বরিশালের উজিরপুর মডেল থানায় রিমান্ডে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ তুলে থানাটির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জিয়াউল আহসান ও পরিদর্শক (তদন্ত) মো. মাইনুল ইসলামসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন এক নারী আসামি। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী ভুক্তভোগী নারী বাদী হয়ে এ মামলাটি করেছেন। রিমান্ডে নারী আসামিকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ওসি জিয়াউল আহসান ও পরিদর্শক মাইনুল ইসলামকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার নির্দেশ দিয়ে বরিশাল জেলা পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত করা হয়েছে। গতকাল সোমবার দুপুরে ওই দুই পুলিশ কর্মকর্তাকে তাদের দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয় বলে জানিয়েছেন পুলিশের বরিশাল রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) এসএম আক্তারুজ্জামান।
ডিআইজি এসএম আক্তারুজ্জামান বলেন, ‘নারী আসামিকে রিমান্ডে নিয়ে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মাইনুল ইসলামের বিরুদ্ধে। আর ওসি জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে রয়েছে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ।’
এর আগে গত রবিবার নারী আসামিকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ তদন্তে রেঞ্জ ডিআইজির কার্যালয় থেকে দুই সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে বরিশাল রেঞ্জ পুলিশের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) কার্যালয়ের পুলিশ সুপার কাজী সোয়েব আহম্মেদকে প্রধান ও জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফরহাদ হোসেনকে সদস্য করা হয়েছে। কমিটিকে তিন দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
জানা গেছে, গত ২৬ জুন বরিশালের উজিরপুর উপজেলার জামবাড়ি এলাকা থেকে বাসুদেব চক্রবর্তী নামে এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় নিহতের ভাই বরুণ চক্রবর্তী এক নারীকে আসামি করে মামলা করেন। এতে বলা হয়, সেই নারীর সঙ্গে তার ভাইয়ের অনৈতিক সম্পর্ক ছিল। গত ২৮ জুন মামলার পর অভিযুক্ত নারীকে গ্রেপ্তার করে উজিরপুর থানা পুলিশ। উজিরপুর থানায় নিয়ে যাওয়ার পরপরই এক নারী পুলিশ সদস্য লাঠি দিয়ে তার ওপর নির্যাতন চালান। পরে উপস্থিত অন্য পুলিশ সদস্যরাও তাকে লাঠি দিয়ে মারধর করেন। পরে ওই নারীকে কারাগারে পাঠানো হয় এবং গত ৩০ জুন তাকে দুদিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ।
আদালত থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৩০ জুন রিমান্ডে নেওয়ার পর ওই নারীকে মারধর না করা হলেও পরদিন সকালে তাকে মামলার তদন্ত কর্মকর্তার কক্ষে পাঠানো হয়। সেখানে তার ওপর যৌন নিপীড়ন চালানো হয়। এরপর এক নারী পুলিশ সদস্যকে ডেকে নিয়ে তাকে আবার লাঠি দিয়ে পেটানো হয়। একপর্যায়ে তদন্ত কর্মকর্তা নিজেই ১৫ থেকে ২০ মিনিট ধরে পেটালে ওই নারী অচেতন হয়ে পড়েন। চেতনা ফেরার পর তিনি নিজেকে হাসপাতালের বিছানায় দেখতে পান।
রিমান্ড শেষে গত ২ জুলাই আদালতে তোলার পর ওই নারী তাকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ করেন। তখন নারী আসামিকে রিমান্ডে নিয়ে যৌন নির্যাতন করার অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ দেয় আদালত। বরিশালের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট-৩ আদালতের বিচারক মাহফুজুর রহমান গত শুক্রবার আসামির অভিযোগ আমলে নেন। তিনি নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন অনুযায়ী ওই নারীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে নির্যাতনের চিহ্ন ও নির্যাতনের সম্ভাব্য সময় উল্লেখ করে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলেন। আদালতে প্রতিবেদন দিতে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালককে বলা হয়েছে। এরপর শুক্রবার রাত ১০টায় ওই নারী আসামিকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে রাত ৩টায় তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক এইচএম সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী একজন নারী চিকিৎসক দিয়ে চিকিৎসা প্রদান এবং শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের বিষয়ে যথাসময়ে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে।’ তবে প্রতিবেদনে কী উল্লেখ আছে সে বিষয়ে কিছু বলেননি পরিচালক।
ওই নারী আসামির আইনজীবী মজিবর রহমান বলেন, ‘পুলিশ আদালত অবমাননা করেছে। আমি বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করছি এবং ৮ জুলাই আদালত চালু হলে এ বিষয়ে আদালতে অবহিত করব।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার মক্কেলকে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে আবেদন করা হয়েছিল। আদালত দুদিনের রিমান্ড দিয়ে সতর্কতার সঙ্গে জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশ দেয়। কিন্তু পুলিশ রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের নামে স্পর্শকাতর স্থানে নির্যাতন করেছে, যা যৌন নির্যাতনের শামিল।’
তবে হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পরিদর্শক মাইনুল ইসলাম তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।