১৯৬৬ বিশ্বকাপের ফাইনালের পর থেকে শুরু অপেক্ষার। বিশ্বজয়ের পর যে আর কোনো বড় আসরের ফাইনাল খেলা হয়নি ইংল্যান্ডের। এই হতাশা নিয়েই নিঃশেষ হয়ে গেছে কত প্রজন্ম! কত বড় বড় ফুটবলারকে বুটজোড়া তুলে রাখতে হয়েছে হাহাকার নিয়ে। তীরে এসে তরী ডোবার অসংখ্য দুঃস্মৃতি সঙ্গী হয়েছে হাজারো সমর্থকের। আর কত? তারপরও এক বুক আশা নিয়ে বুধবার রাতে ওয়েম্বলিতে উপস্থিত হয়েছিলেন ৬০ হাজার সমর্থক। এবার আর হতাশ হতে হয়নি। অতিরিক্ত সময়ের পেনাল্টি থেকে অধিনায়ক হ্যারি কেইনের লক্ষ্যভেদে মুছে শেষ সব হতাশা।দ্বিতীয় সেমিফাইনালে ডেনমার্ককে ২-১ গোলে হারিয়ে ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালের মঞ্চে গ্যারেথ সাউথগেটের দল। ওয়েম্বলিতেই রবিবার রাত ১টায় ইউরোপিয়ান শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের ম্যাচে তারা মুখোমুখি হবে ইতালির।
ব্যর্থ হতে হতে একটা সময় ইংল্যান্ডের গায়ে সেঁটে গিয়েছিল ‘ওভাররেটেড দলের’ দুর্নাম। শক্তিশালী মিডিয়ার সুবাদে সব সময় আলোচনায় থাকা দলটির বারবার ব্যর্থ হয়েছে মাঠে। এবারের আসরেও দুর্ধর্ষ রূপে দেখা যায়নি থ্রি লায়ন্সদের। তারপরও প্রিয় দলের জয় দেখতে ভরে উঠেছিল ঐতিহাসিক ওয়েম্বলির গ্যালারি। ঘরের মাঠে ইংলিশ ফুটবলারও খেলেছেন আধিপত্য বিস্তার করে। কিন্তু ইতিহাসের হাতছানি নিয়ে নামা ডেনমার্কও যে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ‘বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচ্যগ্র মেদিনী’ এই মন্ত্র জপে আসা ডেনিশরা ইংলিশ ঝড়ের সামনে দাঁড়িয়ে গেছে বুক চিতিয়ে। শুরু থেকে শেষ অবধি ডেনিশ রক্ষণে গতি হারিয়েছে ইংল্যান্ডের আক্রমণ। উল্টো ম্যাচের ৩০ মিনিটে ধারার বিপরীতে গোল খেতে হয়েছে তাদের। বক্সের কয়েক গজ বাইরে থেকে ডেনিশ ফরোয়ার্ড মিকেল ডামসবার্গের বুলেট গতির ফ্রি-কিক রোখার সাধ্য ছিল না তিন মিনিট আগে অনন্য এক রেকর্ড গড়া ইংলিশ কিপার জর্ডার পিকফোর্ডের। একটানা ৭২১ মিনিট গোল না খাওয়ার নতুন রেকর্ড গড়ে তিনি পেছনে ফেলেছিলেন ১৯৬৬ বিশ্বকাপজয়ী দলের কিপার গর্ডন ব্যাঙ্কসকে।
ম্যাচে ফিরতে মরিয়া ইংল্যান্ডকে হতাশ হতে হয় ৩৭ মিনিটে। কেইনের পাস হাতছোঁয়া দূরত্বে পেয়েও গোল করতে পারেননি রাহিম স্টার্লিং। তার সামনে বাধা হয়ে দাঁড়ান ডেনিশ কিপার ক্যাসপার স্মাইকেল। তবে পরের মিনিটে সিমন কেয়ার আত্মঘাতী গোল স্বস্তি ফেরায় ইংল্যান্ড শিবিরে। ডান দিক থেকে বুকোয়া সাকার স্কয়ার পাস গায়ে লেগে থাকা রাহিম স্টার্লিংয়ের পা থেকে ক্লিয়ার করতে গিয়ে নিজেদের জালে জড়িয়ে দেন ডেনিশ অধিনায়ক।
