ঢাকার বাইরে করোনা

অক্সিজেনের চাহিদার সঙ্গে রোগীর মৃত্যু বাড়ছে

করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের মধ্যে এক দিনে সর্বোচ্চ মৃত্যু দেখল দেশ। গত বুধবার সকাল থেকে বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় কেবল খুলনা বিভাগেই ৪৬ জনের মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এদিন ঢাকায়ও ৩৫ জনের প্রাণ নিয়েছে এ ভাইরাস। মৃত্যু বেড়েছে রাজশাহী, বরিশাল ও চট্টগ্রামেও। এর মধ্যে খুলনা ও ঢাকা বিভাগের দুই জেলায় অক্সিজেন সংকটের কারণে তুলনামূলক বেশি মৃত্যু হয়েছে। সাতক্ষীরায় রেকর্ড ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে আলোচ্য সময়ে। এর মধ্যে আটজনের মৃত্যু হয়েছে অক্সিজেন সংকটে। আর টাঙ্গাইলে যে রেকর্ড ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে তার জন্যও অক্সিজেন সংকটকে দায়ী করেছেন স্বজনরা।

এদিকে গতকাল খুলনার হাসপাতালগুলোয় অক্সিজেন সরবরাহ করা প্রতিষ্ঠানগুলো জানিয়েছে, জেলায় গত মে মাসের তুলনায় সদ্য শেষ হওয়া জুন মাসে অক্সিজেনের চাহিদা বেড়েছে অন্তত ৪ গুণ। রোগী যে হারে বাড়ছে তাতে আগামীতে এই চাহিদা আরও বাড়বে। শুধু খুলনা নয় দেশের অনেক এলাকার চিত্র একই। এ অবস্থায় অক্সিজেন সরবরাহসহ হাইফ্লো নেজাল ক্যানুলার ব্যবস্থা বাড়ানো না গেলে ভবিষ্যতে আরও খারাপ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

টাঙ্গাইলের রেকর্ড মৃত্যু : গত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় আক্রান্ত হয়ে টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া করোনা ওয়ার্ডে ভর্তি হওয়া আরও নয়জন করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা যান। টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে করোনা ওয়ার্ডে ভর্তি হওয়া রোগীর স্বজনরা অভিযোগ করেন, করোনা ওয়ার্ডে পর্যাপ্ত চিকিৎসা সেবা পাচ্ছেন না। এ ছাড়া অক্সিজেনের সমস্যা রয়েছে।

তবে রোগীর স্বজনদের অভিযোগ অস্বীকার করেন হাসপাতালটির আবাসিক মেডিকেল অফিসার শফিকুল ইসলাম সজীব। তিনি দেশ রূপান্তকে বলেন, হাসপাতালটিতে গতকাল যাদের মৃত্যু হয়েছে তাদের বেশিরভাগই আক্রান্ত হওয়ার পর বাসায় ছিলেন। অবস্থা বেশি খারাপ হওয়ার পরেই হাসপাতালে আসেন তারা। কিন্তু তখন আমাদের আর করার কিছু ছিল না।

এই চিকিৎসক সরাসরি অক্সিজেন সংকটের কথা স্বীকার না করলেও বলেন, হাইফ্লো নেজাল ক্যানুলার সংকট রয়েছে হাসপাতালে। রোগী যে হারে বাড়ছে তাতে আগামীতে তীব্র সংকট দেখা দিতে পারে। সে ক্ষেত্রে মৃত্যু বাড়তে পারে হু হু করে।

জেলার সিভিল সার্জন ডা. আবুল ফজল মো. সাহাবুদ্দিন খান জানান, জেলায় করোনা সংক্রমণের হার ৪০ দশমিক ৯২ শতাংশ। মোট করোনা রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৯৬৪ জন। এ পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে ১১৫ জনের।

খুলনা বিভাগে মৃত্যুর রেকর্ড, চাহিদা বেড়েছে অক্সিজেনের : খুলনা বিভাগে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় ৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এখন পর্যন্ত এটিই বিভাগে এক দিনে সর্বোচ্চ মৃত্যু। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় তথ্য মতে, এই সংখ্যা ৪৬। এদিকে গত বুধবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বিভাগে নতুন করে ১ হাজার ২৪৫ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। বিভাগে আরটি-পিসিআর, জিন এক্সপার্ট, র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন এই তিন পদ্ধতিতে মোট ৩ হাজার ৩০৮ জনের নমুনা পরীক্ষা হয়েছে। নমুনা পরীক্ষার তুলনায় রোগী শনাক্তের হার ৩৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ। বিভাগে এখন পর্যন্ত মোট শনাক্তের সংখ্যা ৫৭ হাজার ৫২০।

