দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর এক দিনে সর্বোচ্চ মৃত্যু হয়েছে শনিবার থেকে রবিবার ২৪ ঘণ্টায়। শুরুর দিকে শহরাঞ্চলে সংক্রমণ বেশি হলেও এখন তা ছড়িয়েছে গ্রামাঞ্চলেও। গ্রাম-মফস্বলে প্রতিদিনই বাড়ছে মৃত্যু আর সংক্রমণ। লকডাউন দিয়েও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। এই অবস্থায় হু হু করে বাড়তে থাকা রোগীদের জন্য শয্যা খালি পাওয়া যাচ্ছে না। শুরুতে কম জটিলতার রোগীরা চিকিৎসা না পেয়ে পড়ছেন মৃত্যুঝুঁকিতে।
কয়েক দিন ধরে খারাপ পরিস্থিতির মুখে থাকা খুলনা ও রাজশাহীর অবস্থার বিশেষ পরিবর্তন হয়নি। আগের ২৪ ঘণ্টায় খুলনা বিভাগে ২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। রাজশাহীতেও ১২ জন মারা গেছে একসময়ে। অবস্থার অবনতি হয়েছে চট্টগ্রামেও। সিলেটে আগের দিনের তুলনায় শনাক্ত ও মৃত্যু বেড়েছে। তবে নতুন করে অবস্থা বেশি খারাপ হয়েছে রাজশাহী বিভাগের দুই জেলা পাবনা ও নাটোরে। নাটোরে এক দিনে সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ড হয়েছে। পাবনায়ও রোগী বেড়েছে রেকর্ডসংখ্যক। সেখানে হঠাৎ করে রোগী বাড়তে থাকায় হাসপাতালে আর নতুন রোগী ভর্তিতে হিমশিম খাচ্ছে কর্র্তৃপক্ষ।
দেশ রূপান্তরের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরে বিস্তারিত
রোগী ভর্তি বন্ধ পাবনার জেনারেল হাসপাতালে: জেলার প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে করোনা সংক্রমণ। গত এক সপ্তাহে করোনা উপসর্গে মৃত্যুর খবরও আসছে বিভিন্ন উপজেলা থেকে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অবস্থার অবনতি হলে জেলা সদরে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে রোগী। তবে জেনারেল হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে শয্যা খালি না থাকায় গত দুদিনে ভর্তি হতে পারেননি নতুন কোনো রোগী। এই পরিস্থিতিতে হাসপাতালের কভিড ১৯ ইউনিটে শয্যা বাড়ানোর কাজ শুরু করেছে কর্র্তৃপক্ষ।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্র জানায়, গত এক সপ্তাহে পাবনা জেনারেল হাসপাতাল, ঈশ^রদী, ভাঙ্গুড়া, চাটমোহর, সুজানগর, সাঁথিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে করোনা ওয়ার্ডে অন্তত ১০ জন রোগী মারা গেছেন। হাসপাতালের বাইরেও করোনা উপসর্গে মৃত্যুর ঘটনা বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে।
পাবনা জেনারেল হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. সালেহ মোহাম্মদ আলী বলেন, গত বছর পাবনায় করোনা সংক্রমণের সর্বোচ্চ সময়েও জেনারেল হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা ১৪ জনের বেশি হয়নি। মৃত্যুহারও ছিল অনেক কম। কিন্ত বর্তমানে, হাসপাতালে করোনা ইউনিটে ৩৬ শয্যার সবকটি পূর্ণ। শয্যা খালি না থাকায় রোগীরা ফিরে গেছেন।
পাবনার সিভিল সার্জন ডা. মনিসর চৌধুরী বলেন, গত এক সপ্তাহে গড় সংক্রমণের হার প্রায় ৪৫ শতাংশ। সচেতন না হলে এই মহামারীর ব্যাপকতা রোধে লকডাউন বা শাটডাউনকোনো কিছুতেই কাজ হবে না।
নাটোরে এক দিনে সর্বোচ্চ ৮ জনের মৃত্যু: নাটোরে করোনায় এক দিনে সর্বোচ্চ ৮ জনের মৃত্যু এবং নতুন করে সর্বোচ্চ ১৩১ জন আক্রান্ত হয়েছে। যার মধ্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তিকৃত চারজন, নাটোর সদর হাসপাতালে তিনজন ও উত্তর চৌকিরপাড় এলাকায় একজনের মৃত্যু হয়েছে। তবে নাটোরে মৃত চারজনের মধ্যে দুজন করোনা পজিটিভ ছিলেন। এ নিয়ে সরকারি হিসাবে নাটোর জেলায় মৃতের সংখ্যা গিয়ে দাঁড়াল ৪৮ জনে।
