সংসদের এবারের বাজেট অধিবেশনের শুরু থেকেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে সংসদে উত্তপ্ত আলোচনা হয়। করোনাভাইরাস মহামারীকালে অক্সিজেন সংকট, স্বাস্থ্য খাতের অনিয়ম, সংসদে দেওয়া বক্তব্যের জের ধরে স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে তুলোধুনো করেছেন বিরোধী দলের সদস্যরা, উঠেছে তার পদত্যাগের দাবিও।
গতকাল শনিবার অধিবেশনের শেষ দিনে এই উত্তপ্ত আলোচনা হয়। এ সময় সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে উপস্থিত ছিলেন। তবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক উপস্থিত ছিলেন না।
সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা জি এম কাদের নিজ নির্বাচনী এলাকা লালমনিরহাটের স্বাস্থ্যসেবার বেহাল দশার কথা বলতে গিয়ে বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এক বছর আগে যে অবস্থায় ছিল, এখনো সেখানেই আছে। করোনা পরিস্থিতিতেও মন্ত্রণালয়ের কোনো উন্নতি হয়নি।
তিনি বলেন, ‘সদর হাসপাতাল স্বাস্থ্যসেবা কমিটির সভাপতি পদে পদাধিকারবলে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তারা সঠিকভাবে কাজ করেন না বলে স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন হচ্ছে না এ মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। এ কথার কারণে মানুষের মধ্যে ভুল-বোঝাবুঝির সৃষ্টি হতে পারে। যাদের এভাবে সভাপতি করা হয়, তাদের কোনো সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব দেওয়া হয় না। তারা নিজ উদ্যোগে হাসপাতালের সমস্যা নির্ধারণ করেন এবং সমাধানের প্রচেষ্টা করেন।’
বিরোধী দলের উপনেতা বলেন, স্বাস্থ্যসেবা কমিটিকে কোনো ক্ষমতা বা কর্র্তৃত্ব দেওয়া হয়নি। নিয়ম, আইন বা অর্থ বরাদ্দ এমন কিছুই থাকে না, যাতে তারা সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পারেন। প্রায় সময় সিদ্ধান্তকে বাস্তবে রূপ দিতে মন্ত্রণালয়ের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ প্রয়োজন পড়ে। ফলে তাদের প্রধান কাজ হয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা সরাসরি মন্ত্রীকে খুশি করে কাজটি বাস্তবায়ন করা।
জি এম কাদের অভিযোগ করেন, ‘মন্ত্রী ও মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা পাওয়া যায় না। আমি মাননীয় মন্ত্রীকে (স্বাস্থ্যমন্ত্রী) ছয়-সাতবার টেলিফোন করেছি। উনি টেলিফোন ধরেন না। তার সহকারীকে ফোন দেওয়ার পরও পরে ফোন ব্যাক করেন না। এ রকম ব্যবহার পেয়েছি। পত্র দিলে কোনো উত্তর বা সমাধান মেলে না। সংসদ সদস্যরা অনেকেই তখন বাধ্য হয়ে সমাধানের লক্ষ্যে বিষয়গুলো সংসদে তুলে ধরেন। যদিও এরপর সমাধান তেমন একটা পাওয়া যায় না।’
