আরেকটা রঙধনু ফ্রি-কিক। আরেকবার বিশ্ববাসী সাক্ষী হলো লিওনেল মেসি’র মোহনীয় এক গোলের। ব্রাজিলের গোয়াইনিয়ায় দর্শক না থাকলেও বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা আকাশি-সাদা ভক্তদের সুন্দর একটা রাত (বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সকাল) উপহার দিতে যা প্রয়োজন ছিল, তার সবটাই করেছেন আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি। অসংখ্য গোলের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছেন সতীর্থদের। এর মধ্যে রদ্রিগো ডি পল ও লাউতারো মার্তিনেজ পেয়েছেন জালের দেখা। একবার নিজের নেওয়া শট ফিরেছে পোস্ট কাঁপিয়ে। এমন দিনে ঈশ্বরও কী করে মুখ ফেরায় মেসি থেকে! যোগ করা সময়ে ইকুয়েডরের বক্সের ঠিক বাইরে তাই ফ্রি-কিক পেয়ে যায় আর্জেন্টিনা। বাঁ পায়ের আরেকটি ট্রেডমার্ক শটে নায়ক মেসি। ইকুয়েডরের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে (৩-০) আর্জেন্টিনাকে সেমিফাইনালে তুলে নেন অধিনায়ক। যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ কলম্বিয়া। বুধবার সকালের দ্বিতীয় সেমিতে কলম্বিয়ানদের হারালেই ফাইনালে আর্জেন্টিনা। তার আগে মঙ্গলবার ভোরে পেরুকে হারালে ব্রাজিলও উঠে যাবে ফাইনালে। বিশ্বব্যাপী নান্দনিক ফুটবলের পূজারীরা প্রায় দু’বছর পর সুযোগ পাবে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল মহারণ দেখার। দু’দেশের ১১১ লড়াইয়ের সর্বশেষটি হয়েছিল ২০১৯-এর নভেম্বরে। রিয়াদের প্রীতি ম্যাচে মেসির পেনাল্টি গোল আর্জেন্টিনাকে ৪০তম জয় এনে দিয়েছিল চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর বিপক্ষে। ব্রাজিলের ৪৬তম জয়টি ছিল তার কিছুদিন আগে, কোপায়। ৩ জুলাইয়ের সেই সেমিফাইনালে জেসুস-ফিরমিনোর দু’গোলে আর্জেন্টিনাকে হারায় ব্রাজিল।
মোহনীয় মেসিতে কোপার সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা
৩-০ গোলের জয়। স্কোরলাইনের মতো ম্যাচটা অবশ্য অত সহজ ছিল না। শুরু থেকেই প্রতিপক্ষের ডেরায় আক্রমণ শানিয়েছেন মেসি, ডি মারিয়ারা। মার্তিনেজ তো শুরুতেই পেতে যাচ্ছিলেন গোলের দেখা। কিন্তু তার প্রচেষ্টা গোললাইন থেকে ফিরিয়ে দেন ইকুয়েডর ডিফেন্ডার রবার্তো আর্বোলেদা। ২২ মিনিটে ইকুয়েডরের কার্লোস গ্রেসোর ভুল পাস থেকে বল পেয়ে যান মেসি। তার সামনে ছিলেন কেবল গোলকিপার হার্নান গালিন্দেজ। কিন্তু মেসির বাঁকানো শট সাইডবারে লেগে ফিরলে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ নষ্ট হয় আর্জেন্টিনার। ম্যাচের ৪০ মিনিটে অবশ্য মেসির জাদুতেই খুলেছে প্রতিপক্ষের গোলমুখ। তার সাজিয়ে দেওয়া পাসে গোলের আনুষ্ঠানিকতা কেবল সেরেছেন ডি পল। আর্জেন্টিনার জার্সিতে ২৭তম ম্যাচে এসে গোল পেলেন উদিনেসের এই উইঙ্গার।
