নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে একটি খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় আগুন লেগে দুই নারী শ্রমিকসহ অন্তত তিনজন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক। তাদের মধ্যে অন্তত ১০ জনকে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টায় সজীব গ্রুপের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান হাসেম ফুড লিমিটেডের একটি কারখানা ভবনের নিচতলায় আগুন লাগে। পরে একে একে তা ছড়িয়ে পড়ে উপরের ফ্লোরগুলোতে। গতকাল রাত ১টা পর্যন্ত দীর্ঘ ৮ ঘণ্টার চেষ্টায়ও ফায়ার সার্ভিসের ১৭টি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি।
শ্রমিকদের অভিযোগ, জরুরি বাইরে আসার সিঁড়ির দরজা বন্ধ থাকায় শতাধিক শ্রমিক ভেতরে আটকে পড়েছেন। একাধিক শ্রমিকের পরিবার স্বজনের ভেতরে আটকা পড়ার বিষয়টি দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেছে। তবে আটকে পড়াদের বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলেনি ফায়ার সার্ভিস। রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহ্ নুসরাত দাবি করেন, তিন ও চারতলায় ১২ শ্রমিক আটকা পড়েছিলেন। ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা তাদের উদ্ধার করেছেন। বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে কারখানা কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে রাতে কারখানার ভেতরে আটকে পড়াদের উদ্ধারের দাবিতে শ্রমিকরা কারখানার বাইরে বিক্ষোভ করেন। এসময় মহাসড়কের উভয় পাশে যানজটের সৃষ্টি হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, আগুন লাগার অনেক পরে স্বপ্না রানী (৪৫), মিনা আক্তার (৪১) ও মোরসালিন (২৮) ভবনটির বিভিন্ন তলা থেকে লাফিয়ে পড়েছিলেন। তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত বলে ঘোষণা করেন। এদের মধ্যে দুই নারীর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ইউএস বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দায়িত্বরত চিকিৎসক শাহাদাত হোসেন। স্বপ্না রানী সিলেট জেলার যতি সরকারের স্ত্রী আর মিনা আক্তার কিশোরগঞ্জ জেলার করিমগঞ্জ থানার উত্তরকান্দা এলাকার হারুন মিয়ার স্ত্রী। মোরসালিন মিয়া দিনাজপুর জেলার চিরিরবন্দর উপজেলার আনিসুর রহমানের ছেলে। মোরসালিনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন ঢাকা মেডিকেল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ বাচ্চু মিয়া।
শ্রমিক ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কর্ণগোপ এলাকায় অবস্থিত সজীব গ্রুপের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান হাসেম ফুড লিমিটেড কারখানায় প্রায় ৭ হাজার শ্রমিক কর্মচারী কাজ করেন। কারখানার ছয়তলা ভবনটিতে নুডলস, মেকারনী ললিপপ, চকলেটসহ বিভিন্ন ভোজ্যপণ্য তৈরি করা হয়। ওই ভবনটিতে ৮ শতাধিক শ্রমিক কাজ করেন। ছয়তলা ভবনে থাকা কারখানাটির নিচতলার একটি ফ্লোরে কার্টন এবং পলিথিন তৈরির কাজ চলে। সেখান থেকেই হঠাৎ করে আগুনের সূত্রপাত ঘটে। আগুন ছড়িয়ে পড়লে শ্রমিকরা ছোটাছুটি করতে শুরু করেন। কেউ কেউ ভবনের ছাদে অবস্থান নেন। আবার কেউ ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়তে শুরু করেন। তাদের মধ্যে প্রায় ৫০ জনকে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে ও চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। রাত ১টায় প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি ফায়ার সার্ভিস।
অভিযোগ আছে, হাসেম ফুড লিমিটেড কারখানার যে ভবনটিতে আগুন লেগেছে সেটি বিল্ডিং কোড না মেনে করা হয়েছে। কারখানা কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনায় এই আগুন লেগেছে। গত মাসেও এ কারখানাটিতে অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটেছিল।
এদিকে গত ১ জুলাই বকেয়া বেতন ও ওভারটাইমের টাকার দাবিতে শ্রমিক ঢাকা-সিলেট অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছিল। নিহত মিনা আক্তারের ছেলে আহাদ বলেন, ‘কারখানা কর্তৃপক্ষের অবহেলায় আমার মা মইরা গেল। কারখানার মালিকরা বেতনও দেয় না।’
স্বপ্না রানীর মেয়ে বিশাখা রানী জানান, তারা পাঁচ বোন। বাবা নেই। তারা ওই কারখানায় কাজ করে নিজেদের লেখাপড়াও চালিয়ে যাচ্ছিলেন। বিশাখার অভিযোগ, কর্তৃপক্ষের দোষে কারখানায় আগুন লেগেছে।
এদিকে ভেতরে আটকে পড়া শান্তা মনি (১৭) নামে এক শ্রমিকের মামা রাসেল আহমেদ বলেন, তার ভাগনি মাত্র দুই দিনই আগেই কারখানাটিতে কাজ শুরু করেছিল। এখন তার কোনো খোঁজ পাচ্ছেন না। শান্তা ভেতরে কাজ করছিল।
অগ্নিকা-ের খবর পেয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) শাহ নূসরাত জাহান ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) আতিকুল ঘটনাস্থলে যান। ইউএনও শাহ নূসরাত বলেন, ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন। এখনো আগুন নিয়ন্ত্রণে আসেনি। কারখানা কর্র্তৃপক্ষের অবহেলা বা অব্যবস্থাপনা থাকলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নারায়ণগঞ্জ জেলা ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক আব্দুল আল আরিফিন বলেন, ফায়ার সার্ভিসের ১৭টি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে কাজ করে যাচ্ছেন। আগুন নিয়ন্ত্রণে আসেনি। আটকে পড়া শ্রমিকদের উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। তিনি জানান, আগুন লাগার কারণ সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।