রংপুর হাসপাতালের সমস্যা তুলে ধরে জি এম কাদের বলেন, ‘রংপুর হাসপাতালে ডায়ালাইসিস মেশিনের পানি বিশুদ্ধিকরণ অংশটি নষ্ট ছিল দীর্ঘ প্রায় আট মাস। ফলে ২৫টি ডায়ালাইসিস মেশিন অকেজো হয়ে পড়েছিল। এলাকাবাসীর সহযোগিতায় ৬ লাখ টাকা উঠিয়ে এটা মেরামত করা হয়েছে। বর্তমানে ২৫টির মধ্যে ১০টি কাজ করছে না। বারবার মন্ত্রণালয়ে জানিয়েও কোনো ফল হয়নি। আমি ব্যক্তিগতভাবে দুই থেকে তিন মাস আগে স্বপ্রণোদিত হয়ে সচিবকে মেরামতের অনুরোধ জানিয়েছিলাম। কোনো কাজ হয়নি।’ লালমনিরহাট সদর হাসপাতালের দুর্দশার চিত্রও এ সময় তিনি তুলে ধরেন।
জাতীয় পার্টির রুস্তম আলী ফরাজী বলেন, ‘মাস্ক নিয়ে কথা হলো। সেদিন আমি এখানে বলেছিলাম, মন্ত্রীকে ডিরেক্ট বলিনি। বলেছিলাম চার টাকার মাস্ক ৩৫৬ টাকায় কেন কেনা হলো? উনি তদন্ত করবেন, দেখবেন, ব্যবস্থা নেবেন। এই হলো মন্ত্রীর দায়িত্ব।’ এই সাংসদ আরও বলেন, ‘এর আগে সংসদে আলোচনা হলে সেটা এড়িয়ে মন্ত্রী বললেন, এটা সত্য না। আমি তথ্য-প্রমাণ নিয়ে এসেছি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সংসদীয় কমিটিতে আলোচনা হয়েছে। দুদকে চলে গেছে। পত্রিকায় এসেছে। ওনাদের একটি প্রকল্পের পিডি স্বীকার করেছেন। উনি বলেছেন, উনি ওই সময় ছিলেন না। উনি কী করবেন? স্বাস্থ্যমন্ত্রী এড়িয়ে না গিয়ে তদন্তের নির্দেশ দিতেন। ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। নিতে হবে।’
জাতীয় পার্টির কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, ‘বেদনাদায়ক বিষয়। সাতক্ষীরায় হাসপাতালে অক্সিজেনের অভাবে সাতজন কভিড রোগী এক ঘণ্টার মধ্যে ছটফট করতে করতে মারা গেছেন। এই সাতক্ষীরা হলো এর আগে যিনি স্বাস্থ্যমন্ত্রী ছিলেন রুহুল হক সাহেবের এলাকা। এখানে তো ফাইভস্টার হাসপাতাল হওয়া উচিত। অক্সিজেনের অভাবে কীভাবে রোগী মারা যান বুঝি না। মন্ত্রীরা যান-আসেন, নিজের এলাকাটাও ঠিক রাখতে পারেন না?’
তিনি আরও বলেন, ‘অক্সিজেন প্ল্যান্ট করা অত্যন্ত সেনসিটিভ কাজ। সুদক্ষ ইঞ্জিনিয়ার দ্বারা প্রোপার ডিজাইন করে অক্সিজেন প্ল্যান্ট বসাতে হয়। অক্সিজেন সাপ্লাই লাইনে প্রোপার ডাইমেনশন থাকতে হবে। এখানে যদি কোনো লিকেজ থাকে তাহলে আগুন ধরে যাবে। মন্ত্রী সাহেব ভালো করে জানেন। সেন্ট্রাল অক্সিজেন সাপ্লাই বন্ধ হয়ে গেল। ঠিক আছে, আপনি ম্যানুয়াল করতেন। সিলিন্ডার মুখে দিলে জীবনটা তো বাঁচত কিছুক্ষণের জন্য। পারলেন না। নার্স-ওয়ার্ড বয়-ডাক্তার কী কাজ করল দেখবেন না আপনি? আমরা তো রোগী আইসিইউতে ঢুকায়ে দিই। যাওয়ার পর কী চিকিৎসা হয় কেউ খবর রাখে না। ওইখানে অধিকাংশ রোগী অক্সিজেনের অভাবে মারা যাচ্ছে। বলে যে রোগীর অবস্থা খারাপ। ভেন্টিলেশন দিচ্ছি। এক ঘণ্টা পর বলে রোগী মারা গেছে, নিয়ে যান। কোনো চিকিৎসা হয় না।’
