২ বছর ধরে ভাতা পান না মুক্তিযোদ্ধা সায়েরা বেগম

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলার নারী মুক্তিযোদ্ধা সায়েরা বেগমের ভাতা গত দুই বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। এ ঘটনায় চরম অভাব-অনটনে দিন কাটাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন স্বামী ও ছেলেসন্তানহীন সায়েরা বেগম। ভুক্তভোগীর ভাষ্য, ভাতা চালুর দাবিতে দ্বারে দ্বারে ঘুরে এখন ক্লান্ত তিনি। জেলা-উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কমিটি, স্থানীয় সংসদ সদস্য, মুক্তিযুদ্ধকালীন সাব-সেক্টর কমান্ডারের কোনো সুপারিশ-প্রত্যয়নই কানে তুলছে না মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়। তাই জীবনের শেষ সময়ে এসে ভাতা চালুর দাবিতে প্রধানমন্ত্রীর সহায়তা চেয়েছেন একাত্তরের সাহসী এই কিশোরী। এদিকে সায়েরা বেগমের ভাতা বন্ধের পেছনে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের ‘গাফিলতিকে’ দায়ী করছেন একাত্তরের মুজিব বাহিনীর কমান্ডার, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য র আ ম উবায়দুল মোক্তাদির চৌধুরী।

বিজয়নগর উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের কমিটির যাচাই-বাছাইয়ের পর ২০১৬ সাল থেকে ভাতা সুবিধাভোগীদের তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত হয় সায়েরা বেগমের। তৎকালীন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক ড. মুহাম্মদ মোশাররফ হোসেন ২০১৬ সালের ২৮ মার্চ এক পত্রে তা নিশ্চিত করেন। কিন্তু ২০১৯ সালের এপ্রিল মাসে সেই ভাতা প্রদান বন্ধ করে দেওয়া হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, স্বাধীনতা যুদ্ধে জীবনবাজি রেখে দেশের জন্য কাজ করেছেন সায়েরা বেগম। তার বাবা আবদুল আজিজ কাজ করতেন পাকবাহিনীর ক্যাম্পে। তার কাছ থেকে পাকবাহিনী ও ক্যাম্পের ভেতরকার খবরাখবর যা পেতেন সেগুলো জানিয়ে দিতেন মুক্তিযোদ্ধাদের। একপর্যায়ে পাকবাহিনীর ক্যাম্প কমান্ডারের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলে মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের নিয়মিত খবর প্রদান করতে শুরু করেন তিনি। তার খবরাখবরের ভিত্তিতে একাধিক অপারেশনে সফল হয় মুক্তিবাহিনী। একসময় জীবন নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়লে এলাকা ছেড়ে চলে যান ভারতের মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে। নিজের জীবনবাজি রেখে দেশমাতৃকার জন্যে কাজ করে যাওয়া সায়েরা বেগম গত ৭-৮ বছর ধরে এ নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় ও জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলে আবেদন-নিবেদন করছেন। অনেক চেষ্টার পর ভাতা পাওয়ার তালিকায় নাম উঠলেও সেটিও বন্ধ হয়ে যায় বছর তিনেক পর।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলার পাহাড়পুর ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী সেজামুড়া গ্রাম। পাহাড়-টিলার ঢালুতে বসবাস সায়েরা বেগমের। মুক্তিযুদ্ধের সময় বয়স ছিল পনের কি ষোল। যুদ্ধ দিনের স্মৃতি এখনো জ্বলজ্বলে তার চোখে। সায়েরা বলেন, ‘ভাটি এলাকা পেটুয়াজুড়িতে ছিলাম তখন। সেখানে ভাত-পানি না খেতে পেরে চলে আসি গোয়ালনগর গ্রামে। এখানে আসার পর আমার বাপ, ভাই ও আত্মীয়-স্বজনকে পাঞ্জাবিরা ধরে নিয়ে যায়। তাদের দিয়া বাঙ্কার-টাঙ্কার কুড়াইতো। দীর্ঘদিন যাবৎ তারা এভাবে আইতাছে, যাইতাছে। আমি আমার বাপের কাছ থেকে ক্যাম্পের তথ্য-বিধি জেনে মুক্তিবাহিনীর লোকদের বলতাম। এরপর একদিন মুক্তিবাহিনীর লোকজন আমার মা, ভাই ও আমারে ইন্ডিয়া মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে সায়ীদ স্যারের কাছে নিয়া যায়। সেখানে স্যার জানতে চাইলে বলি মানুষ ৬০-৭০ জন হবে। কীভাবে কাজটা করতে হবে জিজ্ঞাসা করলে জানাই, পুব থেকে, দক্ষিণ দিক থেকে পশ্চিম দিকে ঘুরাইয়া কাজটা করলে ভালো হবে। অস্ত্র কী আছে জানতে চাইলে বলি, তিন ঠ্যাংওয়ালা আর চোঙ্গামতো। এরপর তিনি আইডিয়া করে নেন। তখন অস্ত্রের নাম জানতাম না। এরপর উনারা যুদ্ধ জয় করেন।’

