যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে (বালক) বিক্ষোভ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে বন্দি শিশুরা। গত শনিবার মধ্যরাতে কেন্দ্রের আবাসিক ভবনে এ ঘটনা ঘটে। নিম্নমানের খাবার সরবরাহের অভিযোগ তুলে খাদ্যের পরিমাণ বৃদ্ধি ও মানোন্নয়নের দাবিতে বন্দি শিশুরা ওই বিক্ষোভে অংশ নেয়।
রাত ১০টা থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ প্রায় তিন ঘণ্টা পর রাত ১টার দিকে জেলা প্রশাসক ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে নিয়ন্ত্রণে আসে। এ সময় এক বন্দি কিশোর ও পুলিশের এক এসআই আহত হন। শিশু বন্দিদের বিক্ষোভের কারণ খতিয়ে দেখতে গতকাল রবিবার যশোরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কাজী সায়েমুজ্জামানকে প্রধান করে দুই সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র এলাকার চাঁচড়া পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক মো. রোকিবুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে জানান, রাত ১০টার পরপর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের বন্দিরা বিভিন্ন দাবিতে ভাঙচুর শুরু করে। তারা ভবনের গ্লাস ভাঙা ছাড়াও ভেতরে আগুনও ধরায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য কেন্দ্রে ছুটে যান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কাজী সায়েমুজ্জামান, নেজারত ডেপুটি কালেক্টর (এনডিসি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এএম মামুনুর রশিদ। রাত ১টার কিছু সময় আগে সেখানে পৌঁছান জেলা প্রশাসক মো. তমিজুল ইসলাম খান। এছাড়া অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) জাহাঙ্গীর আলম এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক-সার্কেল) বিলাল হোসেনের নেতৃত্বে বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য ঘটনাস্থলে যান।
জানা গেছে, ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ কর্মকর্তারা শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের বন্দিদের প্রতিনিধি হিসেবে তিন কিশোর রাকিব, সাব্বির ও শাকিলকে ডেকে নিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলেন। ওই তিন কিশোর কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগ করে, তাদের পেটপুরে খেতে দেওয়া হয় না। দুপুরে হাফ প্লেট ভাত, রাতে এক পিস রুটি দেওয়া হয়। এতে তাদের ক্ষুধা নিবারণ হয় না। এছাড়া স্বজনরা এসে টাকা বা খাবার দিয়ে গেলে কেন্দ্রে কর্তব্যরতরা তা না দিয়ে আত্মসাৎ করে। তারা খাদ্যের পরিমাণ বৃদ্ধি ও মানোন্নয়নের দাবি জানায়। এ সময় ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ কর্মকর্তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। তারা বিক্ষোভ-ভাঙচুররতদের নিবৃত করার জন্য ওই তিন প্রতিনিধিকে ভেতরে পাঠান।
তবে যশোর জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক অসিত কুমার সরকার দাবি করছেন, বন্দিদের অভিযোগ পুরোপুরি ঠিক নয়।
শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক জাকির হোসেন জানান, গোলযোগে একজন বন্দি আহত হওয়ায় তাকে যশোর জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তবে তিনি ওই বন্দির নাম বলতে পারেননি। এছাড়া মফিজুল ইসলাম নামে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একজন এসআইও আহত হয়েছেন বলে তথ্য মিলেছে।
কেন্দ্রের গোলযোগ নিয়ন্ত্রণে আসার পর রাত দেড়টার দিকে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) কাজী সায়েমুজ্জামান কেন্দ্রের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসেন। বাইরে অপেক্ষারত সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন তিনি। এর আগেই বেরিয়ে যান জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. তমিজুল ইসলাম খান।
কাজী মো. সায়েমুজ্জামান বলেন, ‘১৫০ জন ধারণক্ষমতার কেন্দ্রটিতে ২৪৮ জন বন্দি রয়েছে। বেশকিছু দাবিতে তাদের অসন্তোষ রয়েছে। তাদের কথা শুনেছি। সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়েছি। তিন ঘণ্টা পর বিক্ষুব্ধ বন্দিদের শান্ত করা সম্ভব হয়েছে।’
কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক জাকির হোসেন বলেন, বেশ কিছুদিন ধরে কেন্দ্রের বন্দিরা প্রত্যেক বন্দির জন্য দৈনিক ৭২ টাকা করে খাদ্যের বরাদ্দ দাবি তুলে আসছিল। তাছাড়া কেন্দ্রটিতে আলাদা আলাদা রুমে সিনিয়র-জুনিয়র ভেদে খাদ্য সরবরাহ ও সুযোগ-সুবিধার দাবি তুলেছিল। সেই দাবিতে শনিবার রাতে বন্দিদের মধ্যে বিক্ষোভ শুরু হয়। পরে কেন্দ্রের আনসার সদস্যরা বিক্ষোভ বন্ধে অভিযান চালান। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে যশোর জেলা পুলিশের দুই শতাধিক সদস্য অভিযান চালান।
এর আগে ২০২০ সালের ১৩ আগস্ট যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে তিন বন্দি কিশোরকে ‘হত্যা’ ও ১৫ জনের আহত হওয়ার ঘটনায় তোলপাড় হয়েছিল। ওই ঘটনায় একাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হয়নি। ফলে কেন্দ্রে বারবার এমন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।