৭০ লাখ পরিবহন শ্রমিক খাদ্য সহায়তা পাবেন ‘লকডাউনে’

পরিবহন শ্রমিকরা খাদ্য সহায়তা পাবেন আগামী বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হওয়া ‘কঠোর বিধিনিষেধ’ বা ‘লকডাউনে’। তাদের ১০ কেজি চাল, এক কেজি ডাল, দুই লিটার তেল এবং মসলা দেওয়া হবে। এছাড়া ত্রাণ হিসেবে আমও দেওয়া হবে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এ তথ্য জানান।

সরকার ঘোষিত ‘কঠোর বিধিনিষেধে’ গণপরিবহন বন্ধ থাকায় চরম বিপর্যয়ে পড়েছেন পরিবহন শ্রমিকরা। একদিকে তাদের যেমন কোনো আয় ছিল না তেমনি মালিকরাও তাদের পাশে দাঁড়ায়নি। এমন পরিস্থিতিতে পরিবহন শ্রমিকদের সংগঠনগুলো বিভিন্ন সময়ে দেশজুড়ে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছে। দেশে ৭০ লাখ পরিবহন শ্রমিক রয়েছে। তাদের মধ্যে ২২ লাখ হচ্ছেন ড্রাইভার, ২৮ লাখ হেলপার বা সুপারভাইজার। আর বাকি ২০ লাখ মিস্ত্রি, পেইন্টার, মবিল চেঞ্জারসহ আরও কিছু শ্রমিক রয়েছেন।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোহসীন গতকাল মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা কর্মহীন পরিবহন শ্রমিকদের পাশে দাঁড়াতে চাই। তাই এবার পরিবহন শ্রমিকদের ১০ কেজি চাল, এক কেজি ডাল, দুই লিটার তেল ও মসলার একটি প্যাকেট পৌঁছে দেওয়া হবে।’

পরিবহন শ্রমিকদের তালিকা চূড়ান্ত হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তালিকা করাই আছে। পরিবহনসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অ্যাসোসিয়েশন তাদের তালিকা তৈরি করেছে। আমরা শুধু তাদের হাতে পৌঁছে দেব। দীর্ঘ বিধিনিষেধে এসব পরিবহন শ্রমিক অবর্ণনীয় দুর্ভোগের মধ্যে ছিল।’

আগামী অর্থবছরের বাজেট এখনো পাস হয়নি। আজ বুধবার সংসদে বাজেট পাস হতে পারে। বাজেট পাস হলে তারপর এর বিভাজনের প্রশ্ন আসে। এ অবস্থায় দুর্যোগে সহায়তার টাকা পেতে সমস্যা হচ্ছে কি না জানতে চাইলে ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব বলেন, ‘স্বাভাবিক সময় হলে বাজেট পেতে দেরি হতো। কিন্তু এখন স্বাভাবিক সময় না। বিশ^জুড়ে মহামারী। সব সরকারই গরিব মানুষের জন্য বা সমস্যায় পড়া মানুষদের পাশে দাঁড়াচ্ছে। আমাদের সব মন্ত্রণালয় এ মহামারীতে কাজ করছে। কাজেই অর্থ পেতে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আমাদের চমৎকার সমঝোতা রয়েছে।’

সরকার কি শুধু পরিবহন শ্রমিকদেরই খাদ্য সহায়তা দেবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘নিম্ন আয়ের মানুষদেরও খাদ্য সহায়তা দেওয়া হবে। যারা এক দিনের আয় দিয়ে তিন-চার দিন চলে সেসব পরিবারকেও খাদ্য সহায়তা দেওয়া হবে। এছাড়া আরও নানা শ্রেণির মানুষ এ খাদ্য সহায়তার আওতায় আসতে পারেন।’

