টানা তৃতীয় দিনের মতো আট হাজারের বেশি কভিড রোগী শনাক্ত হয়েছে দেশে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, টানা ষষ্ঠ দিনের মতো মৃত্যু হয়েছে শতাধিক করোনা রোগীর। তবে দেশের বিভিন্ন এলাকার হাসপাতাল থেকে পাঠানো তথ্য বলছে, মৃত্যুর এই সংখ্যা আরও বেশি। কোনো কোনো হাসপাতালে আক্রান্ত রোগীদের তুলনায় উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু তিন থেকে চার গুণ বেশি। উদ্বেগজনক হারে বাড়তে থাকা শনাক্ত হারের সঙ্গে বাড়তে থাকা উপসর্গে মৃত্যুর সংখ্যার উল্লম্ফন ভয় বাড়াচ্ছে মফস্বলে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যত দ্রুত সম্ভব টেস্টের সংখ্যা বাড়িয়ে আক্রান্তদের আইসোলেশনে নিতে হবে। তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। মহামারীর ভয়াবহতা থামানোর কোনো সুযোগই থাকবে না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার সারা দিনে নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ৩০ হাজারের বেশি, তাতে শনাক্তের হার বেড়ে ২৮ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগেই গত এক দিনে ৩ হাজার ৮৪১ জন নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে। চট্টগ্রাম আর খুলনাতেও হাজারের বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত এক দিনে কেবল খুলনা বিভাগেই মারা গেছেন ৩৫ জন; ঢাকা বিভাগে ৩০ জনের প্রাণ নিয়েছে এ ভাইরাস। এছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগে ২৪ জন, রাজশাহী বিভাগে ২৪ জন, রংপুর বিভাগে ৯ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৬ জন, বরিশাল বিভাগে ২ জন এবং সিলেট বিভাগে ২ জনের মৃত্যু হয়েছে গত এক দিনে। তবে খুলনা, বরিশাল, ময়মনসিংহ, রাজশাহীসহ আরও কয়েকজন জেলা প্রতিনিধির পাঠানো মৃত্যুর তথ্যের সঙ্গে বিস্তর ফারাক রয়েছে অধিদপ্তরের তথ্যে।
বরিশালে উপসর্গে ৬ মৃত্যু : বরিশাল বিভাগে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনা পজিটিভ ও উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন ৭ জন। এর মধ্যে উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন ৬ জন। বাকি একজন বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডের আইসোলেশনে পজিটিভ হয়ে মারা যান। পাশাপাশি ২৪৮ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। শনাক্তের দিক দিয়ে বরিশাল বিভাগে এটাই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সংক্রমণ। শনাক্তের হার ৩৪ দশমিক ৭৩ শতাংশ।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে বরিশাল জেলায়। এই জেলায় ১১১ জনের করোনা শনাক্ত হযেছে। এ নিয়ে বরিশাল জেলায় মোট শনাক্ত হয়েছে ৭ হাজার ৯৮৯ জন। এর পরেই আছে পিরোজপুর জেলা। পিরোজপুরে ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত হয়েছে ৫৬ জন। এ নিয়ে পিরোজপুরে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়াল ২ হাজার ৩৩১ জন। তৃতীয় সর্বোচ্চ রোগী শনাক্ত হয়েছে ঝালকাঠি জেলায় ৩২ জন। এ নিয়ে এই জেলায় মোট শনাক্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৭৭৮ জন। এ ছাড়া বরগুনা জেলায় নতুন ২৩ জন নিয়ে মোট আক্রান্ত ১ হাজার ৪৬৫ জন, পটুয়াখালী জেলায় নতুন ১৮ জন নিয়ে মোট ২ হাজার ৫০৩ জন, ভোলা জেলায় নতুন ৮ জনসহ মোট শনাক্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬৮ জন।
গত ২৪ ঘণ্টায় সকাল পর্যন্ত শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডের আইসোলেশনে ৩১ জন ও করোনা ওয়ার্ডে ১১ জন ভর্তি হয়েছেন। এ নিয়ে করোনা ও আইসোলেশন ওয়ার্ডে বর্তমানে ১৬৫ জন রোগী চিকিৎসাধীন আছেন। এদের মধ্যে ৩৩ জনের করোনা পজিটিভ এবং ১৩২ জন আইসোলেশনে রয়েছেন।
ময়মনসিংহ মেডিকেলে ১৪ মৃত্যুর ৭ জনই উপসর্গ নিয়ে : গত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় সাতজন ও উপসর্গে সাতজন মারা গেছেন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালের করোনা ইউনিটে। গতকাল শুক্রবার হাসপাতালের করোনা ইউনিটের ফোকালপারসন ডা. মহিউদ্দিন খান মুন এ তথ্য নিশ্চিত করেন। ডা. মহিউদ্দিন খান মুন আরও বলেন, হাসপাতালের করোনা ইউনিটের আইসিইউতে ১৩ জনসহ ২৩৮ জন রোগী চিকিৎসাধীন আছেন। নতুন ভর্তি হয়েছেন ৪২ জন ও সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ২৬ জন।
