আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর নির্মাণ

ডিসিরাও দায় এড়াতে পারেন না

আশ্রয়ণ প্রকল্পে অনিয়মের জন্য পাঁচ কর্মকর্তাকে ওএসডি বা বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা করা হয়েছে। এ পাঁচ কর্মকর্তার মধ্যে একজন উপসচিব, তিনজন সিনিয়র সহকারী সচিব এবং একজন সহকারী কমিশনার। প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। প্রশাসন ক্যাডারের এসব জুনিয়র কর্মকর্তাকে ওএসডি করার পর প্রশ্ন উঠেছে জেলা প্রশাসকরা (ডিসি) কী করেছেন? বিভাগীয় কমিশনার বা আশ্রয়ণ প্রকল্পের কর্মকর্তারাই বা কী করেছেন? সঠিক সময়ে এসব কাজ তদারকি করা হলে অনিয়মের অভিযোগ উঠত না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আশ্রয়ণ প্রকল্পের নীতিমালা অনুযায়ী ঘর নির্মাণের মূল কাজ ইউএনওর নেতৃত্বে গঠিত উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির। তাদের কাজ সুষ্ঠুভাবে মনিটরিং করার জন্য ডিসির নেতৃত্বে আট সদস্যের কমিটি রয়েছে। ডিসি কমিটিতে রয়েছেন গণপূর্ত, স্থানীয় সরকার এবং জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী, উপজেলা চেয়ারম্যান, ডিসি মনোনীত দুজন গণ্যমান্য ব্যক্তি, জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক। অনুমোদিত নকশা ও প্রাক্কলন অনুযায়ী গৃহ নির্মাণ হচ্ছে কি না তা তদারকি করার কথা এ কমিটির। তাদের নিয়মিতভাবে কাজের অগ্রগতি পরিদর্শন এবং প্রকল্প পরিচালককে প্রতি মাসে কাজের অগ্রগতি প্রতিবেদন পাঠানোর কথা।

সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আশ্রয়ণ প্রকল্পের কাজ চলছে সারা দেশে। এর মধ্যে মাত্র কয়েকটি জায়গায় অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। যাদের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে তাদের ওএসডি করার বিষয়টি সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। একই সঙ্গে ডিসিসহ যেসব কর্মকর্তার ইউএনওর কাজ তদারকি করার কথা ছিল তারা যদি অবহেলা করে থাকে তাহলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কিন্তু একটা বিষয় ওএসডি পাঁচ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যেভাবে ফেইসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে তা সত্যি দুঃখজনক।’

এদিকে পাঁচ কর্মকর্তাকে ওএসডি করার পর গতকাল বুধবার অনেক জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিজেরাই আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর পরিদর্শন করতে যান। নিজেরা না যেতে পারলেও অনেক জেলায় এডিসিদের পাঠানো হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ডিসি জানান, নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে ঘর বানানোর কারণে কিছু ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এটা সত্য। কিন্তু এ প্রকল্পেরও কিছু সমস্যা আছে। ঘর বানাতে গিয়ে কর্মকর্তারা চারটি সমস্যায় পড়েছেন। প্রথম সমস্যাটি হচ্ছে লাখ লাখ ঘর বানানো হচ্ছে কিন্তু কোনো ঠিকাদার নেই। ঠিকাদার ছাড়া একজন কর্মকর্তার পক্ষে কী করে এসব ঘর বানানো সম্ভব? ঘরের নির্মাণসামগ্রী সরবরাহের জন্য কোনো লোক নেই। মিস্ত্রি ডেকে কাজ করাতে হয়েছে। দ্বিতীয় সমস্যা হচ্ছে খাসজমিতে ঘর করতে বলা হয়েছে। খাসজমি সাধারণত খালে-বিলে, ঝোপে-জঙ্গলে থাকে। এসব জায়গায় ঘর বানাতে গিয়ে কোনো ঘরের ভিটা দেবে গেছে বা ঘরের প্রাঙ্গণ তলিয়ে গেছে। তৃতীয় সমস্যা হচ্ছে ঘরের ডিজাইনটাই ত্রুটিপূর্ণ। মাত্র এক থেকে দেড় ফুট ভিটের ওপর এ ঘর বানানো হয়েছে। মাটির কাজ করে সমান করে দেওয়ার সময় ছিল না। চতুর্থ সমস্যা হচ্ছে প্রকল্পের ঘর বানানোর জন্য মাত্র ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা বাজেট দেওয়া হয়েছে। এ টাকায় নির্ধারিত মান অনুযায়ী ঘর করা খুবই কঠিন।

একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জানিয়েছেন, একই সময়ে সরকারের সচিবরাও নিজেদের এলাকায় দুটি করে ঘর করে দিয়েছেন। সেসব ঘরে ৩ থেকে ৫ লাখ টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে। যে ঘর ৫ লাখ টাকায় নির্মাণ করা হয় সেই ঘর কীভাবে ১ লাখ ৭০ হাজার টাকায় হবে।

