বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের গদ্যে এক বিপজ্জনক অভিযাত্রা শুরু হয়েছিল আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে। তা সত্তরের দশকের লেখকদের সেভাবে প্রভাবিত করেনি, করার সুযোগ তেমন ছিল না হয়তো, কারণ ততদিনে তারা নবিশিকাল কাটিয়ে নিজস্ব সাহিত্যিকযাত্রার দ্বিতীয় দশকে ঢুকে পড়েছেন, প্রত্যেকেরই হাতে যার যার মতন নিজস্ব গদ্য উঠে এসেছে। তখন বাংলাদেশের বাজারে সদ্য আনন্দ পাবলিশার্স লিমিটেড প্রকাশিত কমলকুমারের বইগুলো বিষয়ের দিক থেকে একটু-আধটু প্রভাবিত করলেও, গদ্যভাষার দিক থেকে তাদের প্রভাবিত হওয়ার সুযোগ কমই ছিল। কিন্তু আশির দশকে যারা কথাসাহিত্যে এলেন তাদের সেই সময়ের গদ্যের দিকে তাকালে লক্ষ করা যায়, কমলকুমারের গদ্য কীভাবে তাদের প্রভাবিত করেছে। এ জন্য বিপজ্জনক অভিযাত্রা শব্দযুগল ব্যবহার করতে হলো।
একদিকে থেকে কমলকুমার মজুমদারের মতো অসম্ভব সৃষ্টিশীল গদ্যলেখকের প্রভাবে পড়া সেদিনের তরুণ লেখকদের জন্য হয়তো স্বাভাবিকই এক প্রক্রিয়া। দুটো কারণে। অন্তর্জলী যাত্রা বাদে তার অন্যান্য লেখা তখন তাদের সামনে এসে যাচ্ছে, দুই. সেই ব্যতিক্রমী গদ্য রপ্ত করতে পারলে তা বাংলাদেশের কথাসাহিত্যিকের জন্য এক নতুনতর যাত্রা হবে। কারণ সুহাসিনীর পমেটম, গোলাপ সুন্দরী কিংবা অনিলা স্মরণে নামের তার বইগুলো কয়েক দশক আগে সাময়িকপত্রে বেরুলেও বই আকারে সম্ভবত এ সময়েই সামনে এসেছে। এসব বইয়ের গদ্যের অমোঘ টান থেকে সে সময়ের তরুণ লেখকদের অন্যত্র নজর সরিয়ে রাখা নিশ্চিত দুঃসাধ্য ছিল। আগেই বাজারে ছিল অন্তর্জলী যাত্রা ও গল্পসংগ্রহ। ফলে কমলকুমার মজুমদার সে সময়ের তরুণতর লেখকদের কাছে যেন প্রায় সমকালীন কিংবা মাত্র এক প্রজন্ম আগের লেখক।
অন্তর্জলী যাত্রা পঞ্চাশের দশকে সাময়িকপত্রে বেরিয়েছে, কিন্তু বই আকারে বেরিয়েছে ষাটের দশকের গোড়ায়। সাময়িকপত্রে প্রকাশের পর তিনি তার তরুণ অনুরাগীদের অফপ্রিন্ট পড়তে দিয়েছিলেন। সেই অনুরাগীর একজন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছেন, অমন বিস্ময়কর ভাষা ও বিষয় নিয়ে একটি বই হতে পারে, এটি তাদের মতন তরুণদের কাছে ছিল প্রায় অজ্ঞাত। একমাত্র কমলকুমার মজুমদারের মতন মানুষের পক্ষেই সম্ভব। তাকে তারা সর্ববিদ্য বিশারদ মানতেন। ফরাসি ভাষায় অসামান্য দখল। বাংলা গদ্যের বাক্য গঠনকে তিনি আমূল টান দিয়েছেন। অথচ এই লেখক যখন পত্রিকায় ফিচার ধরনের কিছু লেখেন তা অনেকটাই