আইন অনুযায়ী বিদেশে বাংলাদেশিদের বিনিয়োগের সুযোগ নেই। এ সংক্রান্ত কোনো নীতিমালা না থাকায় কেইস টু কেইস ভিত্তিতে বা বিশেষ বিবেচনায় বিভিন্ন কোম্পানিকে বিদেশে বিনিয়োগের অনুমোদন দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাস্তবতা বিবেচনায় বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের বিদেশে বিনিয়োগের নীতিমালা তৈরি করতে ২০১৭ সাল থেকে কাজ করছে সরকার গঠিত কমিটি। ২০২১ সালে এই নীতিমালার খসড়া তৈরি হয়েছে এবং এর ওপর স্টেকহোল্ডারদের মতামত নিয়ে তা চূড়ান্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গতকাল বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) কর্তৃক ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে আয়োজিত ‘বহির্বিশ্বে বাংলাদেশি বিনিয়োগ নীতিমালার খসড়া’ বিষয়ক কর্মশালায় সভাপতির বক্তব্যে খসড়া চূড়ান্ত হবে বলে জানান সংস্থাটির নির্বাহী চেয়ারম্যান মো. সিরাজুল ইসলাম।
সিরাজুল ইসলাম বলেন, বিডার গভর্নিং বোর্ডের প্রথম সভায় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় এই নীতিমালা তৈরির কথা বলা হয়েছিল এবং দ্বিতীয় গভর্নিং বোর্ড সভায় বিডাকে এর খসড়া চূড়ান্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সে লক্ষ্যেই আমরা কাজ করে যাচ্ছি। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়তায় আমরা ১৩ অনুচ্ছেদ বিশিষ্ট একটি খসড়া প্রস্তুত করেছি এবং তা বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের কাছ পাঠিয়ে থেকে মতামত চাওয়া হয়েছে। স্টেকহোল্ডারদের মতামতের পরিপ্রেক্ষিতে অনেক খাত চিহ্নিতকরণসহ বিভিন্ন সংযোজন-বিয়োজন করা হবে। উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্নযাত্রার কথা মাথায় রেখে শিগগিরই বহির্বিশ্বে বাংলাদেশি বিনিয়োগ নীতিমালার চূড়ান্ত খসড়া তৈরি করা হবে।
‘বহির্বিশ্বে বাংলাদেশি বিনিয়োগ নীতিমালা-২০২১’-এর খসড়ায় বিদেশের কৃষি খাতের বিনিয়োগে বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন দেশের কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও বিদ্যমান নীতি কাঠামো, অগ্রাধিকার ক্ষেত্র প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা, ভূমি আইন পর্যালোচনা করে কৃষি খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করা হবে। এছাড়া যেসব খাতে বেশিসংখ্যক বাংলাদেশি পেশাজীবী, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ করা যাবে, সেসব খাতে বিনিয়োগকে উৎসাহিত করা হবে।
খসড়ায় বলা হয়েছে, দেশের উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান আগের পাঁচ বছরের গড় রপ্তানির ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বিদেশে বিনিয়োগ করতে পারবে। বিনিয়োগের আয় ও লভ্যাংশ দেশে আনতে ব্যর্থ হলে অর্থ পাচার ও মানি লন্ডারিং অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। বিদেশে বিনিয়োগকারীকে পাঁচ বছরের নিরীক্ষিত হিসাব বিবরণী অনুযায়ী আর্থিকভাবে সচ্ছল হতে হবে। কোনো ঋণখেলাপি কিংবা শুল্ক, মূসক ও আয়কর অপরিশোধিত থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বিদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অযোগ্য বিবেচিত হবে।
গতকালের কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান ফজলুর রহমান বলেন, ‘গত এক দশকে আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে, তাই এখন আমরা বহির্বিশ্বে বিনিয়োগের কথা ভাবছি, যা দশ বছর আগেও ছিল কল্পনার বাইরে। তাই বহির্বিশ্বে বিনিয়োগের নীতিমালা প্রণয়ন করা এখন সময়ের দাবি, তবে এক্ষেত্রে আগে আমাদের খাতগুলো চিহ্নিত করতে হবে। একই সঙ্গে আমাদের এমনভাবে নীতিমালা প্রণয়ন করা উচিত যাতে কোনোরকম মানি লন্ডারিং লিকেজ ইস্যু না থাকে।’
বিডার উপপরিচালক নুসরাত জাহানের সঞ্চালনায় শুরুতেই স্বাগত বক্তব্য রাখেন বিডার নির্বাহী সদস্য মহাসিনা ইয়াসমিন। এ সময়ে বিডার মহাপরিচালক শাহ্ মোহম্মদ মাহাবুব ১৩ অনুচ্ছেদ বিশিষ্ট ‘বহির্বিশ্বে বাংলাদেশি বিনিয়োগ নীতিমালার খসড়া’ উপস্থাপন করেন। ওয়েবিনারে বিভিন্ন সরকারি-বেসকারি প্রতিষ্ঠান, চেম্বার্স অফ কমার্স-এর প্রায় একশ (১০০) এর মতো প্রতিনিধিবৃন্দ ৬টি গ্রুপে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের বিনিয়োগ সংক্রান্ত নীতিমালা পর্যালোচনা করে মতামত প্রদান করেন। বিডার পরিচালক কাজী আবু তাহের বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের বিনিয়োগ সংক্রান্ত নীতিমালা পর্যালোচনার সার সংক্ষেপ উপস্থাপন করেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০১৩ সালে প্রথমবারের মতো একটি প্রতিষ্ঠানকে বিদেশে বিনিয়োগের অনুমতি দেওয়া হয়। এরপর থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, আকিজ গ্রুপসহ বাংলাদেশি ১০টি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান দেশের বাইরে বিনিয়োগ করেছে। বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো এ পর্যন্ত যেসব দেশে বিনিয়োগ করেছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- মিয়ানমার, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কেনিয়া, ইথিওপিয়া, এস্তোনিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র।