করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আরোপিত কঠোর বিধিনিষেধ ঈদুল আজহা উপলক্ষে গতকাল মধ্যরাত থেকে আগামী ২৩ জুলাই সকাল ৬টা পর্যন্ত শিথিল করেছে সরকার। তবে বিধিনিষেধ শিথিল হওয়ার আগেই গতকাল বুধবার সকাল থেকেই রাজধানী ছাড়তে শুরু করে বাড়িমুখী বহু মানুষ।
টানা ১৪ দিনের ‘লকডাউন’র শেষ দিনে গতকাল মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া এবং মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া ফেরিঘাটে যেন মানুষের ঢল নামে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের প্রবেশদ্বার খ্যাত এই দুই নৌপথে সকাল থেকেই ফেরিতে পণ্যবাহী ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, অ্যাম্বুলেন্স ও ব্যক্তিগত গাড়ি পার হতে দেখা গেছে। লকডাউন শিথিলের খবরে ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-আরিচা এবং ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কেও বাড়ে কার ও মাইক্রোবাসসহ বিভিন্ন ছোট যানবাহনের চলাচল। এমনকি বাড়তি যানবাহনের চাপে কোথাও কোথাও জট লেগে যায়। ঈদকে সামনে রেখে করোনায় মৃত্যু ও সংক্রমণ ঝুঁকির মধ্যেই বাড়িমুখী মানুষের এমন ভিড় দেখা যায়।
এদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কে গত মঙ্গলবার সকাল থেকে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। কাঁচপুর ও মেঘনা সেতুর মাঝামাঝি লাঙ্গলবন্দ সেতুর ক্ষতিগ্রস্ত ডেক স্ল্যাম মেরামতের কাজ চলায় দেশের অন্যতম ব্যস্ত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। ফলে বিকল্প সড়ক হিসেবে কাঁচপুর-ভুলতা-নরসিংদী-ভৈরব ব্রিজ-সরাইল-ব্রাহ্মণবাড়িয়া-কুমিল্লা মহাসড়কে যানবাহন চলাচল করায় এই যানজট দেখা দেয়। বিস্তারিত দেশ রূপান্তরের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরে :
পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে যানবাহনের চাপ বাড়ছে : মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে লকডাউন শিথিলের আগের দিন যাত্রী ও ছোট গাড়ির চাপ বাড়ে। ঈদ ঘনিয়ে আসায় পণ্যবাহী পরিবহনের সঙ্গে যাত্রী ও ছোট গাড়ি পার হচ্ছে এই নৌরুট দিয়ে। লকডাউন শিথিলের খবরে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কেও বেড়েছে প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন ছোট যানবাহন। পুলিশের চেকপোস্ট ফাঁকি দিয়ে মানুষ এ মহাসড়ক হয়ে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের ২১টি জেলার প্রবেশপথ পাটুরিয়া প্রান্তে যাচ্ছে। সেখানে জরুরি যানবাহনের সঙ্গে যাত্রীরা পার হচ্ছেন।
বিআইডব্লিউটিসির আরিচা কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত ডিজিএম মো. জিল্লুর রহমান দেশ রূপান্তরকে জানান, গতকাল সকাল থেকেই পাটুরিয়া ফেরিঘাটে ব্যক্তিগত যানবাহনের চাপ বেড়েছে। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত মাত্র ৯টি ফেরি দিয়ে যানবাহন পারাপার করা হচ্ছিল। পরে পশুবাহী ও জরুরি পণ্যবাহী ট্রাকের সংখ্যা বাড়লে এ বহরে ৬টি ফেরি যুক্ত করা হয়।
শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌরুটে যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড় : মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌরুটে গতকাল যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড় ছিল। সকাল থেকেই ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের বিভিন্ন চেকপোস্ট পেরিয়ে যাত্রীরা ঘাটে আসতে থাকে।