এদিকে ময়মনসিংহ জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পিসিআর ও অ্যান্টিজেন টেস্টে ৬২১ নমুনা পরীক্ষা করে নতুন শনাক্ত হয়েছেন ১৪৭ জন।
রামেক হাসপাতালে ১৭ মৃত্যু : রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ইউনিটে এক দিনে আরও ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার সকাল থেকে গতকাল শুক্রবার সকালের মধ্যে তাদের মৃত্যু হয়। মৃত ১৭ জনের মধ্যে ১২ জনের করোনা পজিটিভ ছিল। ৫ জন ভর্তি ছিলেন করোনার উপসর্গ নিয়ে। মৃতদের মধ্যে রাজশাহীর ১০ জন, ৩ জন চাঁপাইনবাবগঞ্জের, নাটোরের ২ জন, নওগাঁর ১ জন ও পাবনার ১ জন। হাসপাতালটিতে গত দুই দিনে ৩৯ জনের মৃত্যু হলো।
করোনা ইউনিটে গত ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত হয়ে ৭৬ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন। গতকাল সকালে ৪৬৮ জন চিকিৎসা নিচ্ছেন। করোনা বিশেষায়িত ইউনিটে শয্যাসংখ্যা ৪০৫টি। গত ২৪ ঘণ্টায় মৃতদের মধ্যে ৭ জন নারী, ১০ জন পুরুষ। জুন মাসে এ হাসপাতালের করোনা ইউনিটে মারা যান ৩৫৫ জন। এর মধ্যে করোনা শনাক্ত হয়ে মারা যান ১৬৮ জন। বাকিরা উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
খুলনা বিভাগে ২৭ জনের মৃত্যু : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ব্রিফিংয়ে খুলনা বিভাগে ৩৫ জনের মৃত্যুর তথ্য দেওয়া হলেও আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক জানিয়েছেন, খুলনা বিভাগে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ২৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এই সময়ে নতুন করে ১ হাজার ২০১ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তর সূত্র জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগের মধ্যে খুলনায় ৯ জন, কুষ্টিয়ায় ৭ জন, ঝিনাইদহে তিনজন, চুয়াডাঙ্গায় তিনজন, যশোরে দুজন, বাগেরহাটে, নড়াইল ও মেহেরপুরে একজন করে মারা গেছেন।
খুলনা সিভিল সার্জন অফিসের মেডিকেল অফিসার (রোগ নিয়ন্ত্রণ) ডা. শেখ সাদিয়া মনোয়ারা ঊষা জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় খুলনায় ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে ৪৯৫টি নমুনা পরীক্ষা করে ২২৩ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে, যা মোট নমুনা পরীক্ষার ৪৫ শতাংশ।
বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জেলাভিত্তিক করোনা সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ২৪ ঘণ্টায় খুলনায় করোনা শনাক্ত হয়েছে ২২৩ জনের। বাগেরহাটে নতুন করে করোনা শনাক্ত হয়েছে ৯৩ জনের। সাতক্ষীরায় ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে শনাক্ত হয়েছে ৪৯ জন। যশোরে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে শনাক্ত হয়েছে ২৮০ জন। ঝিনাইদহে ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে শনাক্ত হয়েছে ১৩২, মাগুরায় ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৪৬ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। নড়াইলে ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে শনাক্ত হয়েছে ৭৫ জন। কুষ্টিয়ায় ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে শনাক্ত হয়েছে ১৩৭ জন। চুয়াডাঙ্গায় ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে শনাক্ত হয়েছে ৯৪ জন। মেহেরপুরে নতুন করে শনাক্ত হয়েছে ৭৩ জন।
সিলেটে আরও ২ মৃত্যু : সিলেট বিভাগে গত বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে আরও ২ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে করোনা শনাক্ত হয়েছে আরও ৩০২ জনের শরীরে। শুক্রবার দুপুরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগীয় পরিচালক ডা. সুলতানা রাজিয়া স্বাক্ষরিত কভিড-১৯ সংক্রান্ত দৈনিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন শনাক্ত হওয়া ৩০২ জনের মধ্যে ১৭৭ জন সিলেটের, ৫২ জন মৌলভীবাজারের, ১০ জন সুনামগঞ্জের ও ২৫ জন হবিগঞ্জের। সিলেট বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে করোনায় আক্রান্ত ৩৭১ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
সিলেট বিভাগে এখন পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হিসাবে প্রমাণিত রোগীর সংখ্যা ২৬ হাজার ২৮৩ জন। এর মধ্যে সিলেট জেলার ৭ হাজার ৪০৯ জন, সুনামগঞ্জের ৩ হাজার ১৬ জন, হবিগঞ্জের ২ হাজার ৭৮১ জন ও মৌলভীবাজারের ৩ হাজার ৭৭ জন।