হাইকোর্টের নির্দেশ উপেক্ষা

না.গঞ্জে কাউন্সিলরের নেতৃত্বে শীতলক্ষ্যা দখল!

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের এক কাউন্সিলরের নেতৃত্বে শীতলক্ষ্যা নদী ভরাট ও দখলের অভিযোগ উঠেছে। সিটি করপোরেশনের ২৫ নম্বর ওয়ার্ডের লক্ষণখোলা খেয়াঘাটের পাশে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্র্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) জায়গা দখল করে ভরাট কাজ চলছে। সেখানে ড্রেজারের মাধ্যমে চলছে নদীর তীর ভরাটের কার্যক্রম।

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ২৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর এনায়েত হোসেনের নেতৃত্বে বেশ কিছুদিন ধরে প্রকাশ্যে নদী দখলের এই কার্যক্রম চললেও তা রোধে বিআইডব্লিউটিএ বা সরকারি সংশ্লিষ্ট কোনো দপ্তরের দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই।

হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী, নদী বলতে সিএস ম্যাপে উল্লিখিত যে স্থান নদী হিসেবে প্রদর্শন করা হয়েছে, সেটা নদী হিসেবেই ধরা হবে। নদীর জমির শ্রেণি পরিবর্তন বা পরিবর্ধনযোগ্য নয়। কোনোভাবেই বন্দোবস্ত, শ্রেণির পরিবর্তন বা পরিবর্ধন করা যাবে না। ২০১৯ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি মো. আশরাফুল কামালের হাইকোর্ট বেঞ্চ নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ ঘোষণা করে রায় ঘোষণা করেন। রায়ে দেশের সব নদ-নদী-খাল-জলাশয় ও সমুদ্র সৈকতের সুরক্ষা এবং তার বহুমুখী উন্নয়নে জাতীয় নদীরক্ষা কমিশন বাধ্য থাকবে বলে উল্লেখ করে আদালত।

হাইকোর্টের ওই রায়ের পরে ২০১৯ সালের এপ্রিল থেকে শীতলক্ষ্যা নদীতে দুই হাজারের বেশি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। এরপর গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে হাইকোর্টের নির্দেশে গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম (জিপিএস) পদ্ধতিতে সিএস জরিপ মোতাবেক শীতলক্ষ্যা ও ধলেশ্বরী নদীর উভয় তীরে ২ হাজার ৪০০টি নতুন সীমানা পিলার স্থাপন করার কাজ শুরু হয়। ১০০ ফুট পর পর সীমানা পিলার স্থাপন করা হচ্ছে। এই সীমানা পিলার পাইলিংয়ের মাধ্যমে স্থাপন করা হচ্ছে। সীমানা পিলারগুলো উচ্চতায় ১০ ফুট এবং এর ভিত হচ্ছে ৫ ফুট বাই ৫ ফুট। এত মজবুত করার কারণ যাতে কেউ ইচ্ছে করলেই সীমানা পিলার উঠিয়ে নিতে না পারে। ইতিমধ্যে নারায়ণগঞ্জের বন্দর এলাকায় শতাধিক সীমানা পিলার স্থাপন করা হয়েছে।

সরেজমিন দেখা গেছে, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ২৫ নম্বর ওয়ার্ডের লক্ষণখোলা খেয়াঘাটের পাশে শীতলক্ষ্যার নতুন সীমানা পিলারের পাশেই ড্রেজার দিয়ে বালু ভরাট চলছে। আর ভরাট করা বালু এক্সাভেটর দিয়ে সমতল করা হচ্ছে। নদীর সীমানা পিলারের ভেতর থেকে শুরু করে নদীর তীর পর্যন্ত বালু ভরাট চলছে। সেখানে ইতিমধ্যে চলাচলের জন্য সুউচ্চ মাটির রাস্তা প্রায় নির্মাণ হয়ে গেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলাকাটির একাধিক বাসিন্দা দেশ রূপান্তরকে জানান, ২৫ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর এনায়েত হোসেনের তত্ত্বাবধানে নদী ভরাট কাজ চলছে। তার লোকজন এই কাজের তদারকি করছে। আর ওই ভরাট কাজকে সিটি করপোরেশনের কাজ হিসেবে স্থানীয়দের অবহিত করা হয়েছে। বলা হচ্ছে, সেখানে ওয়াকওয়ে ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ হবে। এছাড়া বিশাল জায়গাজুড়ে খেলার মাঠ নির্মাণ করা হবে বলে এলাকাবাসীকে জানিয়েছেন কাউন্সিলর। তবে এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, প্রকৃতপক্ষে আসছে ঈদুল আজহা উপলক্ষে শীতলক্ষ্যার তীরে কোরবানির পশুর হাট বসাতেই কাউন্সিলর এনায়েত হোসেন সেখানে মাটি কেটে ভরাট করে সমতল করছেন। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের কোনো প্রকল্পের কাজ হলে তারা অবশ্যই জেলা প্রশাসন কিংবা বিআইডব্লিউটিএ’র অনুমতি নিত। তবে এক্ষেত্রে জেলা প্রশাসন বা বিআইডব্লিউটিএ কারোরই অনুমতি না নিয়ে এই ভরাট কাজ চলছে। এমন পরিস্থিতিতে দ্রুতই নদী ভরাটকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছেন বিআইডব্লিউটিএ কর্মকর্তারা।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কাউন্সিলর এনায়েত হোসেন মোবাইল ফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, সেখানে খেলার মাঠ ও ওয়াকওয়ে হবে। নদীর জমির শ্রেণি পরিবর্তন বা পরিবর্ধনযোগ্য কি না এবং জেলা প্রশাসন কিংবা বিআইডব্লিউটিএ থেকে অনুমতি নেওয়া হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তার জানা নেই। মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী ভালো বলতে পারবেন। এটি নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রকল্প। তিনি স্থানীয় কাউন্সিলর হিসেবে শুধু দেখাশোনা করছেন।

নদী ভরাট রোধে কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে বিআইডব্লিউটিএ’র নারায়ণগঞ্জ নদী বন্দরের যুগ্ম পরিচালক শেখ মাসুদ কামাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ ব্যাপারে জানতে পেরেছি। তবে সিটি করপোরেশন আমাদের কাছ থেকে অনুমতি নেয়নি। দ্রুতই নদী ভরাটকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’