কোরবানির পশুর চামড়ায় গত দু’বছর ভয়াবহ বিপর্যয়ের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে এবার নড়েচড়ে বসেছে সরকার। কীভাবে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ করা যায়, তা নিয়ে আগামীকাল জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে বৈঠক বসছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। ওই বৈঠকে শিল্প, পশুসম্পদ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও জনস্বাস্থ্য বিভাগের প্রতিনিধিরাও অংশ নেবেন। চামড়া সংরক্ষণ, দেশব্যাপী স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ ও সার্বিকভাবে পশুর চামড়ার যথাযথ ব্যবস্থাপনার ইস্যুগুলো গুরুত্ব পাবে। এছাড়া ব্যবসায়ীরা যেন চামড়া কিনতে পারে সেজন্য সহজ শর্তে ব্যাংকঋণও নিশ্চিত করার বিষয়টি আলোচিত হবে বৈঠকে। এর পরের দিন বৃহস্পতিবার এ বছরের কোরবানি পশুর চামড়ার দাম নির্ধারণী বৈঠক ডাকা হয়েছে।
এদিকে পর্যাপ্ত মজুদ থাকার পরেও লবণের বাজারে ঈদের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। এ নিয়ে ব্যবসায়ীরা পড়েছেন নতুন চিন্তায়। তবে সিন্ডিকেট করে লবণের দাম বাড়ালে কঠোর পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দিয়েছে বাংলাদেশ ক্ষদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)। বাণিজ্য সচিব তপন কান্তি ঘোষ দেশ রূপান্তরকে বলেন, একটি সমন্বয় বৈঠক ডাকা হয়েছে। বৈঠকে শিল্প, পশুসম্পদ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে কীভাবে সারা দেশে পশুর হাটে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করা যায় এবং পশু কোরবানির পর লবণ দিয়ে চামড়া সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ কী হতে পারে সেটি নিয়ে সভায় আলোচনা হবে। এজন্য ডিসিদের পরামর্শ নেওয়া হবে। সে আলোকে পরবর্তীতে নির্দেশনা দেওয়া হবে। কিন্তু কোনোভাবেই পশুর চামড়া নষ্ট হতে দেওয়া হবে না। সে ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ থাকবে এবার।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘প্রতি বর্গফুটে পশুর চামড়ার দাম নির্ধারণে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। এ সময় আন্তর্জাতিক বাজারে দাম ও দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নেওয়া হবে। দাম বাড়বে না কমবে তা বৃহস্পতিবারের পর জানা যাবে।’
ঈদুল আজহায় গত দু’বছর থেকে কোরবানির পশুর চামড়ার দর বিপর্যয় হচ্ছে। ঢাকায় প্রতিটি গরুর চামড়া সর্বনিম্ন ১০০ থেকে সর্বোচ্চ ৬০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। আর ছাগলের চামড়া অনেকে ফ্রি দিয়েছেন। আর দু-চারজন দাম দিলেও তা এক বর্গফুটের নির্ধারিত দামে পুরো চামড়া কিনেছেন। যদিও এই দর বিপর্যয় ঠেকাতে ঈদুল আজহার আগে চামড়া ব্যবসায়ীদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেছিল সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থা। এমনকি অর্থের ঘাটতি মেটাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ ঋণ সুবিধাও অব্যাহত ছিল। এরপরেও চামড়ার দর মেলেনি।
গত বছর দেশের করোনা মহামারী, বন্যার দুর্যোগ ও আন্তর্জাতিক বাজারে দর বিপর্যয় বিবেচনায় নিয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে আগের বছরের চেয়েও প্রায় ২৩ থেকে ৩০ শতাংশ কমিয়ে দর নির্ধারণ করা হয়েছিল। নির্ধারিত ওই দর গত দশ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন ছিল।
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহীন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, বৃহস্পতিবার দাম নির্ধারণে মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সভা হবে। সভায় আমরা প্রস্তাবনাসমূহ তুলে ধরব। তিনি বলেন, করোনা পরিস্থিতির কারণে ব্যবসায়ীরা বড্ড বেকায়দায় রয়েছেন। এজন্য এবার আর দাম বাড়ানোর কোনো সম্ভাবনা নেই। আমরা চাই গত বছর যা নির্ধারণ করা হয়েছিল. এ বছর তা অপরিবর্তিত থাকুক।