এরপর থেকেই মেসিদের দ্বিতীয় গোলের দমবন্ধ অপেক্ষা। এক গোলের লিড যে মোটেই নিরাপদ নয়। সমান্তরালে খেলা ইকুয়েডর যে কোনো সময় ম্যাচে ফিরতে পারে- লিওনেল স্কালোনির দলকে এই আশঙ্কা তাড়া করে বেড়িয়েছে অনেকটা সময়। দু’বার আর্জেন্টাইন কিপার এমিলিয়ানো মার্তিনেজকে বড় পরীক্ষাই নিয়েছিল ইকুয়েডরের ফরোয়ার্ডরা। দু’বারই দারুণ দৃঢ়তায় দলকে বিপদমুক্ত করেন অ্যাস্টভিলার কিপার। আর্জেন্টিনাও বারবার হতাশ হয়েছে মার্তিনেজ, গঞ্জালেসদের সহজ সব সুযোগ নষ্টে। আক্রমণ-প্রতি আক্রমণে এগিয়ে চলা ম্যাচে অবশ্য ফের স্বস্তি আনতে দৃশ্যপটে হাজির মেসি। ৮৪ মিনিটে ইউকুয়েডর কিপারের মারাত্মক ভুলে বল পেয়ে আরেকটি নিখুঁত পাসে মার্তিনেজকে দিয়ে গোল করান অধিনায়ক। যোগ করা সময়ে ডি মারিয়াকে বক্সের ঠিক বাইরে বাজেভাবে ফাউল করে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন পাদ্রো হিনকাপই। দারুণ জায়গায় পাওয়া ফ্রি-কিকের সুযোগ ঠিকই কাজে লাগিয়ে এই আসরে চতুর্থ গোলের দেখা পান মেসি। চার গোল, চার অ্যাসিস্টে টুর্নামেন্ট সেরার লড়াইয়েও নিজেকে ওপরের দিকে রাখছেন আর্জেন্টাইন তারকা। তবে একটা কঠিন ম্যাচের সফল পরিসমাপ্তির কৃতিত্ব দিয়েছেন দলের সতীর্থদের, ‘সত্য হলো এটা ছিল অনেক কঠিন একটা ম্যাচ। আমরা জানতাম ইকুয়েডর কতটা শক্ত প্রতিপক্ষ। কারণ দলটি গড়ে উঠেছে তরুণ, শক্তিশালী ও গতিময় তরুণদের সম্মিলনে। দ্বিতীয় গোল পাওয়ার আগ পর্যন্ত আমাদের লড়তে হয়েছে। দলের প্রত্যেকে তাদের দায়িত্বগুলো দারুণভাবে পালন করে যাচ্ছে। আমরা দীর্ঘদিন ধরে পরিবার থেকে দূরে আছি। আমরা এখানে এসেছি কোনো ব্যক্তিগত অর্জনের জন্য নয়। একটা লক্ষ্য নিয়ে এগুচ্ছি এবং সেটা নিয়েই ভাবছি।’
মেসিদের লক্ষ্যটা যে শিরোপা তা কে না জানেন? কিন্তু সেই স্বপ্ন ছুঁতে তাদের সামনে চ্যালেঞ্জ নিয়ে হাজির কলম্বিয়া। যারা ঠিক আগের ম্যাচেই ইউরো’র সবচেয়ে সফল দল উরুগুয়েকে বিদায় করেছে টাইব্রেকারে ৪-২ গোলে হারিয়ে। কলম্বিয়ার জয়ের নায়ক গোলকিপার ডেভিড ওসপিনা। নেপোলির এই কিপার টাইব্রেকারে উরুগুয়ের দু’টি শট রুখে দিয়ে দ্বিতীয় কোপা শিরোপার স্বপ্ন দেখাচ্ছেন। রবিবার গভীর রাতে তৃতীয় কোয়ার্টার ফাইনালটি ছিল বড্ড পানসে। চিরাচরিত লাতিন ঘরানার ফুটবলের ছাপ ছিল বড্ড কম। যার প্রভাব পড়েছে স্কোরলাইনেও। নির্ধারিত ৯০ মিনিট ও তার পরের ৩০ মিনিটে হয়নি কোনো গোল। টাইব্রেকারে ওসপিনা হোসে গিমেনেজ ও মাতিয়াস ভিনার শট ঠেকিয়ে টানা চার গোল করা কলম্বিয়াকে পৌঁছে দেন জয়ের বন্দরে। এর মধ্য দিয়েই দারুণ হতাশার একটা রাত উপহার দেন উরুগুয়ের দুই তারকা ফরোয়ার্ড এডিনসন কাভানি ও লুইস সুয়ারেজকে। দু’জনই টাইব্রেকারে গোল করেছিলেন। কিন্তু সতীর্থদের গোল মিসে কোপায় নিজেদের শেষ পদচারণা স্মরণীয় করে রাখতে পারলেন না ম্যানচেস্টার সিটি ও অ্যাতলেটিকো মাদ্রিদ তারকা।
স্মরণীয় জয়টিকে রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাওয়া কলম্বিয়াবাসীর জন্য উৎসর্গ করেন দেশের হয়ে রেকর্ড ১১২তম ম্যাচ খেলতে নেমে নায়ক বনে যাওয়া ওসপিনা, ‘আমরা শুধু আমাদের দেশকে আনন্দে ভাসাতে চেয়েছি। যেখানে আমরা চাই শুধু শান্তি বিরাজ করুক, মানুষ ভীষণ সুখে থাক। কারণ আমাদের দেশটি বড্ড সুন্দর।’