরিবারের সদস্যরা ইউপি কার্যালয়ে যান। সেখানে কিশোরীকে দেখে পছন্দ হয়ে যায় চেয়ারম্যানের। তিনি কিশোরীকে বিয়ে করার আগ্রহ দেখান। এমন পরিস্থিতিতে কিশোরীর শ্রমিক বাবাও ওই বিয়েতে সম্মত হন। পরে কাজি ডেকে পাঁচ লাখ টাকা দেনমোহরে কিশোরীকে বিয়ে করেন চেয়ারম্যান শাহিন হাওলাদার। বিয়ের পর কিশোরীকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যান চেয়ারম্যান। তবে তখন বাড়িতে তার প্রথম স্ত্রী ও পরিবারের অন্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন না।

বিয়ের কাবিননামায় কিশোরীর জন্ম-তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে ২০০৩ সালের ১১ এপ্রিল। কিন্তু বিদ্যালয়ে দেওয়া জন্মনিবন্ধন ও পঞ্চম শ্রেণি পাসের সনদ অনুযায়ী ওই কিশোরীর জন্ম-তারিখ ২০০৭ সালের ১১ এপ্রিল।

কিশোরীর সঙ্গে বিয়ের জন্য ঘরছাড়া তরুণের বড় ভাইয়ের দাবি, সালিশ বৈঠকে তারা চেয়ারম্যানের সঙ্গে কিশোরীর বিয়ের প্রস্তাবের প্রতিবাদ জানান। তখন চেয়ারম্যান তাদের হত্যার হুমকি দেন। পরে সাদা কাগজে স্বাক্ষর নিয়ে তাদের দুপুরের দিকে ইউপি কার্যালয় থেকে বের করে দেন চেয়ারম্যান।

এদিকে চেয়ারম্যানের সঙ্গে কিশোরীর বিয়ের খবর শুনে তার সঙ্গে পালানো তরুণ আত্মহত্যার চেষ্টা করেন বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন। ওই তরুণকে অচেতন অবস্থায় শুক্রবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে বাউফল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান গ্রাম পুলিশ মো. ফিরোজ আলম।

গতকাল শনিবার দুপুরে বাউফল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গেলে চিকিৎসাধীন ওই তরুণ বলেন, ‘ওকে (চেয়ারম্যানের সঙ্গে বিয়ে হওয়া কিশোরী) আমার কাছে এনে দেন। আমি ওকে ছাড়া বাঁচব না।’

সালিশ বৈঠকে পছন্দ হওয়ায় কিশোরীকে বিয়ে করার বিষয়ে জানতে চাইলে চেয়ারম্যান শাহিন হাওলাদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মেয়েটিকে দেখে আমার পছন্দ হওয়ায় তাকে বিয়ে করেছি। তিন বছর আগেই দ্বিতীয় বিয়ে করতাম। ইলেকশনের জন্য বিলম্ব হয়েছে।’

তিনি বাল্যবিয়ে করেছেন কি নাএমন প্রশ্নের উত্তরে চেয়ারম্যান বলেন, ‘আপনার ভাবির (কিশোরী) জন্ম-তারিখ ২১ এপ্রিল ২০০৩। তিনি নবম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন। তিন বছর লেখাপড়া বাদ দিয়েছেন। এই বিয়ে নিয়ে আমি লজ্জিত নই, বরং আনন্দিত।’

প্রেমিকার সঙ্গে চেয়ারম্যানের বিয়ের খবরে তরুণের আত্মহত্যাচেষ্টার বিষয়ে জানতে চাইলে বাউফল থানার ওসি আল মামুন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘খবর পেয়ে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পুলিশ পাঠানো হয়েছে ছেলেটির খোঁজ নেওয়ার জন্য। তবে ছেলেটি এখন অনেকটা সুস্থ আছে।’

চেয়ারম্যানের বাল্যবিয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে বাউফল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জাকির হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ইউপি চেয়ারম্যান এমন ঘটনা ঘটিয়ে থাকলে তা সঠিক কাজ হয়নি। এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’