পুলিশে নতুনত্ব আনতে পোশাক পরিবর্তনের পাশাপাশি বাহিনীর প্রতিটি সদস্যকে উন্নতমানের আগ্নেয়াস্ত্র দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি আনা হচ্ছে জবাবদিহির আওতায়। ‘জনগণের পুলিশ’ হতে সামনের দিনগুলোতে আরও কী করতে হবে তারও একটি গাইডলাইন তৈরি করেছে পুলিশ সদর দপ্তর। ইতিমধ্যে পুলিশের তিন রকমের পোশাকের রং চূড়ান্ত করা হয়েছে। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পোশাক পরিয়ে ট্রায়াল দেওয়া হচ্ছে। শিগগির পোশাক চূড়ান্ত করে পুলিশ সদস্যদের মধ্যে বিতরণ করা হবে বলে পুলিশ কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন।
পুলিশ সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, বর্তমান আইজিপি দায়িত্ব নেওয়ার পরই পুলিশকে আরও ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেন। পুলিশের অপরাধের বিষয়ে তিনি জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেন। জনগণের পুলিশ হতে একটি গাইডলাইন তৈরি করা হয়েছে। পুলিশের চাঁদাবাজি বন্ধ করতে একাধিক গোয়েন্দা টিম গঠন করেছে পুলিশ সদর দপ্তর। সাবেক আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারীর আমলে তদবির বাণিজ্যও অনেকটা বন্ধ হয়ে গেছে। পুলিশ সদস্যদের জন্য নতুন রংয়ের পোশাক প্রায় চূড়ান্ত করা হয়েছে। আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যেই প্রতিটি পুলিশ সদস্য নতুন পোশাক পাবেন। মাদক থেকে পুলিশকে রক্ষা করতে ডোপ টেস্ট চালানো হচ্ছে। সামনের দিনগুলোতে টেস্টের মাত্রা আরও বেগবান করা হবে। এমনকি পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরও টেস্টের আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পুলিশ ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের মাধ্যমে গাজীপুরে একটি গার্মেন্টস কারখানা অথবা টেক্সটাইল মিলস তৈরিরও পরিকল্পনা নিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। এই জন্য ঢাকা রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শককে (ডিআইজি) দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া পুলিশের নিজস্ব ছাপাখানা স্থাপন করতে ডিএমপি কমিশনারকে দেখভাল করতে বলা হয়েছে। জুতাসহ অন্যান্য সরঞ্জামও একই স্থান থেকে কেনার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
পুুলিশের মহাপরিদর্শক (আইহিপি) ড. বেনজীর আহমেদ বলেছেন, দুর্নীতিমুক্ত পুলিশ প্রশাসন গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কোনো পুলিশ সদস্য অবৈধ আয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলে অবশ্যই বেরিয়ে আসতে হবে। পুলিশের কাজের মূল ভিত্তি হবে টিম স্পিরিট। পুলিশকে প্রযুক্তিনির্ভর, আধুনিক স্মার্ট হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। বর্তমান পুলিশে অনেক সক্ষমতা রয়েছে। এ সক্ষমতা কাজে লাগাতে হবে। তিনি আরও বলেন, পুলিশের কোনো সদস্যের মাদকের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তাকে বাহিনী থেকে অপসারণ করা হবে। থানার ওসিরা হবেন তার এলাকার হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা। বিট পুলিশিংয়ের মাধ্যমে পুলিশকে জনগণের কাছে যেতে হবে। আগামী ৫, ১০, ৫০ বা ১০০ বছরের পুলিশিং কেমন হতে পারে তা বিবেচনা করে বর্তমান পুলিশিংকে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পরিবর্তন করতে হলে সবাইকে মিলে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। পুলিশকে দুর্নীতিমুক্ত হওয়া, মানুষকে নির্যাতন করা থেকে বেরিয়ে আসা, মাদকের সঙ্গে সম্পর্ক না রাখা, সারা দেশে বিট পুলিশিং চালু রাখা ও কর্মরত অবস্থাতেই পুলিশের কল্যাণ নিশ্চিত করতে হবে।
পুলিশ সদর দপ্তরের উপ-মহাপরিদর্শক (লজিস্টিক) ড. তৌফিক মাহবুব চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে জানান, পুলিশের পোশাক পরিবর্তন করতে বিশে^র বিভিন্ন দেশের পুলিশের পোশাকগুলো কী রকম তার নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। দুই-তিন রকমের পোশাক চূড়ান্ত করে তা ট্রায়াল দেওয়া হচ্ছে। আশা করি অল্প সময়ের মধ্যেই নতুন পোশাক চূড়ান্ত করা হবে।
পুলিশ সূত্র বলছে, পুলিশের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যবস্থাপনাগত প্রশিক্ষণে আছে ব্যাপক দুর্বলতা। ইউএনপিডির এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১শ জন কনস্টেবলের মধ্যে ৯৬ জন তাদের ২০ বছরের চাকরি জীবনে ৩ থেকে ৬ মাসের মধ্যে শুধু মৌলিক প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, চাকরিজীবনে প্রশিক্ষণ খুবই জরুরি। কনস্টেবলরাও আইনশৃঙ্খলা উন্নতিকরণে অনেক অবদান রাখছেন। তাদেরও উন্নত প্রশিক্ষণ দিতে পারলে আরও উপকার হবে। আর বর্তমান প্রেক্ষাপটে যেকোনো প্রশিক্ষণ জরুরি। এই জন্য পুলিশের প্রতিটি সদস্যকে উন্নতমানের প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হচ্ছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, নতুন পোশাাকের কাপড় হবে খুবই উন্নতমানের। নিজস্ব কোনো গার্মেন্টস বা টেক্সটাইল মিলস তৈরি করে কাপড় কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ ২০০৪ ও ২০১৬ সালে দু’বার পুলিশের কয়েকটি ইউনিটের পোশাকের কালার পরিবর্তন করা হয়েছিল। নারীদের নিরাপত্তার জন্য পুলিশ সাইভার সাপোর্ট ফর উইমেনকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত বছরের ১৬ নভেম্বর এর কার্যক্রম উদ্বোধন করেন আইজিপি। সাত মাসে ১০ হাজার ৪০ জন অভিযোগ করেছেন। তার মধ্যে ৪৭০৩ নারীকে সেবা দেওয়া হয়। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দাখিল করতে না পারায় ১৬৫৯ জনকে সেবা দিতে পারেনি। তাছাড়া ৫৮৮ জনকে সহযোগিতা করার কাজ চলছে। শিগগির কনস্টেবল নিয়োগ দিতে যাচ্ছে সরকার।
পুলিশ সদর দপ্তরে কর্মরত এক অ্যাডিশনাল আইজিপি দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ২০৪১ সালে বাংলাদেশ উন্নত দেশে পরিণত হবে। উন্নত দেশের উপযোগী পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলার লক্ষ্যে পুলিশের প্রশিক্ষণে আমূল পরিবর্তন আনা হচ্ছে। পুলিশের মৌলিক প্রশিক্ষণের কারিকুলাম রিভিউ করে বিভিন্ন পদের দায়িত্ব ও প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন করে সিলেবাস তৈরি করা হয়েছে। তিনি বলেন, বাস্তব প্রয়োজনের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ঢেলে সাজানো হচ্ছে প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল। প্রশিক্ষণে কাঠামোবদ্ধ প্রশিক্ষণ কারিকুলাম প্রণয়ন করা হয়েছে। জনগণকে উন্নততর সেবা প্রদান নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী কনস্টেবল থেকে অতিরিক্ত আইজি পর্যন্ত প্রত্যেক পুলিশ অফিসার ও ফোর্সকে বছরে কমপক্ষে ৬০ ঘণ্টা প্রশিক্ষণ গ্রহণের নির্দেশনা দিয়েছেন। সে লক্ষ্য বাস্তবায়নে পুলিশের সব প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়াতে এগুলোর আধুনিকায়ন করা হচ্ছে। পুলিশ নানা সমস্যায় ছিল। বর্তমান সরকারের আমলে পুলিশের ব্যাপক উন্নয়ন হয়। এর আগে র্যাংক-ব্যাজ নিয়ে জটিলতা ছিল। প্রধানমন্ত্রী সমাধান করেছেন। ২০১০ সালে আইজিপির র্যাংকব্যাজ উন্নীত করার প্রস্তাব দেয় পুলিশ সদর দপ্তর। ২০১২ সালে আইজিপি পদকে থ্রি-স্টার মর্যাদা দেওয়া হয়। পুলিশের খাকি পোশাক বদলে গেছে অনেক আগেই। পরে মহানগর ও জেলা পর্যায়ে দুই রংয়ের পোশাক দেওয়া হয়। কিন্তু পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট ও ব্যাটালিয়ন ভেদে পোশাকের পার্থক্যও রয়েছে। র্যাব, এপিবিএন ও এসপিবিএনের পোশাক সম্পূর্ণ ভিন্ন রঙের। ২০০৪ সালে পুলিশের পোশাক পরিবর্তন করে মহানগরগুলোয় হালকা জলপাই রঙের করা হয়। জেলা পুলিশকে দেওয়া হয় গাঢ় নীল রংয়ের পোশাক। র্যাবের কালো ও এপিবিএনের পোশাক তৈরি করা হয় খাকি, বেগুনি আর নীল রঙের মিশ্রণে। বর্তমানে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল, রাজশাহী, রংপুর, গাজীপুর, ময়মনসিংহ ও খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ একই ধরনের পোশাক ব্যবহার করে। রেঞ্জ ও জেলা পুলিশ অন্য রঙের পোশাক ব্যবহার করছেন।