ঢাকার আশকোনার সমাজসেবক মমতাজ উদ্দিন ক’দিন ধরে লকডাউন মেনে ঘরেই ছিলেন। গতকাল শুক্রবার জুমার নামাজ পড়তে বেরিয়ে দেখেন জনমানব শূন্য এলাকা। কৌতূহলবশত একটু এগিয়ে বিমানবন্দর সড়কে গিয়ে একেবারে ফাঁকা পান। কিছু রিকশা চলাচল করলেও যাত্রীর অপেক্ষায় বসে আছেন চালকরা।
গতকাল এমন চিত্র শুধু বিমানবন্দর সড়ক নয়, গোটা রাজধানীর। করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে চলমান লকডাউনের নবম দিনে রাজধানী ছিল অন্য রকম। সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় জরুরিসহ সরকারি-বেসরকারি বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান ছিল বন্ধ। ফলে মহানগরীর রাস্তাঘাটে মানুষের উপস্থিতি ছিল খুবই কম। তারপরও জরিমানা গুনতে হয়েছে অনেককে। এমনকি গ্রেপ্তার হয়েছেন ৫৮৫ জন।
এদিকে, লকডাউন শুরুর পর থেকে বিনা প্রয়োজনে গ্রেপ্তার হওয়া অনেকে হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন। তারা বলেছেন, ছেড়ে দেওয়ার অজুহাতে পুলিশের কোনো কোনো সদস্য টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। যদিও পুলিশ এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমরা কাজ করছি।
লকডাউন আরও কঠোর করতে গতকাল থেকে ফেরি চলাচলে নতুন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ফেরিতে যাত্রী ও সব ধরনের যাত্রীবাহী গাড়ি বন্ধের নির্দেশনা দিয়েছে বিআইডব্লিউটিসি। এখন থেকে কঠোর স্বাস্থ্যবিধি মেনে শুধু জরুরি পণ্যবাহী গাড়ি ও অ্যাম্বুলেন্স ফেরিতে পারাপার হতে পারবে। গতকাল সরেজমিনে রাজধানীর বিভিন্ন পাড়া-মহল্লার অলিগলি থেকে মূল সড়ক, সর্বত্র মানুষের উপস্থিতি ছিল কম। রাস্তায় খালি রিকশা নিয়ে ঘুরছেন চালকরা। এরই মধ্যে হঠাৎ সাইরেন বাজিয়ে অ্যাম্বুলেন্স ও দ্রুতগতির বড় লরিকে ছুটতে দেখা যায়। কারওয়ানবাজারসহ বিভিন্ন পাইকারি বাজার থেকে খুচরা ব্যবসায়ীরা ভ্যান-রিকশায় শাকসবজি কিনে গন্তব্যে ফেরেন।
বেলা ১১টার দিকে বিভিন্ন এলাকার মোড়ে পুলিশ সদস্যরা থাকলেও যানবাহন ও মানুষের চলাচল কম হওয়ায় তারা ফুরফুরে মেজাজে চেকপোস্টের পাশে দাঁড়িয়ে কথাবার্তা সারেন। দুপুরে আসাদগেট, ফার্মগেট, মগবাজার, শাহবাগ এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সড়কগুলোয় স্বল্পসংখ্যক প্রাইভেট কার ও মোটরসাইকেল চলাচল করছে। অন্যদিনের তুলনায় রিকশার সংখ্যাও কম। রাসেল স্কয়ার মোড় ট্রাফিক পুলিশ বক্সের পাশের চেকপোস্টে কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে। অবশ্য যানবাহন এবং মানুষের চলাচল কম থাকায় তাদের ব্যস্ততা অন্য দিনের তুলনায় অনেক কম ছিল।
পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের সার্জেন্ট নাজমুল হক বলেন, ‘আগের চেয়ে অনেক ভালো পরিস্থিতি। শুক্রবার ছুটির দিন হওয়ায় সড়কে মানুষের চলাচল নেই। যানবাহনের সংখ্যাও একেবারে কম। দুপুরের আগ পর্যন্ত রাস্তাঘাট ফাঁকা থাকলেও বিকেলে কিছুটা ভিড় বাড়ে। আমরা চেকপোস্টে তৎপর রয়েছি।’
অন্যদিকে সড়কের আশপাশের দোকানপাট বন্ধ থাকলেও জমজমাট ছিল আবাসিক এলাকার বাজার ও মুদি দোকানগুলো। সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় অনেকেই বের হচ্ছিলেন বাজার করতে। তবে করোনা সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতির মাঝেও অনেককেই স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব মেনে চলতে দেখা যায়নি। সঠিকভাবে মাস্ক পরিধানেও ছিল অনীহা।
জানতে চাইলে বিমানবন্দরের গোলচত্বর সামনের রেললাইনের পাশের কাঁচাবাজারের দোকানি মাসুদ বলেন, শুক্রবার হওয়ায় কমবেশি সবাই সাপ্তাহিক বাজারের জন্য বের হয়েছেন। সকাল থেকেই ভালো বেচাকেনা হচ্ছে।
বিমানবন্দর গোলচত্বরের চারপাশে প্রচুর খালি রিকশাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে যাত্রীর অপেক্ষায়। এখানে দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশ সদস্য বলেন, ‘সাপ্তাহিক ছুটি ও লকডাউন মিলে একেবারেই ফাঁকা। রাস্তায় মানুষ, গাড়ির সংখ্যাও কম। তারপরও আমরা জিজ্ঞাসাবাদ করছি। কয়েকটি মোটরসাইকেলে যাত্রী নেওয়া হয়। যাত্রীকে নামিয়ে তাদের জরিমানা করেছি।’
ডিএমপি পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আজ (গতকাল) রাস্তাঘাট ছিল একেবারে ফাঁকা। তারপরও আইনগত ব্যবস্থা নিতে হয়েছে। নির্দেশনা অমান্য করায় ভ্রাম্যমাণ আদালত ৪১৪টি যানবাহনকে ৮ লাখ ৯২ হাজার ৫০০ টাকা ও ১২৯ জনকে ১ লাখ ৫৬ হাজার ৭৫০ টাকা জরিমানা করেছে। আর গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৫৮৫ জনকে।’
গত বুধবার সিএমএম আদালতে রুহুল আমিন ও আবদুর রহমান নামে দুই ব্যক্তি অভিযোগ করেন, বিনা প্রয়োজনেই বাসা থেকে বের হয়েছিলাম। মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ নুরজাহান রোড থেকে আটক করেছিল। ওই সময় দুজনের কাছ থেকে ২ হাজার টাকা নিয়েছে। তারপরও আমাদের ছাড়েনি। পরে আদালত ১০০ টাকা জরিমানা করে ছেড়ে দিয়েছে। একই অভিযোগ করেন, নর্দা এলাকার বাসিন্দা আফজাল হোসেন। তিনি বলেন, পুলিশ তার কাছ থেকে দেড় হাজার টাকা নিয়ে ছেড়ে দেয়।
তবে পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, ‘অসাধু পুলিশের কতিপয় সদস্য এই কাজ করলেও করতে পারে। কিন্তু ঢালাওভাবে অভিযোগ করা ঠিক হবে না। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো কাজ করছে। কাউকে হয়রানি করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’