মুক্তিযুদ্ধে সায়েরার অবদান নিয়ে যুদ্ধকালীন ৩নং সেক্টরের সাব-সেক্টর কমান্ডার মেজর জেনারেল সায়ীদ আহমেদ বীরপ্রতীক তার দেওয়া প্রত্যয়নে বলেন, ‘নিজের জীবনবাজি রেখে সায়েরা স্বাধীনতা যুদ্ধে সক্রিয় অবদান রেখেছেন। মুকন্দপুর শত্রুবাহিনীর ক্যাম্প কমান্ডারের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে তিনি আমার অধীনস্থ মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের সহায়তা করেন। ক্যাম্পে অবস্থানরত শত্রুর সংখ্যা, প্রতিরক্ষা অবস্থান, অস্ত্রশস্ত্র, ক্যাম্প অধিনায়কসহ সৈনিকের মনোবল সম্পর্কে তার প্রদত্ত সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে ১৯৭১ সালের ১৮ ও ১৯ নভেম্বর মুকন্দপুরে শত্রুদের ওপর আক্রমণ করা হয়। এতে বহু পাকসেনা আহত হয় এবং ২৯ জনকে বন্দি করা হয়। মুকন্দপুর শত্রুমুক্ত হয়।’

মোক্তাদির চৌধুরী বলেন, ‘মুক্তিযুক্ত মন্ত্রণালয়ে কতবার যে সায়েরার জন্য সুপারিশ করেছি ও প্রত্যয়নপত্র জমা দিয়েছি, তার হিসাব নেই। গত সপ্তাহেও মন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছি। কিন্তু আমার মনে হয় সবই বৃথা হতে চলেছে। জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে যে কমিটি আছে ২০১৫ সালে সেই কমিটি তাকে ভাতা প্রদানের অনুমোদন দেয়। কিন্তু ২০১৮ সালে বর্তমান মন্ত্রী মোজাম্মেল হক ব্যক্তিগতভাবে উদ্যোগ নিয়ে তার ভাতা বন্ধ করে দেন। জেলা প্রশাসনের সুপারিশ আছে, আমাদের কমিটির সুপারিশ আছে; তাহলে তারা কি হাওয়া থেকে এসব বিষয় যাচাই-বাছাই করেন। আমি একজন সংসদ সদস্য এবং মুক্তিযোদ্ধা। ২০১৩ সাল থেকে এ নিয়ে বারবার তাদের কাছে গিয়েছি। তখন একজন মন্ত্রী ছিলেন, এখনো একজন মন্ত্রী আছেন। কিন্তু আমাদের গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। যতবারই জানাই তখন বলেন, আমি ফাইলটা দেখে নিই। সচিবের কাছে গেলে তিনি বলেন, ‘এটা আমার কাজ না জামুকার কাজ।’ সায়েরা বেগম যেকোনো সময় মারা যেতে পারেন, তার বয়স হয়েছে। তাহলে এটা আমাদের জন্য হবে লজ্জাজনক ও দুঃখজনক। আমি মনে করি পরিপূর্ণভাবে এর তদন্ত হওয়া উচিত। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমি এই আবেদন করছি।’

স্থানীয় পাহাড়পুর ইউনিয়নের ডেপুটি কমান্ডার মো. ফুল মিয়া বলেন, ‘সায়েরার খবরাখবরের ভিত্তিতেই আমাদের অপারেশন সফল হয়। সে জীবনবাজি রেখে আমাদের সহায়তা করেছেন। তার মতো সাহসী মুক্তিযোদ্ধার ভাতা বন্ধ হওয়ায় আমরা ব্যথিত হয়েছি।’ ৭নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ফয়সাল আহমেদ বাছির বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে সায়েরা বেগমের সাহসিকতার গল্প আমরা বাপ-দাদাদের মুখে শুনেছি। ভাতা বন্ধ করে দেওয়ায় অনেক কষ্টে রয়েছেন তিনি।’

বিজয়নগর উপজেলা যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক রাসেল খান বলেন, ‘সায়েরা বেগম আমাদের এলাকার গর্ব। আমরা ছোটবেলা থেকেই তাকে বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে জেনে-সম্মান করে এসেছি। ভাতা বন্ধ হওয়ায় তিনি মানবেতর জীবনযাপন করছেন। আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে তার ভাতা চালু করার জন্য আকুল আবেদন করছি।’

এ ব্যাপারে বিজয়নগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কে এম ইয়াসির আরাফাত বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের সার্কুলার বলেই ভাতা বন্ধ রয়েছে। এ বিষয়ে তারা আপিল করেছেন। আমরা স্থানীয় এমপি মোক্তাদির চৌধুরীর সহায়তায় বীর মুক্তিযোদ্ধা সায়েরা বেগমের খোঁজখবর রাখছি।’