শিক্ষিত বেকার থামাতে শিক্ষার ‘ভুল’ সংস্কারে সরকার

দেশের বর্তমান শিক্ষা পদ্ধতিতে শিক্ষিত বেকার শ্রেণি তৈরি হচ্ছে এমন ভাবনা থেকে সর্বস্তরের শিক্ষায় পাঠ্যক্রম (কারিকুলাম) পরিবর্তন ও পরিমার্জনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। যার মূল উদ্দেশ্য দেশীয় বাজারে দক্ষ শ্রমশক্তি ও ব্যবস্থাপক তৈরি করা। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজার উপযোগী শিক্ষিত জনগোষ্ঠীও তৈরি হবে। সম্প্রতি এ সংক্রান্ত একটি নির্দেশনা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রতিষ্ঠানগুলোতে পাঠানো হয়েছে। তবে সরকারের এ নীতির সঙ্গে একমত নন দেশের অনেক শিক্ষাবিদ।

তাদেরই একজন অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘উচ্চশিক্ষার নামে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কারিগরি বা বৃত্তিমূলক শিক্ষাই প্রদান করছে। এরপরও সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক এ তিন স্তর মিলে বুনিয়াদি শিক্ষা সঠিক পথে নেই। বেকারত্বের চাপ কমানো ও জ্ঞানমুখী শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি করতে হলে বুনিয়াদি শিক্ষায় বড় সংস্কার প্রয়োজন।’ গোড়ায় হাত না দিয়ে ওপর দিকে সংস্কার করলে সুফল পাওয়া যাবে না বলে মনে করেন তিনি।

জানা গেছে, যুগোপযোগী কারিকুলাম তৈরি করতে গত ২৩ জুন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ, বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্র্তৃপক্ষ এবং জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়। ওই চিঠিতে সর্বাধিক দক্ষ শ্রমিক তৈরি করা যায় এমন খাতগুলো চিহ্নিত এবং আগামী দিনে কতজন দক্ষ শ্রমিক তৈরি করা যায় তার একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পাঠাতে বলা হয়।

দেশের অর্থনীতি বড় হচ্ছে। বিশ্বের ১৯৫টি দেশ ও অঞ্চলের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার ৪০তম। ২০৪১ সাল নাগাদ বিশ্বের ২৫তম বৃহৎ অর্থনীতি হওয়ার প্রতিযোগিতায় রয়েছে বাংলাদেশ। বৃহৎ এ অর্থনীতির চালক হিসেবে দক্ষ শ্রমশক্তির বিকল্প নেই। তবে বাংলাদেশের এই মুহূর্তে বড় সমস্যা হচ্ছে আন্তর্জাতিকমানের জনশক্তির অভাব। এ সুযোগে দেশের ভেতরে বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চল, রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল, বড় বড় বহুজাতিক কোম্পানি, এমনকি তৈরি পোশাক কারখানাগুলোতেও বিদেশি কর্মী চাকরি করছেন। যার চড়া মূল্যও পরিশোধ করতে হয় বাংলাদেশকে।

দেশে কর্মরত বিদেশি কর্মীরা প্রতি বছর কত হাজার কোটি টাকা নিয়ে যাচ্ছে, ২০২০ সালে তার একটি হিসাব দিয়েছিল ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির হিসাবে, প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে ২৬ হাজার কোটি টাকা নিয়ে যান বিদেশি কর্মীরা। আর এই টাকার প্রায় অর্ধেক ১২ হাজার কোটি টাকা সরাসরি পাচার হয়ে বিদেশে যায়। কারণ আড়াই লাখের বেশি বিদেশি কর্মীর অধিকাংশই এ দেশে আয়ের ওপর কর পরিশোধ করেন না। এ সমস্যা সমাধানে দেশের ভেতরে দক্ষ জনশক্তি ও ব্যবস্থাপক তৈরির ওপর অনেক দিন ধরেই জোর দিচ্ছেন অর্থনীতিবিদরা।

