ক্যাপিটাল মার্কেট স্টাবিলাইজেশন ফান্ড

পর্ষদের কাঁধে পুঁজিবাজার স্থিতিশীল রাখার দায়িত্ব!

পুঁজিবাজার ঠিক রাখার দায়িত্ব পড়ছে পুঁজিবাজার স্থিতিশীলকরণ তহবিলের পরিচালনা পর্ষদের কাঁধে। তালিকাভুক্ত কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের বিনিয়োগকারীদের অবণ্টিত বা অদাবিকৃত লভ্যাংশ নিয়ে যে তহবিল গড়ে তোলা হচ্ছে, তা দিয়েই পুঁজিবাজার স্থিতিশীল করতে দায়বদ্ধ থাকবেন তারা। সম্প্রতি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (ক্যাপিটাল মার্কেট স্টাবিলাইজেশন ফান্ড) রুল, ২০২১ নামে বিধিমালা জারি করেছে, তাতে এমন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তহবিলটির পরিচালনা পর্ষদকে। যদিও এ তহবিলের শুধুমাত্র নগদ অর্থের একটি অংশ দিয়ে শেয়ার কেনাবেচা করতে পারবেন তহবিল ব্যবস্থাপক।

বিধিমালায় বলা হয়েছে, বাজারের তারল্য প্রবাহ এবং গভীরতা বাড়াতে তহবিলটি কাজ করবে। তহবিলটির আকার চূড়ান্ত না হলেও শেয়ার ও নগদ অর্থ মিলিয়ে এর আকার প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা হতে পারে, যার মধ্যে নগদ হিসাবে সর্বোচ্চ দুই হাজার কোটি টাকা হতে পারে। বিধিমালায় এ তহবিলের গঠন, উদ্দেশ্য ও ব্যবহার নিয়ে যে নির্দেশনা রয়েছে, তাতে করে তহবিলে থাকা নগদ অর্থের সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ দিয়ে সরাসরি তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজ কেনাবেচা করা যাবে, যা দিয়ে পুঁজিবাজার স্থিতিশীল করা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অবশ্য তহবিলে থাকা শেয়ারবাজার মধ্যস্থতাকারীদের ধার দেওয়া কিংবা তাদের কাছ থেকে ধার নেওয়া যাবে। 

এ প্রসঙ্গে এসইসির মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ রেজাউল করিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, কোনো বিনিয়োগকারীর দাবি বৈধ হলে এই তহবিল থেকে তা পরিশোধ করতে হবে। তাই এই তহবিল ব্যবহারের ক্ষেত্রে তহবিল পরিচালকরা যাতে অনেক বেশি সতর্ক থাকেন সে জন্যই এমন দায়বদ্ধতার কথা বলা হয়েছে। মূলত তহবিলের আকারের ওপরই নির্ভর করবে তা দিয়ে বাজারে স্থিতিশীলতা আনা যাবে কি-না। এটা এখনই বলা যাবে না, তারা পারবে কি-না।

যেহেতু তহবিলের একটি বোর্ড থাকবে, তাই তাদের ওপরই দায়দায়িত্ব বর্তাবে বলে জানান রেজাউল করিম। তহবিলটির নাম স্থিতিশীলকরণ ফান্ড-এর প্রধান উদ্দেশ্যও তাই। মূলত তারা মার্কেট মেকারের ইনফরমাল ভূমিকাও পালন করবে। এক্ষেত্রে স্থিতিশীলতার দায়িত্ব দেওয়ার মানে হচ্ছে, বাজার যদি অনেক বেশি ঊর্ধ্বমুখী ধারায় থাকে সেক্ষেত্রে তারা যাতে নতুন করে চাহিদা তৈরি করে আরও ওপরের দিকে ঠেলে না দেয়। আবার বাজার যদি নিম্নমুখী ধারায় থাকে, তাহলে যাতে বিক্রিচাপ না বাড়ায়। মোদ্দা কথা বাজার পরিস্থিতি বুঝে ভূমিকা পালন করা। বাজার বেশি ঊর্ধ্বমুখী ধারায় থাকলে শেয়ার বিক্রি করবে, আবার পরিস্থিতি খারাপ হলে শেয়ার কিনে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনবে। 

মূলত লভ্যাংশ ঘোষণা বা অনুমোদনের দিন বা রেকর্ড তারিখের পরবর্তী তিন বছর ইস্যুয়ার কোম্পানিতে পড়ে থাকা নগদ লভ্যাংশ, বোনাস শেয়ার, রাইট শেয়ার ও পাবলিক সাবস্ক্রিপশনে পড়ে থাকা অর্থ ক্যাপিটাল মার্কেট স্টাবিলাইজেশন ফান্ড পুঁজিবাজার স্থিতিশীলকরণ তহবিলে জমা হবে।

ক্যাপিটাল মার্কেট স্টাবিলাইজেশন ফান্ডের বিধিমালায় বলা হয়েছে, পুঁজিবাজার স্থিতিশীলকরণ তহবিল হবে একটি পার্পিচুয়াল বন্ড, যেটি বিনিয়োগকারীদের পক্ষে অবিতরণযোগ্য, অদাবিকৃত ও নিষ্পত্তিকৃত লভ্যাংশ (নগদ ও বোনাস) অথবা বরাদ্দ হয়নি এমন রাইট শেয়ার ও ফেরত দেওয়া হয়নি এমন পাবলিক সাবস্ক্রিপশন অর্থের রক্ষক হিসেবে কাজ করবে। তহবিলটির একটি পরিচালনা পর্ষদ থাকবে। পর্ষদের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে যে কোনো সংস্থা অথবা রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের অধীন পরিচালিত হবে।

বিধিমালা অনুযায়ী, স্থিতিশীলকরণ তহবিলটির ব্যবস্থাপনায় ১১ সদস্য বিশিষ্ট বোর্ড অব গভর্নরস থাকবেন, যার চেয়ারম্যান ছাড়াও তিনজন সদস্য মনোনীত করবে এসইসি। বাকি সদস্যরা মনোনীত হবেন দুই স্টক এক্সচেঞ্জ, সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি, সেন্ট্রাল কাউন্টার পার্টি, তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর সংগঠন বিএপিএলসি, চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্টস বা কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্টেন্টসদের সংগঠন আইসিএবি বা আইসিএমএবি থেকে। এছাড়া তহবিল প্রধানের পদ হবে চিফ অফ অপারেশন। তিনিও বোর্ড অব গভর্নরসে এক্সিকিউটিভ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। প্রথম বোর্ড গঠন করবে এসইসি।

তহবিল ও কমিশনের কাছে বোর্ডের দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহি থাকবে। তহবিলের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য বিনিয়োগ, বাজার মধ্যস্থতাকারী ও মার্কেট মেকারকে ঋণ সহায়তা, সিকিউরিটিজ ধার দেওয়া-নেওয়া, তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজ কেনাবেচা ও বিনিয়োগকারীর দাবি নিষ্পত্তিকরণের নীতিমালা তৈরি করবে বোর্ড। এসবের পাশাপাশি তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজ কেনাবেচা, অন্যান্য সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ, বাজার মধ্যস্থতাকারী ও মার্কেট মেকারকে ঋণ সহায়তার মাধ্যমে বাজারের তারল্য নিশ্চিত করে পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা নিশ্চিতেও দায়বদ্ধ থাকবে তহবিলটির পরিচালনা পর্ষদ। তহবিল সুচারু পরিচালনার জন্য অপারেশন ম্যানেজমেন্ট কমিটি, অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস ম্যানেজমেন্ট কমিটি ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কমিটিসহ বিভিন্ন সাবকমিটি গঠন করবে বোর্ড।

বিধিমালা অনুযায়ী, ‘ক্যাপিটাল মার্কেট স্টাবিলাইজড ফান্ড’ নামে যে কোনো তফসিলি ব্যাংকে একটি হিসাব খোলা হবে, যেখানে নগদ লভ্যাংশসহ অন্যান্য নগদ অর্থ জমা হবে। একই নামে সমন্বিত সিকিউরিটিজ অ্যাকাউন্ট অথবা বিও হিসাব থাকবে, যেখানে শেয়ার জমা হবে। এই বিও হিসাবের মাধ্যমে সিকিউরিটিজ ধার দেওয়া-নেওয়া হবে। তালিকাভুক্ত কোম্পানি থেকে বিনিয়োগকারীদের যেসব সিকিউরিটিজ তহবিলে স্থানান্তর করা হবে, সেগুলোতে বিনিয়োগকারীদের মালিকানার অধিকার বজায় রাখবে তহবিল। অর্থাৎ তহবিলে থাকা শেয়ার বিক্রি করা যাবে না, তবে বাজার মধ্যস্থতাকারীদের ধার দেওয়া যাবে। বিনিয়োগকারীদের শেয়ার দাবির নিষ্পত্তিও সংশ্লিষ্ট বিও হিসাব থেকেই করা হবে। 

বিধিমালা অনুযায়ী, বাজারের গভীরতা নিশ্চিত করতে তহবিলে থাকা শুধুমাত্র নগদ অর্থ দিয়ে সরাসরি শেয়ার কেনাবেচা করতে পারবে, তবে এক্ষেত্রে তহবিলের নগদ অর্থের সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ ব্যয় করা যাবে। তহবিলের নগদ অর্থের অবশিষ্ট অর্থের মধ্যে ন্যূনতম ৫০ শতাংশ বাজার মধ্যস্থতাকারীদের পুনঃঅর্থায়নের অংশ হিসেবে মার্জিন ঋণ দিতে পারবে। এছাড়া তহবিলের সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ অর্থ স্থায়ী আমানত, মিউচুয়াল ফান্ড, সরকারি সিকিউরিটিজ, ফিক্সড ইনকাম সিকিউরিটিজসহ বিভিন্ন সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করা যাবে। যদিও নগদ অর্থ ব্যবহারের এই হার তহবিলের আকার অনুযায়ী কমিশন সময়ে সময়ে বেঁধে দিতে পারবে। পুঁজিবাজার স্থিতিশীলতার স্বার্থে তহবিলটি সরকার কিংবা অন্য কোনো সংস্থা থেকে অনুদান অথবা ঋণ গ্রহণ করতে পারবে।

শেয়ার কেনাবেচায় মূলধনী মুনাফা, লভ্যাংশ, বাজার মধ্যস্থতাকারীদের দেওয়া ঋণের সুদ আয়, সিকিউরিটিজ ধার দেওয়া-নেওয়ায় মুনাফা, ব্যাংক আমানত থেকে সুদ আয় তহবিলের পরিচালন আয় হিসেবে গণ্য হবে। শেয়ার বেনাবেচায় লোকসান, বিনিয়োগ মূল্য কমে যাওয়া অথবা আনরিয়েলাইজ লোকসান হলে শতভাগ সঞ্চিতি রাখতে হবে। সব পরিচালন ব্যয় ও সঞ্চিতি সংরক্ষণের পর নিট পরিচালন আয় তহবিলে জমা হবে।      

কোম্পানিতে পড়ে থাকা বিনিয়োগকারীদের শেয়ার ও অর্থ তহবিলে স্থানান্তরের কমপক্ষে ৩০ দিন আগে শেয়ারহোল্ডারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে কোম্পানিকে। এছাড়া যাদের লভ্যাংশ তহবিলে স্থানান্তর হচ্ছে সেসব শেয়ারহোল্ডারদের বিও নম্বর, লভ্যাংশের পরিমাণসহ তাদের বিস্তারিত পরিচয় কোম্পানির ওয়েবসাইটে প্রকাশের পাশাপাশি দুটি জাতীয় দৈনিকে নোটিস আকারে ওয়েবলিঙ্কসহ প্রচার করবে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি।

যদি তহবিল থেকে বিনিয়োগকারীদের সমস্ত দাবি নিষ্পত্তি হয়, তাহলে কমিশনের আদেশ অনুসারে তহবিলটি গুটিয়ে ফেলা হবে।