১৮৫৫ সালের ৩০ জুন। ভাগনাডিহির আশপাশের চারশ গ্রামের প্রায় দশ হাজার সাঁওতাল জমায়েত হয়েছেন। সবার মুখ থমথমে, চোয়াল শক্ত। নিরন্ন, সহায়-সম্বলহীন, প্রকৃতির মতন সরল মানুষগুলো মুক্তি চায়। তারা ফিরে পেতে চায় তাদের জল-জমি-জঙ্গলের অধিকার। কিন্তু কী তার পথ? কে দেবে নেতৃত্ব? তারা খবর পেয়েছে, আজ তাদের সামনে খুলে দেওয়া হবে পথ। তাদের ডাক পাঠিয়েছে সিধু, ডাক পাঠিয়েছে কানু। তাই তারা এসেছে, তারা এসেছে দলে দলে, মেয়ে-মরদ একসঙ্গে; এককথায় একটা গোটা জাতি উঠে এসেছে আজ ভাগনাডিহির মাঠে। সভাস্থলে অদ্ভুত নীরবতা; যেন ইতিহাসও শ্বাসরোধ করে দাঁড়িয়ে আছে এই মহাযুগসন্ধির কালে। সভার মধ্যে উঠে দাঁড়ালেন সিধু। বয়স তার আনুমানিক ৩২-৩৩ বছর, গায়ের রং কালো তবে সাঁওতালদের গায়ের রঙের তুলনায় হালকা, লম্বা চেহারার সঙ্গে মিল রেখে মাথাভর্তি লম্বা কালো চুল। শান্ত কণ্ঠে সিধু ঘোষণা করলেন, ‘আমরা রাজা মহাজনদের সবাইকে খতম করব, পরে হিন্দু ব্যবসায়ীদের গঙ্গার ওপারে তাড়িয়ে দেব, আমাদেরই রাজ্য হবে। আমরা মহিষে টানা লাঙল ৮ আনায় ও বলদে টানা লাঙল ৪ আনায় দেব আর সরকার আমাদের কথা না রাখলে আমরা যুদ্ধ আরম্ভ করব, দেকোদের খতম করব এবং আমরাই রাজা হব।’
দামিন-ই-কোহ’র ইতিবৃত্ত
এটি একটি ফারসি শব্দ, যার অর্থ হলো পর্বতের পাদদেশ। ভারতের এই অঞ্চল বর্তমানে সাঁওতাল পরগণা নামে পরিচিতি। বুকানন হ্যামিল্টনের অপ্রকাশিত দলিল থেকে জানা যায় যে, বীরভূম রাজাদের অত্যাচারের ফলে ১৮০৯ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ সাঁওতালরা বীরভূম ত্যাগ করেন এবং গোদ্দা মহকুমা অঞ্চলের বনাঞ্চল পরিষ্কার করে বসবাস আরম্ভ করেন। ১৮৩৬ সালের মধ্যে এই স্থানে প্রায় ৪২৭টি সাঁওতালি গ্রাম সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল। ১৮৩২-৩৩ সালে সার্ভেয়ার ক্যাপ্টেন টানারের নেতৃত্বে দামিন-ই-কোহ’র সীমানা নির্ধারিত হয়। তখন এর আয়তন দাঁড়ায় ১৩৬৬.০১ বর্গমাইল। এর মধ্যে ৫০০ বর্গমাইলে কোনো পাহাড় ছিল না, তবে ২৫৪ বর্গমাইল ছিল জঙ্গল। আবাদযোগ্য জমি ছিল মাত্র ২৫৪ বর্গমাইল। বড়লাট লর্ড বেন্টিঙ্ক (১৮২৮-১৮৩৫) সরকারিভাবে রাজমহলের পশ্চিম দিকের জঙ্গল সাফ করে বসবাসের জন্য সাঁওতালদের আহ্বান জানায়। দারুণ উচ্ছ্বাসে সাঁওতালরা দলে দলে কটক, ধলভূম, মানভূম, বরাভূম, ছোটনাগপুর, পালামৌ, হাজারীবাগ, মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, বীরভূম থেকে এসে দামিন-ই-কোহ’তে বসবাস শুরু করে। ১৮৫১ সালের মধ্যে এই অঞ্চলে তাদের জনসংখ্যা দাঁড়ায় ৮৩ হাজারে। এই বসতি অবশ্য মাগনা ছিল না। ইংরেজ সরকারকে রীতিমতো রাজস্ব দিতে হতো তাদের। কিন্তু তবু এই সরল মানুষগুলো খুশি ছিল। তারা দামিন-ই-কোহ’কে