আশ্রয়ণ প্রকল্পে অনিয়মের জন্য পাঁচ কর্মকর্তাকে ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) করা হয়েছে। গত রবি ও সোমবার এই পাঁচ কর্মকর্তাকে ওএসডি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এসব কর্মকর্তা ইউএনও ও এসি ল্যান্ড বা সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় আশ্রয়ণ প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়মে জড়ানোর অভিযোগ উঠেছে। প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগের সত্যতা মেলায় এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
ওএসডি হওয়া কর্মকর্তারা হলেন, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত উপসচিব মো. শফিকুল ইসলাম। তিনি সিরাজগঞ্জের কাজিপুরের সাবেক ইউএনও। এছাড়া হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রুবায়েত হায়াত শিপলুকে ওএসডি করা হয়েছে। তিনি মুন্সীগঞ্জ সদরের সাবেক ইউএনও ছিলেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. লিয়াকত আলী সেখও ওএসডি হয়েছেন। তিনি বগুড়ার শেরপুরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) দায়িত্বে ছিলেন। এছাড়া বরগুনার আমতলীর ইউএনও মো. আসাদুজ্জামান এবং মুন্সীগঞ্জ সদরের সহকারী কমিশনার (ভূমি) শেখ মেজবাহ-উল-সাবেরিনকে ওএসডি করা হয়েছে।
নীতিমালা অনুযায়ী ঘর বরাদ্দ থেকে শুরু করে নির্মাণ পর্যন্ত ৫ সদস্যের কমিটি গঠনের কথা। ইউএনওর নেতৃত্বে কমিটির অন্যান্য সদস্য ছিলেন উপজেলা চেয়ারম্যান, উপজেলা নির্বাহী প্রকৌশলী, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) এবং সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। অনেক উপজেলায় ইউএনও কোনো সভা না করে কাগজে-কলমে কমিটি গঠন দেখিয়ে একাই সব কাজ করতেন। মালামাল কেনাসহ কমিটির তদারকিতে ঘর নির্মাণ করার নিয়ম থাকলেও সদস্যদের উপেক্ষা করা হয়েছে। অনেক ইউএনওর বিরুদ্ধে কমিটির সদস্যদের সাদা খাতায় স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় ১ লাখ ১৮ হাজার ৩৮০ ভূমিহীনকে দুই কক্ষের ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন জায়গায় এই ঘর ভেঙে পড়েছে। ঘর নির্মাণে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। আশ্রয়ণ হচ্ছে গৃহহীন পরিবারগুলোর জন্য পুনর্বাসন প্রকল্প। এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ ভূমিহীন, গৃহহীন, ছিন্নমূল ও অসহায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন করা। এছাড়া ঋণ ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহে সক্ষম করে তোলা এবং আয়বর্ধক কার্যক্রম সৃষ্টির মাধ্যমে দারিদ্র্য দূর করা। প্রথম পর্যায় শেষে এখন এই প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায় চলছে।
দেশ রূপান্তরের বরগুনা প্রতিনিধি জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় আমতলী উপজেলায় আশ্রয়ণ প্রকল্প-১ এর অধীনে প্রথম ধাপে ১শ’ এবং দ্বিতীয় ধাপে ৩৫০টি ঘর বরাদ্দ দেয়। স্থানীয়দের ঘর বরাদ্দ থেকে শুরু করে সব কাজেই লুকোচুরি এবং অনিয়মের আশ্রয় নিয়েছে আমতলী উপজেলার সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান। নীতিমালা অনুযায়ী ঘর বরাদ্দ থেকে শুরু করে নির্মাণ পর্যন্ত ৫ সদস্যের একটি কমিটি গঠনের কথা। ইউএনও কোনো সভা না করে কাগজে-কলমে কমিটি গঠন দেখিয়ে গোপনে সব কাজ করতেন।
