এই ইউরোয় ইতালিকে যদি থামানো মুশকিল হয়, তবে ইংল্যান্ডের ব্যাপারে কী মত! প্রতিপক্ষ দুর্বল হলেই বা কি! ইংল্যান্ড তো নিজের কাজটা করে রাখছে ঠিকঠাক। সেই ধারাবাহিকতায় একমাত্র দল হিসেবে গোল হজম না করেই আসরের সেমিফাইনালে পৌঁছে গেছে ইংল্যান্ড। নিজেদের ইতিহাসে প্রথমবার টানা দুটি বড় টুর্নামেন্টের সেমিফাইনালে পরপর খেলার গৌরব ইংলিশদের। শনিবার রোমের স্তাদিও অলিম্পিকোতে ইউক্রেনকে ৪-০ গোলে হারিয়ে এ কীর্তি গড়েছে দলটি। তবে ২০১৮ বিশ্বকাপের চেয়ে এবার ইংল্যান্ডের স্বপ্ন সত্যি হওয়ার পাল্লা ভারী। হ্যারি কেইন, রাহিম স্টারলিংদের ওপর ১৯৬৬ বিশ্বকাপের পর প্রথম শিরোপার সম্ভাবনায় তাই বুঁদ পুরো ইংল্যান্ড।
এই আসরে দারুণ সুবিধা পাচ্ছে ইংলিশরা। যদি ফাইনালে ওঠে তারা, তবে ৭ ম্যাচের মাত্র একটি খেলতে হবে দেশের বাইরে। বাকি ৬টিই ঐতিহাসিক, ওয়েম্বলিতে, যেখানে ১৯৬৬-র বিশ্বকাপ ফাইনালে জার্মানিকে বিপর্যস্ত করেছিল তারা। সেমিফাইনালে ডেনমার্কের বিপক্ষে ঘরের মাঠেই ফিরছে গ্যারেথ সাউথগেটের দল। আর এবার ৪০ হাজার নয় সরকারের কাছ থেকে অনুমতি পাওয়ায় পাশে পাবে ৬০ হাজার সমর্থককে। ২০১৮ বিশ্বকাপেও এমন আবহ নিয়ে একটি শিরোপার জন্য তৈরি ছিল ইংল্যান্ড। কিন্তু ক্রোয়েশিয়ার কাছে হেরে সেমিফাইনালে স্বপ্ন ভঙ্গ হয় দেশটির। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই দেশের সংবাদ মাধ্যম থেকে সমর্থক সবাইকে পা মাটিতে রাখার আহ্বান কোচ গ্যারেথ সাউথগেটের, ‘আমরা গত চার বছরে খুব ভালো কিছু রাত কাটিয়েছি। সেই সঙ্গে খুব কঠিন রাতও কাটিয়েছি যা হজম করা আমাদের জন্য কঠিন ছিল। যে কোনো দলই একটি আসরে সেরাটা জেতার জন্য আসে। তাই যে কোনো দলকে সেরা খেলা দিয়েই জিততে হয়, এগিয়ে যেতে হয়। আমাদের আরও দুটি বাধা অতিক্রম করার আছে। আমরা অবশ্যই চেষ্টা করব। তার আগে অতীত অভিজ্ঞতা মনে রাখতে হবে আমাদের।’
ইউক্রেনের বিপক্ষে ৪-০ গোলের জয়ে ইউরোতে নিজেদের সবচেয়ে বড় ব্যবধানে জয়ের রেকর্ড গড়েছেন হ্যারি কেইনরা। গোলের খোঁজে থাকা ইংলিশ অধিনায়ক জার্মানির বিপক্ষে পোস্ট খুঁজে পাওয়ার সঙ্গে যেন ফর্মও ফিরে পেয়েছেন। জার্মানির বিপক্ষে শেষ মুহূর্তের ওই গোলটি পেয়েছেন মাঠে নামার হিসেবে প্রায় ৮ ঘণ্টা পর। কিন্তু ওই গোলের পর মাত্র ৮ মিনিটের ব্যবধানে পেয়ে গেলেন দ্বিতীয়টি। রাহিম স্টারলিংয়ের সঙ্গে দারুণ বোঝাপড়ায় ম্যাচের চতুর্থ মিনিটে ইংল্যান্ডকে এগিয়ে দেন হ্যারি কেইন। গোলরক্ষকের সঙ্গে ওয়ান টু ওয়ান লড়াইয়ে জিততে কোনো সমস্যাই হয়নি এ স্ট্রাইকারের। এরপর আসে হেড-এর হ্যাটট্রিক। বিরতির পর দুই মিনিটের মধ্যে লুক শ’র ফ্রি কিক থেকে হেডে গোল করেন হ্যারি ম্যাগুয়ের। ৫০তম মিনিটে কেইনের দ্বিতীয় গোলটি ছিল আরও সহজে। লুক শ’র বাড়ানো ক্রস থেকে খুব সহজে হেডে গোল করেন একদম আনমার্ক কেইন। আর ৬৩ মিনিটে কর্নার থেকে আসা বলে হেড থেকে দলের চতুর্থ গোল করেন জর্ডান হেন্ডারসন। ম্যাচ শেষে আসরে ৩ গোল করা কেইন বলেন শিরোপা জয়ের সঠিক পথে আছেন, ‘কোনো সন্দেহ নেই আমরা শিরোপা জয়ের পথে আছি। কিন্তু এখনো কিছু জেতা হয়নি। আমাদের সামনে এখন বিশাল সেমিফাইনাল অপেক্ষা করছে। ওয়েম্বলিতে এই আবহটা আমাদের জন্য কী মানে রাখতে পারে আমরা সবাই বুঝি। আমরা জানি আমাদের কোথায় গিয়ে থামতে হবে। সেটা মাথায় রেখে আমরা ধাপে ধাপে এগোচ্ছি।’
ফুটবল মানচিত্রে ইংল্যান্ড
ইংল্যান্ডের ফুটবল দলের জন্য বরাবরই ‘যত গর্জে তত বর্ষে না’ প্রবাদ বরাদ্দ ছিল। ১৯৬৬ সালের পর আর কোনো বড় শিরোপা না জেতায় দলটি ফুটবল শক্তি হিসেবেও পেছনের কাতারে পড়ে যায়। কিন্তু গত চার বছরে সেরা সময় কাটিয়ে আবারও জায়ান্ট তকমা পাচ্ছে গ্যারেথ সাউথগেটের দল। বড় দুটি বৈশ্বিক আসরে টানা সেমিফাইনালে খেলছে তারা। ২০১৮ বিশ্বকাপ এবং ২০২০ ইউরোর মাঝে ২০১৯ সালে নেশন্স লিগের সেমিফাইনালেও খেলেছে ইংল্যান্ড। তাই সাউথগেট গর্ব করেই বললেন ফুটবল মানচিত্রে আবার ফিরতে পেরে খুশি। নয়তো জার্মানি, ইতালি, ফ্রান্স, স্পেন এমনকি পর্তুগালের পেছনে পড়ে যাচ্ছিলেন তারা।
সাউথগেট বলেন, ‘ইংল্যান্ড কোচের পদে আগে যারা ছিলেন – স্যার ববি রবসন, স্যার আলফ রামসে এবং আরও সম্মানীত যারা তাদের কাতারে আমি নিজেকে দেখছি। এটা আমার জন্য বিশেষ। তার চেয়েও বড় এই দেশটাকে আমি আবার ফুটবল মানচিত্রে আনতে সক্ষম হয়েছি। সবাই এখন ইংল্যান্ডকে নিয়ে কথা বলছে। এটা কম বড় পাওয়া নয়। আমি এই গ্রুপটাকে ভালো করার জন্য সঠিক জ্বালানি দিতে পেরেছি যা আমার সেরা সাফল্য। কিন্তু আমি আগে যেমনটা বললাম বড় কিছু জেতা ছাড়া আমাদের অগ্রযাত্রা স্বীকৃত হবে না। আমরা এখন যে অবস্থানে আছি সেখান থেকে পেছনে পা রাখার সুযোগ নেই। আমাদের এখন সম্ভাবনা, ভাগ্য এসব শব্দে নয় সেরা খেলা দেওয়ার শব্দে বিশ্বাস রাখতে হবে।’