ঘিরে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল তাদের চিরাচরিত বেঁচে থাকায় ফিরে যাওয়ার। কিন্তু ইংরেজ কোম্পানির মাথায় ছিল শুধুই মুনাফা; যেনতেন প্রকারে মুনাফা। ইংরেজ কোম্পানি মি. পনসেট নামে একজন ইংরেজকে দামিন-ই-কোহ অঞ্চলের সুপারিনটেনডেন্ট নিযুক্ত করেন। পনসেটের অধীনে ছিল চারজন নায়েব সেজোয়াল বা দারোগা। এদের কাজ ছিল রাজস্ব আদায় করা। এই অঞ্চলের ফৌজদারি দায়িত্বে ছিলেন ভাগলপুরের ম্যাজিস্ট্রেট এবং থানা ছিল ভাগলপুর, বীরভূম ও মুর্শিদাবাদ, যা ছিল এই অঞ্চল থেকে বহু দূরে এবং গরিব সাঁওতালদের পক্ষে পৌঁছানো ছিল অত্যন্ত দুরূহ। প্রথম দিকে যখন সাঁওতালরা জঙ্গল পরিষ্কার করে শ্বাপদসংকুল অরণ্যকে মানুষের বসবাসের উপযুক্ত করছিল, তখন ইংরেজ কোম্পানি তাদের উৎসাহিত করত। কিন্তু আবাদি প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে কোম্পানির লোভী দাঁত-নখ বের হতে শুরু করে। শুরু হয় খাজনা আদায়। ১৬/১৭ বছরের মধ্যেই ভয়ংকর হারে এই খাজনার পরিমাণ বেড়ে গিয়েছিল। কোম্পানির এই নিদারুণ অত্যাচারের, জোরজুলুমের সহযোগী ছিল জমিদার এবং মহাজনরা। বিপুল খাজনার চাপে যখন এই সরল মানুষগুলো নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছিল তখন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা দিতে এগিয়ে আসে জমিদার মহাজনরা। সাঁওতালরা শুধুই যে জমিদারদের শোষণের মুখে পড়েছে এমন নয়। তাদের শোষণ করেছে মহাজন, এমনকি স্থানীয় মধ্যবিত্ত হিন্দু ব্যবসায়ীরা পর্যন্ত।
সাঁওতালদের শোষণ করার আরেকটি উপায় বের করে নিয়েছিলেন ব্যবসায়ীরা। সহজ সরল এবং প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিক্ষা না থাকায় এদের ওজনে কম দিয়ে খুব সহজেই ঠকানো যেত। অল্পদিনের মধ্যেই ব্যবসা আর মহাজনী কারবারের সুযোগ পেয়ে বর্ধমান, বীরভূম থেকে মধ্যবিত্ত আর উচ্চবিত্ত ব্যবসায়ীরাও সেখানে পাড়ি জমাতে থাকে। ঠকানোর জন্য কেনাবেচায় দুই ধরনের ঝুড়ি, দাঁড়িপাল্লা ব্যবহার করা হতো। গরিব সাঁওতাল যখন হাটে তার জিনিসপত্র বিক্রি করার জন্য নিয়ে আসত, তখন তা মাপা হতো বড় পাল্লায়। নকল তলা লাগানো কৌটায় মেপেও ঠকানো হতো এদের। আর লবণ, তেল ইত্যাদি দ্রব্যাদি কিনতে গেলে, ব্যবসায়ীরা তা হালকা ভরের বাটখারা দিয়ে ওজন করত। প্রতিবাদ করলে নয়-ছয় বুঝিয়ে দেওয়া হতো সহজ-সরল সাঁওতালচাষিদের। তাই কঠোর পরিশ্রম করেও হাতে কোনো অর্থ থাকত না সাঁওতালদের। চাষের সময় বীজ কিনতে উচ্চসুদে ধার করা ছাড়া উপায় থাকত না এদের। কঠোর পরিশ্রম করে উৎপাদিত ফসল ঘরে তোলার সঙ্গে সঙ্গেই মহাজন, জমিদার আর পাওনাদাররা হানা দিত। তৎকালীন সময়ের আদালতের একটি মামলা থেকে জানা যায়, এক সাঁওতালচাষি টাকাপ্রতি ১২ আনা সুদে ২৫ টাকা