আশ্রয়ণ প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. মফিজুর রহমান বলেন, ‘কোনো কমিটি হয়নি। ইউএনও পকেট কমিটি করে স্বাক্ষর নিয়ে সব কাজ একাই করেছেন। আমিসহ কমিটির কোনো সদস্য ঘর নির্মাণসংক্রান্ত বিষয়ে কিছুই জানি না। ঘর বরাদ্দ, মালামাল কেনাসহ সব কাজ ইউএনও কার্যলয়ের কর্মচারী এনামুল হক বাদশার মাধ্যমে করতেন। দপ্তরে দপ্তরে গিয়ে সাদা খাতায় বাদশা সভার রেজল্যুশনের জন্য স্বাক্ষর নিতেন। স্বাক্ষর নেওয়ার পর ইউএনও নিজে তা সংরক্ষণ করতেন। আমি রেজল্যুশনে স্বাক্ষর দিতে না চাইলে ইউএনও আমাকে মারতে উদ্যত হন।’
কমিটির আরেক সদস্য আমতলী উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, ঘর নির্মাণসংক্রান্ত বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। ইউএনও গোপনে সব কাজ একাই করেছেন। আমি এই কমিটির সদস্য কিনা তাও জানাননি তিনি। মাঝেমধ্যে বিভিন্ন সভা আছে বলে ইউএনও লোক পাঠিয়ে সাদা খাতায় স্বাক্ষর নিতেন।
মো. আসাদুজ্জামান গত বছর ৪ সেপ্টেম্বর আমতলীতে ইউএনও হিসেবে যোগদান করেন। যোগদানের পরেই নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। অনিয়মের কাজে উপজেলা প্রশাসনের সাঁট মুদ্রাক্ষরিক কাম কম্পিউটার অপারেটর মো. এনামুল হক বাদশার সহায়তা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এনামুল হকের মাধ্যমে ত্রাণের ঘরসহ বিভিন্ন প্রকল্প থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
ইউএনওর বিরুদ্ধে আশ্রয়ণ প্রকল্পের প্রতিটি ঘর থেকে ৩০-৪০ হাজার টাকা করে হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। ঘরপ্রতি বরাদ্দের ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা থাকলেও তিনি তার প্রতিনিধির মাধ্যমে নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে ঘর নির্মাণ করেন। ঘর নির্মাণের সময় মালামাল পরিহনের টাকা ঘর মালিকের নিকট থেকে আদায় করতেন। এ টাকা কেউ দিতে না চাইলে তাকে ঘর বাতিলের হুমকি দিতেন। তাছাড়া ঘর মালিকের মাধ্যমে ইট এবং সিমেন্ট আনিয়ে তা দিয়ে কাজ করাতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া সাঁট মুদ্রাক্ষরিক কাম কম্পিউটার অপারেটর মো. এনামুল হক বাদশার নিজ গ্রাম হরিদ্রবাড়িয়ায় টাকার বিনিময়ে ৩০টি ঘর বরাদ্দ দেন ইউএনও। ইউএনও ঘর নির্মাণে সুজন মুসুল্লী ও হাবিব গাজী নামে দুজনকে প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেন। তারা ঘরপ্রতি টাকা আদায় করে এনামুলের মাধ্যমে ইউএনও হাতে পৌঁছে দিতেন। যারা টাকা দিতেন তাদের বাড়িতেই পৌঁছে যেত ঘর নির্মাণের নিম্নমানের সামগ্রী।
বিষয়টি নিয়ে একাধিক গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হওয়ার পর নজরে আসে বরগুনা জেলা প্রশাসক মো. হাবিবুর রহমানের। তাৎক্ষণিক তিনি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। ওই তদন্ত কমিটি ঘরের তালিকা তৈরিতে অনিয়ম, দুর্নীতি ও টাকার বিনিময়ে ধনাঢ্য ব্যক্তিদের ঘর দেওয়ার সত্যতা পায়। গত ৫ মে সাঁট মুদ্রাক্ষরিক কাম কম্পিউটার অপারেটর মো. এনামুল হক বাদশাকে বরগুনার বেতাগী উপজেলায় বদলির পর সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ২০ জুন সারা দেশে হতদরিদ্রদের দেওয়া ঘরের উদ্বোধন করেছেন। একযোগে সারা দেশে প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান প্রচারের আয়োজন থাকলেও আমতলীতে এ ধরনের কোনো আয়োজন ছিল না। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী ঘর উদ্বোধন করলেও আমতলীর ঘরের নির্মাণকাজ এখনো শেষ হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে নির্মাণকাজ করায় বেশ কয়েকটি ঘরের দেয়াল ধসে পড়েছে। কাউনিয়া গ্রামের জাহাঙ্গীর বেপারীর ঘরের ভেতরের দেয়াল এবং গুলিশাখালী ইউনিয়নের হরিদ্রাবাড়িয়া গ্রামের হামিদা বেগমের ঘরের সামনের পিলার ধসে গেছে। ঘর হস্তান্তরের আগেই বেহালা গ্রামের উর্মিলা রানীর ঘর ভেঙে পড়ে।