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সচিব আরও জানিয়েছেন, এবার খাদ্য সহায়তা হিসেবে আমও দেওয়া হবে। এতে দুদিক থেকেই লাভ হবে। উৎপাদকরা তাদের ফসলের ন্যায্য দাম পাবেন আর কর্মহীন মানুষরা খাদ্য সহায়তা হিসেবে আম পাবেন। আম কীভাবে সংগ্রহ করে বিতরণ করা হবে তা নিয়ে কাজ করছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘আমাদের সঙ্গে এখনো কেউ যোগাযোগ করেনি। আমরা ৭০ লাখ পরিবহন শ্রমিকের তালিকা নিয়ে বসে আছি। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ে আমরা বহু ধরনা দিয়েছি পরিবহন শ্রমিকদের একটু সহায়তা করার জন্য। কিন্তু দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মন গলাতে পারিনি। তবে প্রধানমন্ত্রী ২৬ লাখ শ্রমিককে আড়াই হাজার করে টাকা দিয়েছেন। এটাই এখনো পর্যন্ত পাওয়া সহায়তা।’

যাত্রী কল্যাণ সমিতি নামে একটি নাগরিক সংগঠন বলছে, কয়েক লাখ গণপরিবহন শ্রমিকের কোনো তথ্যভা-ার নেই। ফলে এ করোনা মহামারীর সময় সরকারি বা বেসরকারিভাবে তাদের কাছে সাহায্য পৌঁছানো কঠিন। করোনার কারণে অনেক চালক পেশা বদল করেছেন। এখন অপেশাদার চালক বা সাহায্যকারী দিয়ে গণপরিবহন পরিচালনা করলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা আরও বেড়ে যাবে, পেশাদার শ্রমিকরা চলে গেলে অরাজকতা বেড়ে যাবে।

এদিকে খাদ্য মন্ত্রণালয়ও ‘কঠোর বিধিনিষেধে’ কীভাবে শহরাঞ্চলের দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানো যায় তা নিয়ে কাজ শুরু করেছে। ২০২০ সালে প্রথম বিধিনিষেধ আরোপের পর খাদ্য অধিদপ্তর চলমান কর্মসূচির সঙ্গে শহরাঞ্চলের মানুষদের ১০ টাকা কেজি দরে চাল দিয়েছে। কিন্তু এ চাল নিয়ে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় খাদ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে একপর্যায়ে তা স্থগিত করে খাদ্য অধিদপ্তর। পরে আরও দফায় দফায় বিধিনিষেধ আরোপ করা হলেও তখন আর খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়নি।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব নাজমানারা খানুম গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গতবারের চেয়ে আমাদের এখনকার মজুদ অনেক ভালো। তাই আমরা চলমান কর্মসূচির সঙ্গে অতিরিক্ত কর্মসূচি নিতে পারি। কী ধরনের কর্মসূচি নেওয়া যায় তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। শহরাঞ্চলে ১০ টাকা কেজি দরে চাল দেওয়া যেতে পারে।’

গত সোমবার থেকে সারা দেশে পণ্যবাহী যানবাহন ও রিকশা ছাড়া সব ধরনের গণপরিবহন বন্ধ রয়েছে। সব ধরনের শপিং মল, মার্কেট, পর্যটন কেন্দ্র, রিসোর্ট, কমিউনিটি সেন্টার ও বিনোদন কেন্দ্রও বন্ধ। আগামীকাল বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হবে ‘কঠোর বিধিনিষেধ’। গতকাল মঙ্গলবার এ বিধিনিষেধের রূপারেখা চূড়ান্ত করার জন্য বৈঠক করেছেন বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ বৈঠক শেষে বিধিনিষেধের খসড়া প্রস্তাব পাঠানো হবে প্রধানমন্ত্রীর কাছে। তিনি অনুমোদন করলে আজ বিধিনিষেধের আদেশ জারি করবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।

এর আগে গত সোমবার অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভা বৈঠকে ‘কঠোর বিধিনিষেধের’ সময় দরিদ্রদের খাদ্য সহায়তার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। মন্ত্রিসভা বৈঠক শেষে ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকরা জানতে চান ‘কঠোর বিধিনিষেধ’ বা ‘লকডাউনের’ মধ্যে দরিদ্রদের কী হবে জবাবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘ত্রাণ প্রতিমন্ত্রীকে মন্ত্রিসভা বৈঠকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় যথাসম্ভব গতবারের মতো প্রোগ্রাম নিতে হবে। বিশেষ করে শহর এলাকায় বেশি সমস্যা হয়, সেখানে খেয়াল রেখে সাহায্য নিশ্চিত করা হবে।’