খুনের মামলার আসামি না হয়েও প্রায় তিন বছর সাজা ভোগ করা মিনু আক্তার কারাগার থেকে মুক্তির ১৩ দিন পর ট্রাকচাপায় মারা গেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে এ বিষয়ে মিনু আক্তারের আইনজীবী বলছেন, মিনুর মৃত্যু অস্বাভাবিক, তারা আদালতে যাবেন।
গত ১৬ জুন বিকেল সোয়া ৪টার দিকে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পান মিনু আক্তার।
মিনুর মৃত্যুর বিষয়ে বায়েজিদ থানার ওসি মো. কামরুজ্জামান বলেন, ‘গত ২৮ জুন রাত সাড়ে ৩টার দিকে বায়েজিদ লিংক রোডে ট্রাকের চাপায় এক নারীর মৃত্যুর পর আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলাম বেওয়ারিশ হিসেবে তার লাশ দাফন করে। এরপর গত শনিবার পুলিশ নিশ্চিত হয়, নিহত ওই নারী ছিলেন মিনু আক্তার।’
তিনি আরও বলেন, ‘ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। কোন গাড়ি তাকে চাপা দিয়েছে তা শনাক্তের চেষ্টা চলছে। ঘটনার দিন রাতে দুই-তিনবার টহল পুলিশ তাকে রাস্তা থেকে সরিয়ে দিয়েছিল। তিনি বারবার রাস্তায় লাফিয়ে নামছিলেন বলে জানিয়েছে টহল টিমের সদস্যরা।’
এদিকে, মিনুর আইনজীবী গোলাম মাওলা মুরাদ বলেন, ‘তিন বছর কারাবাসের পর তিনি মুক্তি পেয়েছিলেন, অথচ অল্প কয়েক দিনের মধ্যে তার ট্রাকচাপায় মৃত্যু ‘অস্বাভাবিক’ মনে হচ্ছে। আমরা এ বিষয়ে আদালতের দ্বারস্থ হব। আমরা আদালতের কাছে আবেদন করব বিষয়টি তদন্তের জন্য।’
মিনুর এক আত্মীয় জানান, গত শনিবার জঙ্গল ছলিমপুরে পুলিশ গিয়ে ছবি দেখিয়ে মিনুর খোঁজ করে। পরে মিনুর ভাই রুবেল হোসেন তার বোনের ছবি দেখে শনাক্ত করেন।
ছোট মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌসের জন্মের পরপরই মিনু কারাগারে যান। তিনি কারাগারে থাকাকালে গত মে মাসে মেয়ে জান্নাতুল মারা যায়। স্থানীয় এক লোক তাকে লালন-পালন করছিলেন। মিনুর বড় সন্তান মো. ইয়াছিন (১০) একটি দোকানে কাজ করে। আরেক সন্তান মো. গোলাপ (৭) সীতাকুন্ডের জাফরাবাদ ইমাম হোসাইন হাকিমিয়া লোকমানিয়া সুন্নিয়া হেফজখানা ও এতিমখানায় থাকে। মিনুর বাড়ি কুমিল্লার ময়নামতি এলাকায়। স্বামী ঠেলাগাড়ি চালক বাবুল সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। এরপর সীতাকুন্ডের জঙ্গল ছলিমপুর এলাকায় থাকছিলেন মিনু। সন্তানদের ভরণপোষণের প্রতিশ্রুতিতে কুলসুমা নামে এক নারীর কথায় কারাবাসের জন্য রাজি হন তিনি।
মিনুর ভাই রুবেল হোসেন বলেন, ‘মিনুর ছোট মেয়ে জান্নাতুল গত মে মাসে মারা যায়। জেল থেকে বের হওয়ার পর মেয়ের মৃত্যুর খবর তাকে দেওয়া হয়। মুক্তির কয়েক দিন পর আমার বাসায় ছিল। তবে সে বারবার বলছিল তাকে একটা বাসার খোঁজ দিতে, সে সন্তানদের নিয়ে থাকবে। গত ২৮ জুন সকালে আমার বাসা থেকে বের হয়ে যায়। এরপর অনেক খুঁজেছি, সন্ধান পাইনি। গত শনিবার পুলিশ মিনুর খোঁজ করে, এরপর আমাকে ছবি দেখালে আমি চিনতে পারি।’ তিনি আরও বলেন, ‘জীবনযুদ্ধে শেষ পর্যন্ত হেরে গেল মিনু। তার মৃত্যুর পেছনে আসলে কারা জড়িত তা সামনে আসুক।’
গত ১৬ জুন মুক্তি পান মিনু। এর আগে গত ৭ জুন বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও বিচারপতি মহিউদ্দিন শামীমের ভার্চুয়াল হাইকোর্ট বেঞ্চ মিনু আক্তারকে মুক্তির আদেশ দেয়। উচ্চ আদালতের নির্দেশ পাওয়ার পর মামলার প্রয়োজনে মিনু আক্তারকে হাজিরে তার আইনজীবী বন্ড দেন। এরপর ১৬ জুন দুপুরে চট্টগ্রামের চতুর্থ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ শরীফুল আলম ভূঞা তাকে মুক্তির নির্দেশ দেন। এরপরই তার মুক্তির নির্দেশনা কারাগারে পাঠানো হয় ১৬ জুন।
আদালত সূত্র জানা যায়, মোবাইল ফোন নিয়ে কথা কাটাকাটির জেরে ২০০৬ সালের ৯ জুলাই চট্টগ্রাম নগরের রহমতগঞ্জ এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় পোশাককর্মী কোহিনুর বেগমকে হত্যা করা হয়। ২০১৭ সালের ৩০ নভেম্বর এ মামলার রায়ে কুলসুমা আক্তার ওরফে কুলসুমীকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেয় আদালত। প্রকৃত আসামি কুলসুমা আক্তার মামলার সাজা হওয়ার আগে ২০০৭ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত কারাগারে ছিলেন। সাজা হওয়ার পর ২০১৮ সালের ১২ জুন কুলসুমা সেজে মিনু আক্তার তিন সন্তানের ভরণ-পোষণের আশ্বাসে কারাগারে আসেন।