রামেক আরও ১০ মৃত্যু : রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ইউনিটে এক দিনে আরও ১০ জনের মৃত হয়েছে। শুক্রবার সকাল থেকে শনিবার সকালের মধ্যে তাদের মৃত্যু হয়। এর আগের ২৪ ঘণ্টাতে এখানে ১৭ জনের মৃত্যু হয়। এ নিয়ে চলতি মাসের ২৭ দিনে (১ জুন থেকে ২৬ জুন) এ হাসপাতালের করোনা ইউনিটে মারা গেছেন ৩০৪ জন। এর মধ্যে শনাক্ত হওয়ার পর মারা গেছেন ১৪৭ জন। বাকিরা মারা যান উপসর্গ নিয়ে।
রামেক হাসপাতাল পরিচালক জানান, মৃতদের মধ্যে ৪ জনের বাড়ি রাজশাহীতে, ২ জনের চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং ৪ জনের বাড়ি নাটোরে।
খুলনা বিভাগে করোনায় আরও ২৮ জনের মৃত্যু : খুলনা বিভাগে করোনাভাইরাস ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগে ২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এই সময়ে বিভাগে নতুন করে শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ২০২ জন। বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তর সূত্র জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগের মধ্যে খুলনায় পাঁচজন, বাগেরহাটে পাঁচজন, যশোরে চারজন, নড়াইলে চারজন, কুষ্টিয়ায় চারজন, ঝিনাইদহে দুজন, চুয়াডাঙ্গায় দুজন এবং মেহেরপুরে দুজন মারা গেছেন।
সিলেটে আরও ৫ জনের মৃত্যু : সিলেট বিভাগে গত শনিবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল রবিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে আরও ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে বিভাগে করোনায় মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়াল ৪৬৭ জনে। গত ২৪ ঘণ্টায় সিলেট বিভাগের চার জেলা সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জে আরও ৯৯ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে।
বরিশালে করোনা শনাক্ত ও মৃত্যু বেড়েছে : গত ২৪ ঘণ্টায় করোনার উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৭ জন। আর আগে মারা যাওয়া একজনের নমুনা পরীক্ষায় করোনা পজিটিভ এসেছে। উপসর্গ নিয়ে ৭ জনই মারা যান বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডের আইসোলেশনে। এর আগের ২৪ ঘণ্টায় এই হাসপাতালে উপসর্গ নিয়ে মারা যান ৩ জন।
নতুন ১৫০ জন রোগী নিয়ে বিভাগে মোট আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১৭ হাজার ১৮ জন। এ পর্যন্ত বিভাগের করোনায় মারা গেছেন ২৯৯ জন।
বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক শ্যামল কৃষ্ণ মণ্ডল জানান, বরিশাল বিভাগে এক সপ্তাহ ধরে সংক্রমণ পরিস্থিতি ক্রমে অবনতি হওয়ায় আমরা উদ্বিগ্ন। এরই মধ্যে পিরোজপুরের চারটি পৌর শহর লকডাউন করা হয়েছে। শনিবার থেকে তা কার্যকর হয়েছে।
ময়মনসিংহ মেডিকেলে ১০ জনের মৃত্যু : ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ২৪ ঘণ্টা করোনায় দুজনের এবং করোনার সন্দেহভাজন উপসর্গ নিয়ে ৮ জনসহ মোট ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। করোনায় মৃতরা হলেন ঈশ্বরগঞ্জের ফিরোজা বেগম (৬৮) ও ধোবাউড়ার আইরিন বেগম (১৪)।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ইউনিটের ফোকাল পারসন ডা. মো. মহিউদ্দিন খান মুন জানান, শনিবার সকাল ৮টা থেকে রবিবার সকাল ৮টার মধ্যে তারা মৃত্যুবরণ করেন এবং এদের মধ্যে ফিরোজা বেগম নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) এবং আইরিন করোনা ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।
এছাড়া বগুড়া ও নারায়গঞ্জের প্রতিনিধি আর ৬ জনের মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছেন।