৮০ শতাংশ মানুষকে বিনামূল্যে টিকা দেওয়া হবে : প্রধানমন্ত্রী

করোনা সংক্রমণের মধ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার দাবির বিষয়ে তিনি বলেন ‘স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় খোলার কথা বলার জন্য বলা যেতে পারে। কিন্তু এটাও একটু চিন্তা করতে হবে, লেখাপড়া শিখবে, এ জন্য জেনেশুনে ছেলেমেয়েদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেব কিনা।’

গতকাল শনিবার সংসদের ১৩তম বাজেট অধিবেশনের সমাপনী বক্তৃতায় সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন। এর আগে সংসদে বিরোধীদলীয় উপনেতা জি এম কাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার দাবি জানান। সরকারপ্রধান টিকা প্রসঙ্গে বলেন, টিকা কেনার জন্য যত টাকাই লাগুক দেশের মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় পর্যাপ্ত টিকার ব্যবস্থা করা হবে। বৈশ্বিক বাজারে চড়া দামে কিনলেও দেশের ৮০ শতাংশ মানুষকে বিনামূল্যে টিকা দেবে সরকার।

স্কুল-কলেজ খোলার ব্যাপারে বিরোধীদলীয় নেতা গোলাম মোহাম্মদ কাদেরের বক্তব্যের জবাবে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমরা ইতিমধ্যেই শিক্ষকদের টিকা দিয়েছি। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী কোন টিকা কোন বয়সে দিতে হয় সেটা অনুসরণ করতে হয়। তাদের পরামর্শ অনুযায়ী ইতিমধ্যেই আমরা শিশুদের টিকাদান শুরু করেছি।’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, যাদের ছোট ছোট ছেলেমেয়ে স্কুল কলেজ ইউনিভার্সিটিতে যায় তারাই কিন্তু চান না তাদের বাচ্চাদের স্কুলে পাঠাতে। তবে ইদানিং সবচেয়ে বেশি সোচ্চার যাদের ছেলেমেয়ে পড়ে না তারা। পড়ার মতো ছেলেমেয়ে নেই, তারাই বেশি কথা বলে।

তিনি বলেন, ‘ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া শিখবে। কিন্তু সেই লেখাপড়ার জন্য তাদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেব কিনা আমাদের মাননীয় সংসদ উপনেতা সেটা একটু বিবেচনা করবেন।’

বাচ্চারা পড়ালেখা করবে এটা আমরা চাই জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘স্কুল-কলেজ বন্ধ আছে। কিন্তু পড়ালেখা যাতে বন্ধ না হয় এজন্য  এই সংসদ টেলিভিশনের মাধ্যমে বিভিন্ন ক্লাস চালানো হচ্ছে। এছাড়া আমরা রেডিও উন্মুক্ত করে দিয়েছি। রেডিওর মাধ্যমে যাচ্ছে, অনলাইনে যাচ্ছে। যে যেভাবে সুযোগ পাচ্ছে পড়ালেখা করছে। আমরা পড়াশোনা চালিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছি। তাতে আমরা বলব একটু ক্ষতি হচ্ছে। টিকা দিয়ে আমরা কিন্তু স্কুলগুলো খুলে দেব। কিন্তু আমরা যখন ঠিক সিদ্ধান্ত নিলাম খুলব তখনই এই করোনাভাইরাস এমনভাবে মহামারী আকারে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ল আর তার ধাক্কাটা আসলো আমাদের দেশে।’

বিরোধীদলীয় উপনেতাকে উদ্দেশকে করে সংসদ নেতা বলেন, ‘বলার জন্য বলবেন সেটা ঠিক আছে। কিন্তু এই ছেলেমেয়েগুলোকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেব কিনা। আমাদের অনেক পরিচিতজন বিদেশে পড়ালেখা করে। আমার নাতিরা পড়ালেখা করে। সেখানে অনলাইনে পড়ালেখা চলে। কিছু দিন স্কুল খুলল আবার যখন মহামারী ছড়িয়ে পড়ল তখন আবার বন্ধ। এটা শুধু বাংলাদেশ না। এটা সারা বিশ্বে একই অবস্থা। এটা সবাইকে মানতে হবে।’

শিক্ষার জন্য সবচেয়ে বেশি কাজ কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারই করেছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘করোনায় এমন কোনো শ্রেণি-পেশার মানুষ নেই যাদেরকে সাহায্য দেওয়া হয়নি। যেহেতু আবার করোনা দেখা দিয়েছে আমরা সাধ্যমতো আবার সাহায্য করব। কারও খাদ্য ঘাটতি যাতে না হয় সে বিষয়ে আমরা লক্ষ রাখছি।’

করোনা প্রতিরোধে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছেন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘গত ঈদের সময় আমরা তাদেরকে দেশের বাড়িতে না আসার জন্য অনুরোধ করেছিলাম। কিন্তু সেই অনুরোধ তারা শুনেননি। তাতে ফলাফলটা কী? সারা দেশে করোনা ছড়িয়ে পড়ল। সবাই যদি আমাদের কথাটা শুনত আজকে এমনভাবে করোনা হতো না এটাই বাস্তবতা। মানুষ আসলে বাড়ি যেতে চায় এটাই সমস্যা।’

তিনি বলেন, ‘আমরা সাধ্যমতো মানুষের পাশে দাঁড়াতে চেষ্টা করে যাচ্ছি। শুধু সরকার না, আমাদের পার্টি আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে আমরা বিভিন্নভাবে সহযোগিতা মানুষকে করে যাচ্ছি। ইতিমধ্যে আমরা প্রণোদনা দিয়েছি বিভিন্ন খাতে। আর আমরা আর্থিক সহায়তা দিচ্ছি এবং এমন কোনো শ্রেণি-পেশার মানুষ নেই যাদেরকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়নি। যেহেতু করোনা আবার দেখা দিয়েছে আমাদের সাধ্যমতো আমরা আবার সেই সহযোগিতা দেব। কারও খাদ্যপ্রাপ্তিতে যাতে অসুবিধা না হয় অবশ্যই সেই বিষয়টা আমরা দেখব।

যত টিকা দরকার, কেনা হবে : করোনাভাইরাসের মহামারীতে দেশের মানুষকে রক্ষা করতে ‘যত টিকা দরকার তত টিকাই কেনা হবে’ বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। টিকার সংকটে দেশে টিকাদানে ছন্দপতনের প্রসঙ্গ ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘করোনাভাইরাসের প্রকোপ দেখা দেওয়ার পর যখনই বিশ্বে টিকা নিয়ে গবেষণা শুরু হয়, সরকার তখন থেকেই টিকা সংগ্রহের জন্য সব দেশে যোগাযোগ শুরু করেছিল। পাশাপাশি ভারত থেকে নগদ টাকা দিয়ে টিকা কেনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, সংক্রমণ প্রকট আকার ধারণ করলে ভারত রপ্তানি বন্ধ করে দেয়, ফলে বাংলাদেশ তখন কিছুদিন সমস্যায় পড়ে।’

পৃথিবীর অন্যান্য দেশ এবং টিকা উৎপাদনকারী কোম্পানির সঙ্গেও যোগাযোগ করা হচ্ছে জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আরও টিকা আমরা নিয়ে আসব কিনে। যত লাগে আমরা কিনব। তার জন্য আলাদা বাজেটে টাকা রাখা আছে। এর জন্য কোনো চিন্তা হবে না।’

সংসদ নেতা বলেন ‘আমরা চীন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান থেকে শুরু করে সব দেশের সঙ্গেই যোগাযোগ করছি। যেখানেই পাওয়া যাচ্ছে নিয়ে নিচ্ছি। আমাদের নিজেদের প্লেন পাঠিয়ে আমরা চীন থেকে সিনোফার্মের টিকা নিয়ে এসেছি। এভাবে আমরা কিন্তু সংগ্রহ করছি।’

দেশের ৮০ শতাংশ মানুষকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্যের কথা তুলে ধরে সরকারপ্রধান বলেন, ‘সব টিকা বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে। আমরা কিনছি অনেক টাকা দিয়ে। প্রথমে যেটা কিনেছিলাম সেটা... কিন্তু এখন আমাদের অনেক দাম দিয়ে কিনতে হচ্ছে। তারপরও জনগণের জন্য, জনগণের স্বার্থে, জনগণের কল্যাণে আমরা বিনামূল্যে টিকাদান কর্মসূচি নিয়েছি।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাজেটেও প্রচুর পরিমাণে টাকা আমরা রেখেছি। ৩২ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা রাখা হয়েছে। আরও ১০ হাজার কোটি টাকা আলাদা রাখা আছে রিজার্ভ, যদি লাগে আমরা সেটা ব্যবহার করব।’

স্বাস্থ্যবিধি পালনে জনগণের প্রতি অনুরোধ : করোনাভাইরাস মহামারী নিয়ন্ত্রণে সরকার সম্ভাব্য সব কিছু করলেও স্বাস্থ্যবিধি পালনে মানুষের উদাসীনতা দেখে হতাশা প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি আবারও সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি পরিপূর্ণভাবে মেনে চলার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, তাহলেই মহামারী নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।

কোরবানির ঈদের আগে রোজার ঈদের কথা স্মরণ করিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একটা সমস্যা হচ্ছে যে জনগণকে গত ঈদুল ফিতরে বারবার অনুরোধ করলাম যে আপনারা আপনাদের জায়গা ছেড়ে যাবেন না। কিন্তু অনেকেই তো সেই কথা শোনেননি। সবাই ছুটে চলে গেছেন।’ আর তার ফলাফলটা কী হলো? যারা বাইরে ছিলেন, পুরো বর্ডার এলাকায়, বিভিন্ন জেলায় এই করোনাটা ছড়িয়ে পড়ল। সবাই তখন যদি আমার কথাটা শুনতেন, তাহলে আজকে এমনভাবে করোনাটা ছড়িয়ে পড়ত না। মানুষের বাড়ি যেতে চাওয়ার প্রবণতাকে সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে সংক্রমণ এড়াতে মহামারীকালে সবাইকে এক্ষেত্রে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। করোনাভাইরাস সংক্রমণ এড়াতে জনসমাগম এড়িয়ে চলা, সাবান দিয়ে বারবার হাত ধোয়া, মাস্ক পরার ওপর জোর দিয়ে আসছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মহামারী প্রতিরোধে সরকার যেসব নির্দেশনাগুলো দিয়েছে, সেগুলো মেনে চললে মহামারী নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।’

সরকারপ্রধান বলেন, ‘আমরা এখন লকডাউন ঘোষণা করেছি। আমি দেশবাসীকে বলব, আপনারা অন্ততপক্ষে নির্দেশনাগুলো মেনে নিজেকে সুরক্ষিত রাখেন, অন্যকে সুরক্ষিত রাখেন। অন্তত এটা ছড়াতে দিয়েন না। মাস্ক পরা, হাত পরিষ্কার করা আর যেন কোনোমতেই সংক্রমিত না হয়, তার জন্য দূরত্ব বজায় রাখা। এটা করতে পারলেই কিন্তু আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারব।’