আগের দিনের তুলনায় খুলনায় শনাক্তের হার কিছুটা কমলেও মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে। আগের ২৪ ঘণ্টায় বিভাগে ২৭ জনের মৃত্যু হয়েছিল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া ৩৯ জনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি খুলনা জেলার ৮ জন রয়েছেন। এদিকে কুষ্টিয়া ও যশোরে সাতজন করে মারা গেছেন। এরপর সাতক্ষীরা ও ঝিনাইদহে চারজন করে রয়েছেন। তবে সাতক্ষীরা প্রতিনিধি জানিয়েছেন এই সময়ে জেলায় উপসর্গ নিয়ে আরও অন্তত ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। জেলায় এক দিনে এত বেশি মৃত্যুর কারণ বুধবার জেলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অক্সিজেন সরবরাহে সংকট দেখা দেয়। যার কারণে অন্তত ৮ জনের মৃত্যু হয়।

এদিকে বিভাগের একাধিক হাসপতালে শয্যা ও অক্সিজেন সংকটের কারণে রোগী ভর্তি বন্ধ রেখেছে বলে খবর পাওয়া গেছে।

খুলনার বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) ফেরদৌসী আক্তার বলেন, কয়েক দিন ধরে মৃত্যুর ঘটনা বাড়ছে। এখন পর্যন্ত আজ মৃত্যুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। শনাক্ত রোগীর চেয়ে সুস্থ হওয়ার হার অনেক কম থাকায় চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে। বাসার পাশাপাশি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে। স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে না মানলে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাবে বলে মনে করেন তিনি।

এদিকে খুলনার হাসপাতালে অক্সিজেন সরবরাহ করা স্পেক্ট্রা লিমিটেড খুলনার বিভাগীয় ভাণ্ডার কর্মকর্তা সজীব রায়হান জানান, মে মাসের তুলনায় জুন মাসে অক্সিজেনের চাহিদা ছিল চার গুণ। এখন তা আরও বেড়েছে। যারা হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসার সুযোগ পাচ্ছেন না, তারা বাসায় বসে চিকিৎসার জন্য সিলিন্ডার নিচ্ছেন। খুলনার হাসপাতালগুলোয় হঠাৎ রোগী বেড়ে যাওয়ায় অস্বাভাবিক চাপ তৈরি হয়েছে বলে জানান তিনি।

রাজশাহী বিভাগে শনাক্তে রেকর্ড : রাজশাহী বিভাগে এক দিনে আবার রেকর্ড করোনা শনাক্ত হয়েছে। বুধবার সকাল ৮টা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ২৭৯ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। এর আগে গত ২৯ জুন ১ হাজার ৫৯ জনের করোনা শনাক্ত হয়। ওই দিন পর্যন্ত সেটাই ছিল সর্বোচ্চ শনাক্তের সংখ্যা। এদিকে, গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগে করোনায় আক্রান্ত হয়ে ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে বিভাগে করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৯০।

তবে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে গত ২৪ ঘণ্টায় ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৫ জনের করোনায় মৃত্যু হয়েছে। ১৬ জন করোনা উপসর্গ নিয়ে ও ১ জন করোনা নেগেটিভ হওয়ার পর মারা গেছেন। আগের ২৪ ঘণ্টায় একই ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১২ জনের মৃত্যু হয়।

এদিকে নতুন শনাক্তদের মধ্যে ২৪ ঘণ্টায় রাজশাহীতে সর্বোচ্চ ৩৭৭, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ২৯, নওগাঁয় ১১০, নাটোরে ২২৫, জয়পুরহাটে ৯৩, বগুড়ায় ১৩৪, সিরাজগঞ্জে ১১৯ ও পাবনায় ১৯২ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। এ নিয়ে বিভাগে মোট করোনা রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৭ হাজার ৩৩। স্বাস্থ্য বিভাগের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত বছরের ২৬ এপ্রিল রাজশাহী বিভাগে প্রথম করোনা রোগী মারা যান। এর মধ্যে গত বছর (৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত) বিভাগে মারা যান ৩৬৬ জন। আর এ বছর এখন পর্যন্ত মারা গেছেন ৫২৪ জন। এর মধ্যে জুন মাসেই মারা গেলেন ৩২৬ জন।