বিষয়টি আমলে নিয়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে অভিন্ন কারিকুলাম তৈরিতে কয়েক বছর আগে উদ্যোগ নেয় সরকার। যার দায়িত্ব পড়ে সরকারের জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) ওপর। ২০২২ সাল থেকে নতুন এ পদ্ধতিতে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করার কথা ছিল। কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এনসিটিবির দুই বিভাগ প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের মধ্যে সমন্বয় না হওয়ায় অভিন্ন কারিকুলাম আলোর মুখ দেখছে না। এরই মধ্যে প্রাথমিক বিভাগ আলাদা করে পাঠ্যপুস্তক ঠিক করেছে। এতে নতুন শিক্ষা পদ্ধতির আশা মুখ থুবড়ে পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। যদিও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেছেন, করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় এক বছর পিছিয়ে ২০২৩ সাল থেকে এ পদ্ধতি চালু করা হবে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, নতুন পদ্ধতিতে কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষার ওপর বেশি জোর দেওয়া হবে। এ খাতে ২০ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী ভর্তির পরিকল্পনা করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের বেসিক ডিগ্রি দেওয়ার পাশাপাশি দক্ষতার ওপরও একটি ডিগ্রি দেওয়া হবে। সেই সঙ্গে শিক্ষার্থী বিবেচনায় দেশের সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ও সরকারের নতুন নীতিতে বড় গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বড় অংশই বেকার থাকছে বলে মনে করছেন সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

জানা গেছে, গত ২৩ জুন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে নির্দেশ আসার আগেই উচ্চশিক্ষার কারিকুলাম সংযোজন, বিয়োজন, পরিমার্জন ও পরিবর্ধনের কাজ শুরু করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে নতুন নির্দেশ আসায়, সে অনুযায়ী দেশের বিভিন্ন অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে একাধিক কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিগুলো শ্রমবাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতামত নিয়ে ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছে।

শিক্ষা পদ্ধতি সংস্কারে সরকারের উদ্যোগের বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষাবিদ ড. সলিমুল্লাহ খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বর্তমানে উচ্চশিক্ষা যে পদ্ধতিতে চলছে সেটি ভুল, আবার যে নীতি নেওয়া হচ্ছে সেটাও ভুল। দুটি ভুল যোগ করলে একটি শুদ্ধ হয় না। শিক্ষিত বেকার বাড়ছে সরকারের এ বক্তব্য আপাতত সত্য। মূল সত্য নয়। দেশের অর্থনীতির সঠিক বিকাশ হচ্ছে না। উন্নয়ন হচ্ছে, জাতীয় আয় বাড়ছে। কিন্তু এর ন্যায্য বণ্টন হচ্ছে না। বড় একটা জনগোষ্ঠী বঞ্চিত হচ্ছে। তারা সঠিক শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে না।’

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভিসি) অধ্যাপক মশিউর রহমান মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয় শুধু কর্মী তৈরির জায়গা নয়, সেখানে জ্ঞানের চর্চা থাকতে হবে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘শিক্ষা বিস্তারে ১৫-২০ বছর আগের বাস্তবতায় অনেকগুলো সাবজেক্ট বা কোর্স চালু করা হয়েছিল। ওইসব বিষয়ে কর্মী তৈরি না হলেও উদ্দেশ্য যে ব্যর্থ হয়েছে এমনটা বলা যাবে না। তবে যেহেতু আমাদের দক্ষ কর্মীও দরকার, সেজন্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স পর্যায়ে ইতিমধ্যে কিছু কোর্স চালু রয়েছে। নতুন নীতিতে এগুলো আমরা আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা করছি।’

এ প্রসঙ্গে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. মহসিন দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘সময়ের চাহিদা অনুযায়ী কারিগরিতে অনেকগুলো নতুন বিভাগ খোলা হয়েছে। কিন্তু চাকরির বাজারে ওইসব বিভাগ পুরনো বিভাগের সঙ্গে সাংঘর্ষিক অবস্থা তৈরি করছে। এতে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি বাড়ছে। একই সঙ্গে বেসিক ডিগ্রি পাওয়া শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে বিকাশ হচ্ছে না। এসব সমস্যা সমাধানে ইতিমধ্যে কিছু উদ্যোগ চলমান রয়েছে।’

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে নির্দেশ পাওয়ার পর তারা ১২ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছেন জানিয়ে মো. মহসিন আরও বলেন, ‘এখানে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্র্তৃপক্ষ (বেজা), বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্র্তৃপক্ষ (বেপজা), এফবিসিসিআইসহ বিভিন্ন চেম্বার ও ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিরা রয়েছেন। আমরা তাদের ডিমান্ডগুলো বোঝার চেষ্টা করছি। সে অনুযায়ী পরবর্তীকালে শিক্ষাসূচি প্রণয়ন করা হবে।’