সমন্বিত গ্রাহক হিসেবে থাকা পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের ৬৬ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ নিয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় আটক হয়েছেন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সদস্য প্রতিষ্ঠান বানকো সিকিউরিটিজের চেয়ারম্যান আবদুল মুহিত। দেশত্যাগের নিষেধাজ্ঞার পরও গতকাল মঙ্গলবার সকালে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে লন্ডন যাওয়ার পথে তাকে আটকে দেয় ইমিগ্রেশন পুলিশ। পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. রেজাউল করিম এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
রেজাউল করিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, সমন্বিত গ্রাহক হিসাবে বড় অংকের ঘাটতির পরিপ্রেক্ষিতে বানকো সিকিউরিটিজের চেয়ারম্যান, অন্যান্য পরিচালক ও কর্মকর্তারা যাতে দেশত্যাগ করতে না পারেন, সেজন্য বিমানবন্দরসহ সব স্থলবন্দরে চিঠি দিয়েছিল এসইসি। দেশত্যাগের নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও গতকাল সকালে বানকো সিকিউরিটিজের চেয়ারম্যান ইংল্যান্ডের পাসপোর্টধারী আবদুল মুহিত টার্কিস এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে লন্ডনের উদ্দেশ্যে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গেলে সেখানে ইমিগ্রেশন থেকে তাকে আটকে দেওয়া হয়। বিমানবন্দর থেকে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে আমরা মতিঝিল থানার সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানাই বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষকে।
এদিকে গ্রাহকের ৬৬ কোটি ৫৯ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে বানকো সিকিউরিটিজের চেয়ারম্যান আবদুল মুহিতসহ প্রতিষ্ঠানটির আরও পাঁচ পরিচালকের বিরুদ্ধে গতকালই মামলা দায়ের করেছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) উপসহকারী পরিচালক মোহাম্মদ নুর আলম সিদ্দিকী। দুদকের দায়ের করা এই মামলায় আটক দেখিয়েছে পুলিশ। মামলার অন্য আসামিরা হলেন বানকো সিকিউরিটিজের পরিচালক শফিউল আজম, ওয়ালিউল হাসান চৌধুরী, নুরুল ঈশান সাদাত এবং এ মুনিম চৌধুরী। আসামিরা অসৎ উদ্দেশ্যে পরস্পর যোগসাজষে প্রতারণার আশ্রয়ে অপরাধমূলক বিশ্বাস ভঙ্গের মাধ্যমে ৬৬ কোটি ৫৯ লাখ টাকা আত্মসাতের করে দ-বিধির ৪০৬, ৪০৯, ৪২০ ও ১০৯ ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুদক সূত্র জানিয়েছে, আবদুল মুহিতকে আটকের পর রমনা থানায় রাখা হয়েছে। আজ বুধবার তাকে আদালতে পাঠানো হবে।
গত কয়েক মাস ধরেই গ্রাহকদের পাওনা অর্থ পরিশোধ করতে পারছিল না বানকো সিকিউরিটিজ। ডিএসই ও এসইসির কাছে একাধিক অভিযোগ দিয়েছিলেন প্রতিষ্ঠানটির গ্রাহকরা। এরই মধ্যে গত ৬ মে ও ৬ জুন ডিএসইর লেনদেন নিষ্পত্তি করতে ব্যর্থ হয় বানকো সিকিউরিটিজ। এমন পরিস্থিতিতে গত ৭ জুন ব্রোকারেজ হাউজটিতে বিশেষ পরিদর্শন করে সমন্বিত গ্রাহক হিসেবে ৬৬ কোটি ৫৯ লাখ টাকার ঘাটতি পান ডিএসইর কর্মকর্তারা। ঘাটতি সমন্বয় করতে বলা হলেও ব্রোকারেজ হাউজের মালিকপক্ষ ব্যর্থ হয়। ওই অর্থ আত্মসাতের আশঙ্কা করে প্রতিষ্ঠানটি যাতে গ্রাহকের কোনো শেয়ার বিক্রি করে অর্থ হাতিয়ে নিতে না পারে সেজন্য গত ১৪ জুন বানকো সিকিউরিটিজের লেনদেন স্থগিত করে ডিএসই। একই দিনে বিনিয়োগকারীদের বিপুল পরিমাণের অর্থ ও শেয়ার আত্মসাৎ করে দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় মতিঝিল থানায় অভিযোগ দায়ের করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানায় ডিএসই। বিষয়টি তদন্তের জন্য দুদকে পাঠায় মতিঝিল থানা।
এদিকে বানকো সিকিউরিটিজের মালিকদের বিরুদ্ধে গ্রাহকের অর্থের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণের শেয়ারও আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। ডিএসইতে অন্তত ৩০ জন গ্রাহক এমন অভিযোগ জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে ডিএসইর ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল মতিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অর্থের পাশাপাশি শেয়ার আত্মসাতের অভিযোগও অনেক গ্রাহকের কাছ থেকে পেয়েছি। তবে ঠিক কী পরিমাণের শেয়ার আত্মসাৎ হয়েছে, তার পরিমাণ এখনো নির্ধারণ করা যায়নি। এ বিষয়ে কাজ চলছে।’
তিনি আরও বলেন, বানকো সিকিউরিটিজের ডিপির অধীন অনেক শেয়ার রয়েছে। এগুলোর ভ্যালুয়েশনের কাজ চলছে। প্রয়োজনে ডিপির শেয়ার থেকে গ্রাহককে দেওয়া যেতে পারে।
এর আগে গত বছরও বিনিয়োগকারীদের বিপুল পরিমাণের শেয়ার ও অর্থ নিয়ে পালিয়ে যান ডিএসইর ব্রোকারেজ হাউজ ক্রেস্ট সিকিউরিটিজের মালিক মো. শহিদ উল্লাহ। সে সময় ক্রেস্ট সিকিউরিটিজ ও এর মালিকের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা ছাড়াও দেশ থেকে যাতে পালিয়ে যেতে না পারেন, সেজন্য পুলিশের সহযোগিতা নেয় ডিএসই। কিন্তু এক বছরেরও বেশি সময় পার হলেও এখন পর্যন্ত বিনিয়োগকারীরা তাদের পাওনা অর্থ ফেরত পাননি। এর আগে শাহ মোহাম্মদ সগীরসহ আরও কয়েকটি ব্রোকারেজ হাউজ বিনিয়োগকারীদের অর্থ আত্মসাৎ করে। কিন্তু দীর্ঘ সময়েও বিনিয়োগকারীরা তাদের পাওনা অর্থ ফেরত পাননি।