দ্বিতীয়ার্ধে দু’দলই গোলের একাধিক সুযোগ নষ্ট করায় ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। ম্যাচের ১০৪ মিনিটে রেফারির প্রশ্নবিদ্ধ বাঁশিতে পেনাল্টি উপহার পায় ইংল্যান্ড। বল নিয়ে বক্সে ঢুকে পড়া স্টার্লিংকে রুখতে পা বাড়িয়েছিলেন ডেনিশ ডিফেন্ডার জোয়াকিম। কিন্তু স্টার্লিংয়ের সঙ্গে তার সংযোগ হয়েছিল কিনা তা টিভি রিপ্লেতেও (ভিএআর) পরিষ্কার বোঝা যায়নি। প্রযুক্তি অবশ্য পক্ষ নেয় ডাচ রেফারি ড্যানি ম্যাককেলির। স্পট থেকে ইংলিশ অধিনায়ক কেইনের প্রথম প্রচেষ্টা রুখে দিয়েছিলেন স্মাইকেল। কিন্তু ফিরতি বল ঠিকই জালে জড়িয়ে সাফল্যতৃষিত ইংলিশদের স্মরণীয় একটা রাত উপহার দেন কেইন।
গ্রুপপর্বে গোল না পেলেও নকআউটপর্বের তিন ম্যাচে চার গোল করে সামনে থেকেই দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন টটেনহ্যামের স্ট্রাইকার। তার কাছে বুধবারের জয়টা এসেছে অবিশ্বাস্য এক অনুভূতি নিয়ে, ‘এটা ছিল অবিশ্বাস্য একটা ম্যাচ! আমরা চেষ্টার কমতি রাখিনি। যেটা প্রয়োজন সেটা করেই পৌঁছে গেছি ফাইনালের মঞ্চে। ঘরের মাঠে ফাইনাল খেলব, এই অনুভূতি তুলনাহীন।’ বুধবার গোল না পেলেও পেনাল্টি আদায় করে ইংলিশদের জয়ের পার্শ্বনায়ক স্টার্লিং। পেনাল্টি নিয়ে ওঠা প্রশ্নটা ম্যাচ শেষে উড়িয়ে দিয়েছেন ম্যানসিটির এই উইঙ্গার, ‘আমি যখন বক্সে ঢুকে পড়ি তখন তার (জোয়াকিম) ডান পায়ের সঙ্গে আমার সংঘর্ষ ঘটলে পড়ে যাই। তার মানে এটা পরিষ্কার পেনাল্টি।’ ইংল্যান্ড কোচ সাউথগেটের জন্য এই জয়টা বুক থেকে পাথর নেমে যাওয়ার মতো। ১৯৯৬ ইউরোর সেমিফাইনালের টাইব্রেকারে তার পেনাল্টি মিসেই স্বপ্নের ফাইনাল খেলা হয়নি ইংল্যান্ডের। ২০১৮ বিশ্বকাপেও ক্রোয়েশিয়ার কাছে হেরে সেমিফাইনাল থেকে বিদায় নিয়েছিল তার কোচিংয়ে খেলা ইংল্যান্ড। উচ্ছ্বাসটা লুকিয়ে রাখেননি ইংলিশ বস, ‘একেবারেই কম অভিজ্ঞতা নিয়ে এই ছেলেরা বলতে গেলে অসাধ্য সাধন করেছে। দীর্ঘ একটা অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে তারা দেশকে পৌঁছে দিয়েছে কাক্সিক্ষত ফাইনালে। তিন বছর আগে মস্কোতে এমনই একটা রাতে হতাশায় ডুবেছিলাম। কিন্তু এবার সেটা হতে দেয়নি ছেলেরা। মাঠে ঝড় বইয়ে দিয়েছে এবং আমিও এর সাক্ষী হয়ে গর্বিত হয়েছি।’ ডেনমার্কের কাছ থেকে এমন প্রতিরোধ সাউথগেটের কাছে প্রত্যাশিতই ছিল, ‘আমরা জানতাম এমন একটা বাধার মুখে আমাদের পড়তে হবে। ডেনমার্ক সব সময়ই খুব আন্ডাররেটেড একটা দল। তারা অসাধারণ ফুটবল খেলেছে। এমন দলকে হারানো মোটেই সহজ ছিল না। ছেলেদের বলেছি মাথা ঠা-া রেখে চেষ্টা করে যেতে।’
ফাইনালে তাদের সামনে এখন আরও বড় বাধার নাম ইতালি। স্পেনকে বিদায় করে ফাইনালে আসা আজ্জুরিদের হারানোর ছকটা তাই উৎসবের রাত থেকেই কষতে শুরু করেছেন সাউথগেট, ‘এ রকম রাত খুব কমই এসেছে আমাদের জীবনে। কিন্তু যখন আমরা ড্রেসিং রুমে ফিরে যাব ঠিক তখন থেকে এই জয় নিয়ে ভাবার সুযোগ থাকবে না। যে পথে সফলভাবে হেঁটে চলেছি, সেটার শেষটা চার দিন পর। এখন আমাদের সপ্তাহান্তের লড়াই নিয়ে ভাবতে হবে। সমর্থক ও দেশকে গর্বিত করার শেষ সুযোগটা কাজে লাগানোই এখন একমাত্র লক্ষ্য।’