ঋণ নিয়েছিল। একসময় পাহাড় পরিমাণ সুদে চাপা পড়ে সমগ্র জীবন দাসত্ব করেও সে সেই ঋণ শোধ করতে পারেনি, উত্তরাধিকারসূত্রে তার পুত্র, পৌত্রদের কাঁধেও ঋণের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়। আদালতে অভিযোগ করেও খুব একটা ফল পাওয়ার ঘটনাও ঘটত না। সাঁওতালদের করা মামলায় মহাজন ও জমিদাররাই জয়ী হয়ে যেতেন। ১৮৪৮ সালের দিকে মহাজনদের জ্বালায় দামিন-ই-কোহ এলাকার ৩টি গ্রামের সাঁওতাল পরিবার দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। অন্যায়-অত্যাচার সাঁওতালদের ধৈর্যের মধ্যে থাকলেও মহাজনদের অত্যাচার সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যায়। সাঁওতাল আদিবাসীরা মাঠে ফসল ফলায় আর ফসলের অধিকাংশই যায় মহাজন ও জমিদারের গোলায়। তাদের এ অবস্থা দেখে ভাগনাডিহির নারায়ণ মুরমু-র দুই ছেলে সিধু ও কানু, বসে থাকতে পারলেন না। তাদের অন্তরে প্রতিবাদের ঝড় বইতে শুরু করল। পরে চাঁদ ও ভৈরব তাদের সঙ্গে যোগ দেন। অত্যাচারের অবর্ণনীয় অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে প্রতিবাদে এগিয়ে এলেন এই চার সাঁওতাল বীর। ১৮৫৫ সালের গোড়ার দিকে তারা একটি পরোয়ানা প্রচার করলেন যে সাঁওতালদের ঠাকুর জিউই তাদের শোষকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে বলেছেন। তখন তারা আর বসে থাকতে পারলেন না। তারা মানসিকভাবে বিদ্রোহের জন্য প্রস্তুত হতে লাগলেন।
আলোচনার জন্য ভাগনাডিহি গ্রামে সাঁওতালরা সমবেত হলে সিদ্ধান্ত হলো পরদিন একসঙ্গে সবাই শিকারে বেরোবে। পরের দিন সিধু, কানুর নেতৃত্বে ৪০/৫০ জন সাঁওতাল যুবক অস্ত্রসজ্জিত হয়ে শিকারে যাওয়ার পথে দারোগা মহেশ দত্ত, দুজন সিপাহি ও কয়েকজন মহাজনের সামনে পড়ে। দারোগার সঙ্গে দুটি দড়িবোঝাই গাড়িও ছিল। মূলত তারা সাঁওতালদের ঘোষণা ও সিদ্ধান্ত জানতে পেরেছে। দারোগার সঙ্গে তাদের বাগবিতণ্ডার একপর্যায়ে বিদ্রোহী সিধু, কানুর সশস্ত্র দল ঘটনাস্থলে দারোগা মহেশ এবং কানু মানিক রায় নামের মহাজনকে হত্যা করে। এ ঘটনার পর ভাগলপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন জায়গায় সরকারি-বেসরকারি লোকজনসহ অত্যাচারী জমিদার মহাজন অনেকে সাঁওতালদের হাতে নিহত হতে থাকে। ১৮৫৫ সালের ১৭ আগস্ট সরকারের পক্ষ থেকে বিদ্রোহীদের আত্মসমর্পণের আহ্বান জানানো হয়। বিদ্রোহীরা সরকারের আহ্বান ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার সেনাবাহিনী মাঠে নামায় এবং মার্শাল ল’ জারি করে। পরিস্থিতি সামাল দিতে শত শত বিদ্রোহীকে হত্যা করা শুরু করে সেনাবাহিনী। একদিকে কামান-বন্দুক, অন্যদিকে তীর-ধনুকের লড়াই। কয়েক দিনের মধ্যেই সেনাবাহিনী ভাগনাডিহি গ্রাম ধ্বংস করে দেয়। সিধু, কানুর বাড়িসহ গ্রামের সব বাড়ি আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হলো। আশ্রয়হীন হয়ে খাদ্যহীনতার কারণে অনেকে দুর্বল হয়ে গেলেন, অনেকে ধরা পড়লেন। বিদ্রোহীদের মনোবল আস্তে আস্তে দুর্বল হতে লাগল। কানু সঙ্গীদের নিয়ে হাজারীবাগ অভিমুখে পালানোর সময় জারয়ার সিং নামের ব্যক্তির তৎপরতায় ১৮৫৫ সালের ৩০ নভেম্বরে ধরা পড়েন। শেষে কানুর বিরুদ্ধে রাজদ্রোহ, লুণ্ঠন, অত্যাচার ও হত্যার অভিযোগে ১৮৫৬ সালের ১৪, ১৫ ও ১৬ জানুয়ারি স্পেশাল কমিশনার এলিয়টের এজলাসে তাদের বিচার হয়। বিচারে কানুকে মৃত্যুদণ্ডে দ-িত করা হয়। এই বিদ্রোহে ৩০ হাজার আদিবাসী প্রাণ হারান।
আজও এ দেশেও সাঁওতাল ও অন্যান্য আদিবাসী সম্প্রদায় অর্থনৈতিক শোষণের পাশাপাশি সামাজিক শোষণ ও বঞ্চনার শিকার। নানা সমস্যায় এখনো বঞ্চিত তারা। জমি বেদখল, সহিংসতা, মিথ্যা মামলা, জাল দলিল, ধর্ষণ, হয়রানি, জাতিগত বৈষম্য ইত্যাদি তাদের অস্তিত্ব বিপন্ন করে তুলছে। তারা প্রতি পদে সংকটাপন্ন, তাদের ভাষা বিপন্ন। অথচ এসব সমস্যা সমাধানে কোনো সরকারকে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় না। রাষ্ট্রের মানুষ হয়েও তারা যেন এ রাষ্ট্রের কেউ না। অথচ তাদের আছে গৌরবময় ইতিহাস। সাঁওতাল বিদ্রোহ ভারতের ইতিহাসে এক অগ্নিঝরা অধ্যায়। ঊনিশ শতকে বঙ্গীয় নবজাগরণ বা রেনেসাঁ যে সময়ে প্রকৃত জাতীয়তাবাদের ভিত্তি রচনা করতে ব্যর্থ হয়েছিল, ঠিক সে সময়েই ইংরেজ শাসকের দুঃশাসন ও জমিদারশ্রেণি আর মহাজনদের শোষণের বিরুদ্ধে সাঁওতালদের সশস্ত্র কৃষক-সংগ্রাম সমগ্র জাতির সামনে এক নতুন সংগ্রামী অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করেছিল; যাকে ভারতের বৈপ্লবিক জাতীয়তাবাদের ভিত্তিভূমি বলা চলে। ব্রিটিশ শাসনকালে যেসব কৃষক বিদ্রোহ হয়েছিল, তাদের মধ্যে অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য ছিল সাঁওতাল বিদ্রোহ বা খেরওয়ারি হুল বিদ্রোহ। ১৮৫৫ সালের সাঁওতাল বিদ্রোহ ও ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহ বা মহাবিদ্রোহদুটোকেই ভারতের প্রথম ঐক্যবদ্ধ স্বাধীনতা-সংগ্রাম বলা চলে। এই উভয় সংগ্রামই শুরু হয়েছিল ইংরেজ শাসনের কবল থেকে, ইংরেজ শাসকের দেশীয় তাঁবেদার জমিদারদের শোষণ থেকে মুক্তি ও স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার ধ্বনি নিয়ে।
তথ্যসূত্র : ১. সুবোধ সেনগুপ্ত ও অঞ্জলি বসু সম্পাদিত বাঙালি চরিতাবিধান। প্রথম খণ্ড; সাহিত্য সংসদ কলকাতা। ২. সাঁওতাল বিদ্রোহের ইতিকথা; শ্রী বুদ্ধেশ্বর টুডু। ৩. দামিন-ই-কোহ’র ইতিকথা; স্বর্ণ মিত্র। নবতরঙ্গ প্রকাশনী; ঢাকা, বাংলাদেশ। ৪. ভারতের আদিবাসীদের ভূমি সমস্যা; প্রফেসর বরুণ রৌত।
লেখক কথাসাহিত্যিক
gtanzia@gmail.com