আটপৌরে ভাষায়। প্রথম পর্বের গল্পও লিখেছেন চলিত গদ্যে, চাইলে ওই ভাষায় একেবারে কাহিনীগল্প তিনি লিখতেই পারতেন। কিন্তু তিনি লিখছেন মতিলাল পাদরী, নিম অন্নপূর্ণা কিংবা তাহাদের কথার মতন গল্প; যা তার সমকালীনদের চেয়ে গল্পের বিষয় ও ভাষায় একেবারেই আলাদা। ওদিকে চলচ্চিত্র কিংবা গণিত নিয়ে তার নিজস্ব ভাবনা আছে। আছে পশ্চিমবাংলার পুরাকীর্তি নিয়েও সহজাত কথা বলার অধিকার। লোকজীবনের আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য নিয়ে চাইলেই তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলতে পারতেন। বলতেনও তার এই সাগরেদতুল্য সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, ইন্দ্রনাথ মজুমদারকে। সত্যজিৎ রায় তো বলছেনই, কমলকুমার নোজ অল আর্ট! সন্দীপ চট্টোপাধ্যায় বাড়িয়ে মনে করতেন, বঙ্কিমচন্দ্রের পরে একমাত্র মানিক, তার পরে কমলকুমার। দেবেশ রায় অন্তর্জলী যাত্রার লেখক সম্পর্কে লিখেছেন, সেই মধ্য পঞ্চাশে ভাষানির্মিত পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ একটি কাহিনীগদ্য নির্মাণ করেছেন কমলকুমার এই কলকাতা শহরে। অর্থাৎ, সাময়িকপত্রে প্রকাশমাত্র বই আকারে প্রকাশিত হোক বা না হোক অন্তর্জলী যাত্রা বাংলা ভাষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ গদ্যশিল্প, এটি পঞ্চাশের তরুণ লেখকরা প্রায় সবাই বুঝতে পেরেছিলেন, কিন্তু ওই রাস্তায় হাঁটার শক্তি আর সাহস কোনোটাই তারা দেখাননি, সাহস থাকলেও সে ঝুঁকি নেননি। নেওয়া সম্ভবও নয়। বিষয়ের সঙ্গে ভাষার এই সাযুজ্য তো সবার পক্ষে ঘটানো সম্ভবও হয় না। ভাষাকে নিজের মতো করে ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া লেখকের সংখ্যা পৃথিবীর সব ভাষাতেই কম থাকে। এ-কথা ভুল হোক কি ঠিক হোক, কমলকুমার মনে করতেন, যে ভাষাকে আক্রমণ করে সে-ই ভাষাকে বাঁচায়। এমন উপলব্ধি একজন লেখকের ক্ষেত্রে ঘটতেই পারে কিন্তু সফলভাবে ব্যবহার করে কাহিনীগদ্যকে একটি পরিণতির দিকে নিয়ে যাওয়া সত্যি বিস্ময়কর! ফলে একজনের ক্ষেত্রে, তিনি পাঠক বা সমালোচক উভয় হতে পারেন, কমলকুমারের ভাষা ব্যবহারকে সমালোচনা করতে পারেন কিংবা মেনেও নিতে পারেন, কিন্তু তার অসাধারণ শক্তিকে মান্যতা না দেওয়ার কোনো উপায় নেই।