ব্যাংকঋণ নিয়ে বৈঠক : এদিকে ব্যাংকগুলোর সঙ্গে চামড়া ব্যবসায়ীদের বৈঠক হয়েছে। এবারও চামড়া কেনায় ব্যবসায়ীদের জন্য ব্যাংকঋণের সুবিধা অব্যাহত রাখা হবে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সভায় ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে ৩০০-৪০০ কোটি টাকা ব্যাংকঋণ চাওয়া হয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে ব্যাংকগুলো সিদ্ধান্ত নেবে বলে জানা গেছে।
ঈদের প্রভাব লবণের বাজারে : দেশে লবণের মজুদ পর্যাপ্ত রয়েছে। তারপর কোরবানির ঈদ সামনে রেখে বেড়েছে পশুর চামড়া সংরক্ষণের প্রধান উপাদান লবণের দাম। এক সপ্তাহ আগেও যেখানে প্রতি বস্তা লবণ বিক্রি হতো ৫৫০ টাকায়, কয়েক দফা বেড়ে এখন ওই বস্তা বিক্রি হচ্ছে ৭০০ টাকায়।
দেশে জাতীয় লবণ নীতি নামের একটি নীতিমালা রয়েছে। এতে ২০১৯-২০ অর্থবছরে অপরিশোধিত লবণের চাহিদা দেখানো হয়েছে ১৭ লাখ টনের কিছু বেশি। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো এ হিসাব মানে না। লবণ মিল মালিক সমিতির হিসাবে দেশে অপরিশোধিত লবণের চাহিদা ২৮ থেকে ৩০ লাখ টন। নারায়ণগঞ্জ লবণ মিল মালিক গ্রুপের হিসাবে ২৮ লাখ টন। আর বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) হিসাবে ২৮ থেকে ৩০ লাখ টন। ট্যারিফ কমিশন অপরিশোধিত লবণের চাহিদা প্রাক্কলন করেছে ২২ লাখ ৩২ হাজার টন। কমিশন বলছে, লবণ নীতিতে রাসায়নিক, ওষুধ, সিরামিক, রং প্রভৃতি নানা শিল্পে লবণের চাহিদা বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) তথ্য অনুযায়ী, চলতি লবণ মৌসুমে লবণ মাঠে ১৬ লাখ ৫১ হাজার মেট্রিক টন ক্রুড লবণ উৎপাদন হয়েছে। চলতি লবণ মৌসুমে নতুন লবণ আসার আগ পর্যন্ত পুরনো লবণের মজুদ ছিল ৩ লাখ ৪৮ হাজার টন। সব মিলিয়ে মোট লবণের পরিমাণ ১৯ লাখ ৯৯ হাজার টন। চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত মাঠ ও মিল পর্যায়ে লবণের মোট মজুদ ছিল ১১ লাখ ৪৫ কোটি টন (লবণ মাঠে ৯ লাখ ৬০ হাজার টন এবং মিলে ১ লাখ ৮৫ হাজার টন)। এছাড়া দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলায় অবস্থিত ডিলার, পাইকারি, খুচরা বিক্রেতাদের কাছে পর্যাপ্ত লবণ মজুদ আছে।
এ বিষয়ে পুরান ঢাকার পোস্তার কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ী ও বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব হাজি টিপু সুলতান বলেন, কোরবানি সামনে রেখে চামড়া সংরক্ষণের প্রধান উপাদান লবণের কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়। এবারও গত কয়েক সপ্তাহ ধরে লবণের দাম ঊর্ধ্বমুখী। এ বিষয়ে সরকারের কোনো পদক্ষেপ নেই।
এ প্রসঙ্গে বিসিকের চেয়ারম্যান মোশতাক হাসান বলেন, একটি অসাধু চক্র বেশি মুনাফার লোভে কোরবানির আগে দাম বাড়াচ্ছে। যার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। কারণ দেশে এখন চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত লবণ মজুদ আছে। আমরা মিল মালিকদের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা জানিয়েছেন দাম বাড়বে না। তারপরও যারা দাম বাড়াচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী ঈদুল আজহায় সম্ভাব্য কোরবানির যোগ্য পশুর সংখ্যা ১ কোটি ১৮ লাখ। এর মধ্যে গরু ও মহিষ ৪৫ লাখ ৩৮ হাজার এবং ছাগল ও ভেড়া ৭২ লাখ ৫৬ হাজার। কোরবানির যোগ্য পশুর সংখ্যার ভিত্তিতে প্রতিটি গরু-মহিষের চামড়া সংরক্ষণে ১০ কেজি এবং ছাগল ও ভেড়ার চামড়া সংরক্ষণে ৫ কেজি লবণের প্রয়োজন হয়, যার পরিমাণ ৮১ হাজার ৮২০ টন।