এসব বিষয় জানতে চাইলে আশ্রয়ণ প্রকল্পের পরিচালক মো. মাহবুব হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঘর নির্মাণের জন্য নীতিমালা ও উপজেলা টাস্কফোর্স রয়েছে। টাস্কফোর্সের উপদেষ্টা হলেন সংসদ সদস্য ও উপজেলা চেয়ারম্যান। থানার ওসিসহ উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত এ টাস্কফোর্সের সদস্য ২৩ জন। ভূমিহীনদের তালিকা করা আছে। ওই তালিকা যাচাই-বাছাই করে টাস্কফোর্স ঘর দেয়। এরপর নির্মাণের দায়িত্বে রয়েছেন ইউএনওর নেতৃত্ব পাঁচ সদস্যের কমিটি। এখানে কোনো টেন্ডার, ভ্যাট ও ট্যাক্স নেই। ইউএনওরা সরাসরি নির্মাণসামগ্রী কিনবেন এবং নিজের ঘর যে দরদ দিয়ে করবেন সেই দরদ দিয়ে তারা এ ঘর নির্মাণ করবেন। আমরা শুধু ঘর নির্মাণের টাকাটা দেব। ডিসির নেতৃত্বে জেলা পর্যায়ে আট সদস্যের কমিটি রয়েছে। তাদের উপজেলার কাজ দেখভাল করার কথা। জেলার এডিসিসহ অন্যান্য কর্মকর্তাকেও উপজেলার কাজ তদারকির দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। এভাবে তদারকি হচ্ছে। আর আশ্রয়ণ প্রকল্পের মূল অফিস ঢাকায়, মাঠপর্যায়ে কোনো অফিস নেই। এভাবে ১ লাখ ৮০ হাজার ঘর হস্তান্তরের কাজ হয়েছে। কিছু ঘরের কাজ শেষ হয়নি। বগুড়া, মুন্সীগঞ্জ, বরগুনাসহ আরও কয়েকটি জায়গায় কাজে শৈথিল্য দেখানোর অভিযোগ উঠেছে। আমাদের কাছে এসব কাজের বিষয়ে কেউ লিখিত অভিযোগ দেয়নি। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য দেখে আমারা ডিসিদের তদন্ত করতে বলি। এসব জায়গায় দুর্নীতি হয়েছে তা আমি বলতে চাই না। কারণ আমরা যে টাকা দিয়েছি তা খুবই সীমিত। এ থেকে চুরি করার সুযোগ কম।’

খারাপ কাজের শতকরা হার কত জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক বলেন, ‘এর হার দশমিক ৫ শতাংশেরও কম। তারপরও এ ধরনের অভিযোগ আমরা আশা করিনি।’

ঘরপ্রতি বরাদ্দ ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা কি কম জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রথম আমরা শুরু করেছিলাম ১ লাখ ৭১ হাজার টাকায়। বাজারদর হিসাব করে এ বরাদ্দ দেওয়া হয়। পরে করোনায় জিনিসপত্রের দাম বাড়ায় আমরাও বরাদ্দ বাড়িয়ে ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা করি। গত দুই মাস আগে সেটা ২ লাখ টাকা করা হয়েছে। বাজারদরের সঙ্গে এটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, একেবারে যে কম তা নয়।’ মাহবুব হোসেন বলেন, ‘ডিসিদের বিরুদ্ধে যদি তদারকিতে অবহেলার অভিযোগ থাকে সেটাও তদন্ত করা হবে। যেসব জায়গায় এসব সমস্যা হয়েছে তা দ্রুত ঠিক করা হচ্ছে।’

মুজিববর্ষ উপলক্ষে দেশের সব ভূমিহীন ও গৃহহীনের জন্য ঘর দেওয়ার কর্মসূচি নেয় সরকার। সামগ্রিকভাবে ভূমিহীন, গৃহহীন, ছিন্নমূল ও অসহায় দরিদ্র পরিবারকে এবং সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ জমির সংস্থান রয়েছে কিন্তু ঘর নেই এমন পরিবারকে এ কর্মসূচির আওতায় আনা হয়েছে।

কিন্তু সারা দেশে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর নির্মাণ করতে গিয়ে ইউএনওদের বিরুদ্ধে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। এ অভিযোগে পাঁচ কর্মকর্তাকে ওএসডি করা হয়েছে। ওএসডি হওয়া কর্মকর্তারা হলেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত উপসচিব মো. শফিকুল ইসলাম। তিনি সিরাজগঞ্জের কাজিপুরের সাবেক ইউএনও। এছাড়া হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রুবায়েত হায়াত শিপলুকে ওএসডি করা হয়েছে। তিনি মুন্সীগঞ্জ সদরের সাবেক ইউএনও ছিলেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. লিয়াকত আলী সেখও ওএসডি হয়েছেন। তিনি বগুড়ার শেরপুরের ইউএনওর দায়িত্বে ছিলেন। এছাড়া বরগুনার আমতলীর ইউএনও মো. আসাদুজ্জামান এবং মুন্সীগঞ্জ সদরের সহকারী কমিশনার (ভূমি) শেখ মেজবাহ-উল-সাবেরিনকে ওএসডি করা হয়েছে।