মিরপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে শেষ শয্যায় শায়িত হলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর বীর মুক্তিযোদ্ধা জেয়াদ আল মালুম। সুপ্রিম কোর্ট ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জানাজা শেষে গতকাল রবিবার বিকেলে তাকে সেখানে দাফন করা হয়। শনিবার দিবাগত রাতে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন অ্যাডভোকেট জেয়াদ আল মালুম (৬৮)। সুপ্রিম কোর্টের এই আইনজীবী বাংলাদেশ ক্ষেতমজুর সমিতির সভাপতি ও সিপিবির কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
দুপুর ১২টার দিকে জেয়াদ আল মালুমের মরদেহ নিয়ে আসা হয় তার দীর্ঘদিনের কর্মস্থল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। সেখানে জানাজায় ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি শাহিনুর ইসলামসহ অপর দুই সদস্য বিচারপতি আমির হোসেন, বিচারপতি আবু আহমেদ জমাদার, ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু, প্রসিকিউটর মোখলেছুর রহমান বাদল, সুলতান মাহমুদ সীমন প্রমুখ অংশ নেন। এ সময় জেয়াদ আল মালুমের মরদেহে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। ট্রাইব্যুনালে জানাজা শেষে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় সুপ্রিম কোর্ট কার্যালয়ে। দুপুর ২টার দিকে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি চত্বরে জানাজা সম্পন্ন হয়। জানাজায় অংশ নেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, আপিল বিভাগের বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী, বিচারপতি মো. নুরুজ্জামান, ওবায়দুল হাসান, হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম, মোস্তফা জামান ইসলাম, খোন্দকার দিলীরুজ্জামান, অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র শেখ ফজলে নুর তাপস, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল প্রমুখ।
সুপ্রিম কোর্টে জানাজা শেষে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। সেখানে বিভিন্ন বাম রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। সিপিবির কেন্দ্রীয় সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম, সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স, অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক এম এম আকাশসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ মরদেহে শ্রদ্ধা জানান। শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বিকেলে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়।
গার্ড অব অনারে নেতৃত্বে নারী কর্মকর্তা
এদিকে দুপুরে দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টে বীর মুক্তিযোদ্ধা জেয়াদ আল মালুমের জানাজা শেষে ঢাকা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে রাষ্ট্রীয় সম্মান গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। এতে নেতৃত্ব দেন সহকারী কমিশনার মারুফা সুলতানা খান হীরা মনি। মৃত্যুবরণকারী বীর মুক্তিযোদ্ধাদের গার্ড অব অনার প্রদানে নারী কর্মকর্তাদের বিকল্প চেয়ে সম্প্রতি এক বৈঠকে সুপারিশ করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। এ নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। তবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক এই সুপারিশের সমালোচনা করে গণমাধ্যমকে বলেন সংসদীয় কমিটির এ প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য নয়। তাদের এই প্রস্তাব গ্রহণ বা বিবেচনা করার সুযোগ নেই। ব্যাপক সমালোচনার মুখে সংশ্লিষ্ট সংসদীয় কমিটিও তাদের সুপারিশ থেকে সরে আসে।
গত ২৫ মে রাতে হৃদরোগে আক্রান্ত হন জেয়াদ আল মালুম। পরে তাকে শ্যামলীর বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে নেওয়া হয়। তার কিডনি ও ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তা অনেকাংশে কাজ করছিল না। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ২৬ মে তাকে ওই হাসপাতালের লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। এরপর তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় ২ জুন তাকে সিএমএইচে ভর্তি করা হয়। সেখানেও লাইফ সাপোর্টে ছিলেন তিনি। একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের বিচারের জন্য ২০১০ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। ওই সময়ে প্রসিকিউশন প্যানেলে প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ পান সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জেয়াদ আল মালুম। ট্রাইব্যুনালে দায়িত্ব পালনকালে তিনি জামায়াতের দুই শীর্ষ নেতা গোলাম আযম ও মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মামলায় প্রসিকিউশনের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।