ষাটের ও সত্তরের লেখকদের গদ্যে কখনো কখনো কমলকুমার মজুমদারের প্রভাব সামান্য হলেও তো লক্ষ করা যায়। কিন্তু সেটি একেবারে আকস্মিক, ওই পথ তার নয় বলে তাদের কেউ কেউ একেবারে শুরুতে একটি-দুটি মাত্র প্রচেষ্টার পরেই সেখান থেকে সরেও গেছেন। একটু পরে আশির লেখকরাও সরে গেছেন। যে কেউ সরে যেতে বাধ্য, কারণ বিষয়ের সঙ্গে ভাষার সম্পর্ক মাংসের সঙ্গে চামড়ার মতন। কোনো গদ্য লেখকের কখনো কখনো তা বুঝতে সময় লাগে। আশির গদ্য লেখকরা অনেকেই শুরুর দিনগুলোতে সেটি বুঝতে হয়তো একটু সময় নিয়েছেন, অথবা হতে পারে ওই সময়ে তাদের সামনে হাজির হচ্ছে বইগুলো, তাই তারা প্রভাবিত, হতে পারে কমলকুমার পাঠোত্তর প্রতিক্রিয়া তাদের ভেতরে একটু বেশি দিন বহমান ছিল, অথবা হতে পারে ওই ঢেউয়ের ধাক্কায় তারুণ্যের দিনগুলোতে লুটোপুটি খাওয়াই তাদের ইচ্ছেতেই ঘটেছে। আর এ প্রভাবের খানিকটা এর ঠিক পরের নব্বইয়ের দশকের লেখকদের ভেতরে খুব কম করে হলেও পড়েছে। যেমন, বিংশ শতকের শুরু থেকে কাজী নজরুলের উত্থানের বিশের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাকি প্রায় সব কবিরই কবিতা রবীন্দ্রনাথের কাব্যভাষা প্রভাবিত। এর জন্য রবীন্দ্রনাথের কোনো দায় নেই, দায় যদি থাকে সেই কালের কবিদের।
এ জন্য কমলকুমার মজুমদারের কোনো দায় নেই। তার ভাষার সহযোগী অথবা অনুগামী হওয়া ব্যাপারটা অসম্ভবও বটে। শ্বাসঘাত অনুযায়ী ছেদচিহ্ন কিংবা কখনো ছেদচিহ্ন অনুযায়ী শ্বাসঘাত, বাংলা গদ্যে এমন ব্যবহার এক দুঃসাহসিক প্রক্রিয়াই। আপাত দৃষ্টিতে অন্য লেখার তুলনায় অপেক্ষাকৃত সরল গোলাপ সুন্দরীর একটি জায়গা : ‘স্পোর্ট’ কথাটা বিলাসকে বড় খুশি করে, বড় সুন্দর করে, উহা যেন বাক্য নয়, তাহা যেন সত্যই নয়ন-অভিরাম সহজ, একটি ব্রাহ্মণী হংস, যে হাঁস তুষার অভিমানী, যৌবনশালিনী এবং যে হাঁস শূন্যতা লইয়া খেলা করে।’ এই ভাষা যা প্রতিটি মুহূর্তেই চিত্রকল্প রচনা করে চলে, প্রতিমা (ইমেজ) দেখিয়ে দেয় আর চোখ থেকে মাথার একেবারে ভেতরে চিত্রকল্প আর প্রতিমা কাহিনীকেও বহমান করে তোলে। সে কাহিনী ওই সমকালীন কলকতা নয়, কোনটা শতাব্দী আগের গঙ্গাতীর কোনটা নিরাময় কেন্দ্র বা অন্যত্র, কিংবা নিষ্ঠুর খিদের গল্প যে নিম অন্নপূর্ণা তাও অন্য বাস্তবতা, কিংবা তাহাদের কথা। কমলকুমার এসব অত্যন্ত যতেœ একেবারেই সচেতনে তৈরি করেছেন। ভাষায় চিত্রকলা রচনা সম্ভব তাও তো তার হাতেই দেখতে পাই। সে পথ বাংলা ভাষায় খুব কম লেখকই কেটেছেন। এর সঙ্গে তখন গুটিগুটি পা ফেলা ওই আশির দশকীয় প্রচেষ্টা ভুল হোক কি ঠিক, এতদিন বাদে তাদের সেই যাত্রাকেও দুঃসাহসিক বলেই মনে হয়।
লেখক কথাসাহিত্যিক
prasantamridha@gmail.com