চট্টগ্রামে রেকর্ড শনাক্ত : চট্টগ্রামে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হয়ে পাঁচ ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। একই সময় নতুন করে ৫৫২ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে। চট্টগ্রামে আগে কখনো এক দিনে এত রোগী শনাক্ত হয়নি। পরীক্ষার তুলনায় করোনা শনাক্তের হার ২৭ শতাংশ। বৃহস্পতিবার সকালে জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো করোনাসংক্রান্ত সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। গত ১২ এপ্রিল চট্টগ্রামে এক দিনে সর্বোচ্চ ৫৪১ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছিল। এর আগে ১০ এপ্রিল ৫২৩ জনের শনাক্ত হয়। কিন্তু গত ২৪ ঘণ্টায় অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে সর্বোচ্চ রোগী শনাক্ত হলো।

সিলেট বিভাগে ৭ জনের মৃত্যু : সিলেট বিভাগে ২৪ ঘণ্টায় করোনায় ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। বুধবার সকাল ৮টা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত তাদের মৃত্যু হয়। একই সময়ে নতুন করে ১৯৯ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্র জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগে ৬৮৪ জনের নমুনা পরীক্ষায় ১৯৯ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। শনাক্তের হার ২৯ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। নতুন শনাক্ত হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে সিলেট জেলার ১৪৭, সুনামগঞ্জের ১১, হবিগঞ্জের ১২, মৌলভীবাজারের ২৯ জন রয়েছেন। বিভাগে এখন পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ২৫ হাজার ৯৮১ জন। সুস্থ হয়েছেন ২৩ হাজার ৬৭২ জন। করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ৪৭৮ জন।

রংপুর বিভাগে মৃত্যু ১০, শনাক্ত ৪৬৫ : রংপুর বিভাগে গত ২৪ ঘণ্টায় (বুধবার সকাল ৮টা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা) করোনায় সংক্রমিত আরও ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে করোনা শনাক্ত হয়েছে নতুন ৪৬৫ জনের। মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে দিনাজপুরের চার, লালমনিরহাটের তিন, ঠাকুরগাঁওয়ের দুই ও গাইবান্ধার একজন। স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ১ হাজার ১৪০ জনের নমুনা পরীক্ষায় নতুন ৪৬৫ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে দিনাজপুর জেলার ১৫১, ঠাকুরগাঁওয়ের ১০৮, নীলফামারীর ৩৭, পঞ্চগড়ের ১৫, কুড়িগ্রামের ৩৩, লালমনিরহাটের ১৯, গাইবান্ধার ২৫ ও রংপুরের ৭৭ জন। এ নিয়ে বিভাগে মোট করোনা শনাক্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়াল ২৬ হাজার ৪৪৫। শনাক্তের হার ৪০ দশমিক ৭৯। আর নতুন ১০ জন নিয়ে বিভাগে করোনায় সংক্রমিত হয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তির সংখ্যা দাঁড়াল ৫২৯।

বরিশাল বিভাগে আরও ১২ জনের মৃত্যু : বরিশাল বিভাগে ২৪ ঘণ্টায় করোনায় ও উপসর্গ নিয়ে ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ছয়জন করোনায় ও বাকি ছয়জন উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন। একই সময়ে ১ হাজার ৭ জনের নমুনা পরীক্ষায় ২৮৬ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। বৃহস্পতিবার বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে এ তথ্য জানা যায়। স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২৪ ঘণ্টায় বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ছয়জন উপসর্গ নিয়ে এবং একজন করোনায় মারা গেছেন। এ ছাড়া পিরোজপুরে চার ও পাটুয়াখালীতে একজন করোনায় মারা গেছেন। এর আগের ২৪ ঘণ্টায় বিভাগে ৯ জনের মৃত্যু হয়। গত ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ৭ জনের নমুনা পরীক্ষায় ২৮৬ জনের করোনা শনাক্ত হয়। শনাক্তের হার ২৮ দশমিক ৪০ শতাংশ। এর আগের ২৪ ঘণ্টায় বিভাগে ৫৭৬ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ২০৮ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছিল। শনাক্তের হার ৩৬ দশমিক ১১ শতাংশ।