ফিরোজ রশীদ বলেন, ‘একটা তদন্ত কমিটির রিপোর্ট আজ পর্যন্ত আমাদের সামনে এলো না। সারা পৃথিবীতে মানুষ মারা যাচ্ছে, কিন্তু চিকিৎসা দিতে গিয়ে এ ধরনের অনিয়ম মানা যায়? অনেক কিছু নাকি দিল। একটা হাসপাতালে অক্সিজেন নেই, হাই ফ্লো ক্যানুলা নেই। বগুড়া হাসপাতালে অক্সিজেনই নেই। জিজ্ঞেস করলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলে সব দিচ্ছি, কোথাও কিছু দেয়নি। এভাবে একটা বছর সময় নষ্ট করেছি। এক বছরের মধ্যে হাসপাতাল ওয়েল ইকুইপড করতে পারতাম। আমাদের এমপিদের দায়িত্ব দিত, সবকিছু করে দিতে পারতাম। কিন্তু দায়িত্ব না দিয় আমলাদের দেয়। জবাবদিহি আমাদের করতে হয়।’
জাতীয় পার্টির মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, ‘গত দুদিন আগে স্বাস্থ্যমন্ত্রী পার্লামেন্টের মতো জায়গায় বলে গেলেন, আমেরিকার সঙ্গে তুলনা করলেন। আমেরিকায়ও মানুষ মারা যায়। আমাদের এখানে অনেক মানুষ কম মারা যায়। মনে হলো যেন ওইটা ওনার ক্রেডিট। ওনার কারণেই বাংলাদেশে মানুষ মারা যায়নি।’ চুন্নু আরও বলেন, ‘তিনি (স্বাস্থ্যমন্ত্রী) বললেন এক বছরে নাকি অনেক কাজ করেছেন। আজকে খবর আসছে বাংলাদেশের ৩৭টি জেলায় অক্সিজেনের ব্যবস্থা নেই। হাসপাতালে ৫ জন রোগী অক্সিজেন পায় তো ২০ জন লাইনে থাকে। কেবলমাত্র অক্সিজেনের কারণে যারা ছটফট করে মারা যাচ্ছেন। পত্রিকায় এত লেখালেখি হচ্ছে স্বাস্থ্যমন্ত্রী কি একটি হাসপাতালে গিয়ে এগুলো দেখেছেন। তিনি কী করেন? তিনি জুম মিটিং করেন।’
নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পদত্যাগের প্রসঙ্গ তুলে সাবেক প্রতিমন্ত্রী চুন্নু বলেন, ‘ইংল্যান্ডের স্বাস্থ্যমন্ত্রী আনন্দে আত্মহারা হয়ে একটি কিস করার কারণে তাকে রিজাইন দিতে হয়েছে। আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রী কী মানুষ? বুঝলাম না। ওনার লজ্জা-শরম কিছু নেই। চরিত্র নেই। ওনার রিজাইন দেওয়া উচিত।’
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সমালোচনা করে বিএনপির হারুনুর রশীদ বলেন, ‘উনি বলেছেন, “আপনারা (এমপি) তো হাসপাতালের চেয়ার। মেশিন চলে না, লোক লাগবে এগুলো তো আপনাদের দেখতে হবে। কিন্তু আপনারা তো দেখেন না।” ওনার বক্তব্যে মনে হচ্ছে, কোনো এমপিই দায়িত্ব পালন করেন না। এই বক্তব্য আপত্তিজনক। স্বাস্থ্যমন্ত্রী গোটা হাউজকে অপমান করেছেন। তার বক্তব্য এক্সপাঞ্জ হওয়া দরকার।’
গত ৩০ জুন সংসদে বাজেট পাসের সময় বিরোধী সংসদ সদস্যদের সমালোচনার মুখে স্বাস্থ্য খাতের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। জেলা হাসপাতালের সভাপতি সংসদ সদস্যরা উল্লেখ করে ওই দিন আইনপ্রণেতাদের ওপর দায় চাপান মন্ত্রী।