সিআরবিতে বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্প

ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ার পরও ‘অনড়’ রেল কর্তৃপক্ষ

শতাধিক শতবর্ষী গাছ ও সবুজঘেরা নগরীর সিআরবি এলাকা। যেখানে প্রতিদিন হাজারো মানুষ প্রাণভরে খানিকটা নিঃশ্বাস নিতে ভোর থেকে রাত অবধি আসা-যাওয়া করেন। রেলপথ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর উদ্যোগে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান কার্যালয়ের চারপাশ, শিরীষতলা, সাত রাস্তার মোড়সহ পুরো এলাকায় সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ করায় এবং দৃষ্টিনন্দন ওয়াকওয়ে নির্মিত হওয়ায় প্রতিনিয়ত অসংখ্য মানুষ ভিড় জমান। শুক্রবারসহ ছুটির দিনে জনসমাগম বেড়ে যায়।

চট্টগ্রামের ঐতিহ্য সিআরবি এলাকায় রেলওয়ে কর্র্তৃপক্ষ পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) ভিত্তিতে ৫০০ শয্যার বিশেষায়িত হাসপাতাল ও ১০০ আসনের মেডিকেল কলেজ স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। এ নিয়ে জটিলতা ও বিতর্কের পাশাপাশি বন্দরনগরী চট্টগ্রামের মানুষের মাঝে ক্ষোভ বিরাজ করছে। এই হাসপাতাল নির্মাণ বন্ধে সামাজিক ও পরিবেশবাদী অনেক সংগঠন প্রতিবাদ কর্মসূচি ও আন্দোলনের ডাক দিয়েছে। সিআরবির সাত রাস্তার মোড়ে আজ বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টায় প্রতিবাদী অবস্থান কর্মসূচি ডেকেছে নাগরিক সমাজ, চট্টগ্রাম নামে একটি সংগঠন। তবুও প্রকল্প বাস্তবায়নে অনড় রেল কর্র্তৃপক্ষ।

এ ছাড়া সিআরবিতে রেলওয়ের এ প্রকল্প বন্ধ এবং আগামী সাত দিনের মধ্যে পরিবেশ বিনষ্টকারী এ প্রকল্পের স্থান অন্য কোনো যৌক্তিক জায়গায় সরিয়ে নিতে গতকাল মন্ত্রিপরিষদ সচিব, রেল সচিব, রেলওয়ের মহাপরিচালকসহ আটজনকে লিগ্যাল নোটিস দিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন (বিএইচআরএফ)। বিএইচআরএফ চট্টগ্রাম চ্যাপ্টারের সভাপতি অ্যাডভোকেট এ এম জিয়া হাবিব আহসানের পক্ষে ডাক ও ই-মেইলে নোটিস পাঠিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার হাসান এম এস আজিম। নোটিস পাঠানো অন্য পাঁচজন হলেন রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক, পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ অথরিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার।

নোটিসে বলা হয়, পরিবেশ, ঐতিহ্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যহানি না হতে আগামী সাত দিনের মধ্যে পরিবেশ বিনষ্টকারী এই প্রকল্পের স্থান অন্য কোনো যৌক্তিক জায়গায় সরিয়ে নিতে হবে। অনথ্যায় বিএইচআরএফের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে উপযুক্ত আদালতে মামলা কিংবা উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করা হবে।

এদিকে, সিআরবিতে রেলের হাসপাতাল নির্মাণ নিয়ে গত মঙ্গলবার বিকেলে নিজের ভেরিফাইড ফেইসবুক পেজে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন শিক্ষা উপমন্ত্রী ও চট্টগ্রাম-৯ আসনের এমপি ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। তিনি লিখেছেন, ‘শহরের প্রাণকেন্দ্রে এই দৃষ্টিনন্দন সবুজ জায়গায়, পরিবেশের কোনো ক্ষতি করে এই উন্মুক্ত জায়গায় যেন অবকাঠামো নির্মাণ না হয়, এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। প্রকল্পের জায়গা আর উন্মুক্ত জায়গাসমূহের স্থান এক নয় বা একই জায়গায় কি না, সেটি নিয়ে আলোচনা হবে। একই স্থানে হলে সেটিকে সরানোর প্রয়োজন হবে। কোনোভাবেই উন্মুক্ত জায়গায় অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে না।’

ওই স্ট্যাটাসে নগর যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক ফরিদ মাহমুদ মন্তব্য করে লিখেছেন, ‘বৃহৎ আকারের হাসপাতালকে ঘিরে ছোট উপশহর গড়ে ওঠে। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে এমন অনেক হাসপাতাল আছে। সিআরবির সম্পূর্ণ এলাকাটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে। এর অপার সৌন্দর্যে নগরবাসী মুগ্ধ। এখানে কেন হাসপাতাল করা হবে? শহরের উপকণ্ঠে হাসপাতাল করলে সব দিক দিয়ে সুবিধে। এভারকেয়ার হাসপাতাল অক্সিজেন, পাহাড়তলী এলাকায় ইম্পেরিয়াল। নতুনটা হবে ইউনাইটেড হাসপাতাল। সেটা বায়েজিদ নতুন লিঙ্ক রোডে হতে পারে। সেখানে খাসজমিও আছে।’

এদিকে, গতকাল সিআরবি এলাকায় হাসপাতাল নির্মাণ স্থানটি পরিদর্শন করেছেন আওয়ামী লীগ, চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের নেতারা। তাদের মধ্যে ছিলেন মহানগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন, উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আবদুস সালাম এবং দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোছলেম উদ্দিন আহমেদ প্রমুখ।

রেল কর্র্তৃপক্ষের ভাষ্য : সিআরবিতে হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ নির্মাণ প্রসঙ্গে রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সিআরবি রেলওয়ের জায়গা। রেলওয়ের জায়গায় রেলওয়ে যা করার করবে। এখানে তো কোনো সমস্যা দেখি না। ভালো উদ্যোগে বাধা আসবে। মুক্তিযুদ্ধের সময়ও একটি পক্ষ বিরোধিতা করেছিল; এখানেও তাই। পরিবেশ নষ্ট না করেই সিআরবিতে হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ নির্মাণ করা হবে। এটা সিদ্ধান্ত নেওয়া আছে। এখন বাস্তবায়ন হবে।’

এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক ও রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ট্র্যাক) মো. আহসান জাবির বলেন, ‘সিআরবি এলাকায় ৫০০ শয্যার একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল ও ১০০ সিটের একটি মেডিকেল কলেজ নির্মাণ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। পিপিপির আওতায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নে রেলওয়ের সঙ্গে ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজের চুক্তি হয়েছে। শিগগিরই প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু হবে।’

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সিআরবি এলাকায় রেলের প্রায় ৬ একর জায়গার ওপর ৫০০ শয্যার এই বিশেষায়িত হাসপাতালটি নির্মাণ করা হবে। সেখানে রেলওয়ের হাসপাতাল (বক্ষব্যাধি) সংলগ্ন ও দক্ষিণ অংশে গড়ে তোলা হবে এই হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ। এ অংশে রেলওয়ের কয়েকটি কোয়ার্টারও রয়েছে। এ বিশেষায়িত হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ নির্মাণে গত বছর ১৮ মার্চ ইউনাইটেড গ্রুপের সঙ্গে রেলপথ মন্ত্রণালয় চুক্তি করেছে।