ঢাকায় বিনা প্রয়োজনে বের হয়ে গ্রেপ্তার ৫৫০

করোনার সংক্রমণ রোধে সরকারি কঠোর বিধিনিষেধের প্রথম দিনে গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীতে বিনা প্রয়োজনে বের হওয়ায় ৫৫০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ডিএমপির আট বিভাগে বিধিনিষেধ অমান্য করায় তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।

গতকাল বিধিনিষেধ বাস্তবায়নে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি), ট্রাফিক বিভাগ, ক্রাইম বিভাগ, ভ্রাম্যমাণ আদালতের পাশাপাশি সেনাবাহিনী, র‌্যাব ও বিজিবির সদস্যরা কঠোর অবস্থান নেন। বিভিন্ন সড়কে সরকারি ও বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের গাড়ির সঙ্গে ভ্যান-রিকশা চলতে দেখা যায়। প্রাইভেট কারের সংখ্যা ছিল খুবই নগণ্য।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জেরায় বাইরে বের হওয়া বেশিরভাগ মানুষ জরুরি প্রয়োজনের ব্যাখ্যা দেন। এদের কেউ কেউ অজুহাত দেখিয়ে পার পাওয়ার চেষ্টা করেন। তবে ধরা পড়ে অনেকের ভাগ্যে জুটেছে জেল-জরিমানা।

ডিএমপি সূত্রে জানা গেছে, গতকাল সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ট্রাফিক বিভাগ, ক্রাইম বিভাগ ও ভ্রাম্যমাণ আদালত ডিএমপির আটটি বিভাগ থেকে ৫৫০ জনকে গ্রেপ্তার করে। এ সময় ব্যক্তি, যানবাহন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়েছে ৪ লাখ ৬৩ হাজার ৫০ টাকা। গাড়ির মামলা হয়েছে ২৭৪টি। আর গাড়ি জব্দ ৬টি ও রেকারিং হয়েছে ৭৭টি।

এ বিষয়ে ডিএমপির তেজগাঁও ডিভিশনের উপকমিশনার মো. শহিদুল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিধিনিষেধ অমান্য করে অনেকেই বিনা প্রয়োজনে বাইরে এসেছেন। কিছু ক্ষেত্রে ছাড় দিলেও অনেককে আটক করেছি। তাদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

সরেজমিনে গতকাল সকাল থেকে বাংলামোটর, মগবাজার, ফার্মগেট, মৌচাক, শান্তিনগর, কাকরাইল, নয়াপল্টন, ফকিরাপুল, বিজয়নগর, মিরপুর, আজিমপুর, বাড্ডা, রামপুরা, শাহবাগ, ধানমণ্ডি, হাতিরপুল ঘুরে দেখা গেছে সড়কের মোড়ে মোড়ে পুলিশের চেকপোস্ট। কোথাও কোথাও কাঁটাতারের ব্যারিকেড রয়েছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কাউকে রাস্তায় থাকতে দেওয়া হচ্ছে না। রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে পুলিশের পাশাপাশি সেনাবাহিনী ও বিজিবি সদস্যদের দেখা গেছে। বিভিন্ন সড়কে তারা টহল দিয়েছেন।

বিধিনিষেধ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে গতকাল ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা। সকাল পৌনে ১০টার দিকে রাজধানীর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের রায়েরবাগ বাসস্ট্যান্ড চেকপোস্টে একটি প্রাইভেট কারকে থামায় পুলিশ। এতে গাদাগাদি করে ছয়জন বসে আছেন। লকডাউনে কেন বের হয়েছেন, দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তা জানতে চাইলে বয়স্ক এক ব্যক্তি চিকিৎসাপত্রের ফাইল এগিয়ে দেন। সেখানে দেখা যায়, গত ২৫ জুন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রোগীকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি স্মরণ করিয়ে তিনি জানতে চান, আজ (গতকাল) কোথায় যাচ্ছেন? এবার ওই ব্যক্তি সামনের সিটে বসা মধ্যবয়স্ক আরেকজনের চিকিৎসা চলছে বলে জানান। কিন্তু তার চিকিৎসার কোনো কাগজপত্র তারা দেখাতে পারেননি। তবে তাদের অনুনয়-বিনয়ের একপর্যায়ে পুলিশ কর্মকর্তা গাড়িটি ছেড়ে দেন।

এই মহাসড়কে পণ্যবাহী যান ছাড়াও প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস, মোটরসাইকেল ও রিকশা চলাচল করতে দেখা গেছে। পুলিশ এসব গাড়ি থামালেও সবাই কোনো না কোনো অজুহাত দেখাচ্ছেন। তবে বাইরে বের হওয়ার কারণ একেবারে অযৌক্তিক হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিচ্ছে পুলিশ।

রায়েরবাগ চেকপোস্টে দায়িত্বরত ডেমরা ট্রাফিক জোনের সার্জেন্ট মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমাদের মূল চেকপোস্ট এই মহাসড়কের কুবা মসজিদ এলাকায়। সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী যাদের অনুমোদন রয়েছে, আমরা তাদের যেতে দিচ্ছি। বাকিদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিচ্ছি।’ তিনি বলেন, ‘বিদেশফেরতদের গাড়ি আসছে, আমরা ছেড়ে দিচ্ছি। শিল্পকারখানার কর্মী বহনকারী গাড়িও চলতে দিচ্ছি।’

গতকাল দুপুর ১২টায় মিরপুরের দারুস সালাম রোডে একজন ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে র‌্যাব-৪ বিধিনিষেধ বাস্তবায়নে কাজ করে। ঝুম বৃষ্টির মধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান শুরু হয়। গাড়ি, কাভার্ড ভ্যান ও রিকশা থামিয়ে যাত্রীদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন র‌্যাব সদস্যরা। এ সময় অনেকেই বের হওয়ার যৌক্তিক কারণ দেখাতে পারেননি। এ ছাড়া দুই আরোহীর বেশ কয়েকটি মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়। তবে নিয়ম অমান্যকারীদের জরিমানার পরিবর্তে বুঝিয়ে ফেরত পাঠানোর প্রবণতা বেশি দেখা গেছে।

বাইরে বের হওয়া যাত্রীরা অফিস, চিকিৎসার অজুহাতে বের হয়েছেন বলে জানান। র‌্যাব সদস্যরা কাগজ ও উপযুক্ত প্রমাণ চাইলে অনেকেই তা দেখাতে পারেননি। এ সময় একটি গাড়িকে আধাঘণ্টা সময় দণ্ড ও মাস্ক না পরায় এক ব্যক্তিকে ১ হাজার টাকা জরিমানা করে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত।

র‌্যাব-৪-এর প্রধান মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক বলেন, ‘অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মতো তাদের সদস্যরা ভোর থেকে লকডাউন কার্যকরে মাঠে অবস্থান নেন। নিজের নিরাপত্তার জন্য লকডাউনে মানুষকে ঘরে থাকতে হবে, এটা মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি। আজ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বেশি লক্ষ করেছি। যাদের মাস্ক ছিল না, তাদের মাস্ক দিয়েছি। বিনা কারণে রাস্তায় বের হলে তাদের জরিমানা করেছি।’

র‌্যাব-৪-এর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আনিসুর রহমান বলেন, ‘কঠোর বিধিনিষেধ কার্যকরে আমরা অভিযান পরিচালনা করছি। যেসব গাড়ি বের হচ্ছে, তাদের মালিকদের কাছে উপযুক্ত কারণ যাচাই করা হচ্ছে। যৌক্তিক কারণ জানালে চলাচলে অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। না পারায় কয়েকজনকে জরিমানা করা হয়েছে।’