বিআইডব্লিউটিসির শিমুলিয়া ঘাটের ট্রাফিক সুপারিন্টেন্ডেন্ট মেহেদী হাসান জানান, লকডাউন শিথিলের ঘোষণায় চেকপোস্টে কড়াকড়ি কমে গেছে। সে জন্য ঘাটে যাত্রীর চাপ বেড়েছে।
বিআইডব্লিউটিসির শিমুলিয়া ঘাটের ব্যবস্থাপক (বাণিজ্য) সাফায়েত আহমেদ জানান, এ নৌরুটে ১১টি ফেরি চলাচল করছে। যাত্রীর চাপ বাড়ছে। লঞ্চ বন্ধ থাকায় বাধ্য হয়ে ফেরি দিয়ে পারাপার হচ্ছে দক্ষিণবঙ্গের মানুষ। গতকাল মধ্যরাত থেকে সব ধরনের নৌযান চলাচলের ঘোষণায় শিমুলিয়া ঘাটের স্পিডবোট, লঞ্চ ও ট্রলার মালিক-শ্রমিকদের মধ্যে চাঞ্চল্য দেখা গেছে।
শিমুলিয়া ঘাটে ফরিদপুরের ভাঙ্গাগামী যাত্রী আলমগীর হোসাইন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বৃহস্পতিবার থেকে লকডাউন না থাকলে অনেক ভিড় হবে তাই একদিন আগেই গ্রামে ফিরছি।’
বাংলাবাজার ফেরিঘাটে যাত্রীর চাপ : মাদারীপুরের শিবচরের বাংলাবাজার ঘাটে ঢাকাগামী পণ্যবাহী পরিবহনসহ সাধারণ যানবাহন এবং ঘরমুখো যাত্রীদের চাপ রয়েছে। এছাড়া ঢাকাগামী যাত্রীদেরও ভিড় রয়েছে। গতকাল সকাল থেকেই ফেরিতে পণ্যবাহী ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, অ্যাম্বুলেন্স ও ব্যক্তিগত গাড়ি পার হতে দেখা গেছে। বৃহস্পতিবার থেকে লকডাউন শিথিলের ঘোষণা আসার পর থেকেই ঘাটে যাত্রীদের উপস্থিতি বেড়ে গেছে।
পন্টুনে ঝুঁকি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকছে গাড়ি : কোনো যানবাহন যাতে দুর্ঘটনায় না পড়ে সে জন্য ফেরির পন্টুনের ওপর সব ধরনের যানবাহন রাখা নিষেধ। কিন্তু সেই নিষেধ অমান্য করে ফেরিতে ওঠার জন্য রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের দৌলতদিয়া ঘাটে বিভিন্ন যানবাহন ঝুঁকি নিয়েই পন্টুনে অপেক্ষা করছে। ঢাকামুখী যানবাহনগুলো ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের গোয়ালন্দ অংশে আসার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত ফেরির নাগাল পেতে চালকদের মধ্যে শুরু হয় প্রতিযোগিতা। ঘাটে ফেরি না থাকলেও এসব গাড়ির চালকরা পন্টুনে গিয়ে অপেক্ষা করতে থাকেন। পন্টুনে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় ফেরি ভেড়ার পর পন্টুনের সঙ্গে ধাক্কায় যেকোনো সময় গাড়ি নদীতে পড়ার আশঙ্কা থাকে। পন্টুন বা সংযোগ সড়কে গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকলে আনলোড হওয়া গাড়ি ওপরে ওঠার রাস্তা না পেয়ে যানজট লেগে যায়। এতে ভোগান্তি তৈরি হয়।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যানজট : ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে লাঙ্গলবন্দ সেতু সংস্কারের জন্য গত সোমবার রাত থেকে সেতুর ওপর দিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়ায় গত দুদিন ধরে এ মহাসড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। যানজটে চরম ভোগান্তিতে পড়েছে এ পথে চলাচলকারী হাজার হাজার পণ্যবাহী ট্রাক ও ব্যক্তিগত গাড়ি। পাশাপাশি রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স ও কোরবানির জন্য গরু বোঝাই ট্রাকও যানজটে আটকে থাকে। গত মঙ্গলবারের মতো গতকাল ভোর থেকেই ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে সৃষ্টি হয় তীব্র যানজট। লাঙ্গলবন্দ সেতু বন্ধ থাকায় সেতুটির উত্তর ও দক্ষিণ উভয় পাশেই যানবাহন আটকে মাইলের পর মাইল যানজটের সৃষ্টি হয়। গতকাল সকালে এ যানজট মহাসড়কের দাউদকান্দি পর্যন্ত ছাড়িয়ে যায়। এছাড়া ঢাকার দিকে সাইনবোর্ড এলাকা পর্যন্ত যানজট ছিল। গতকাল দুপুরে সেতুর সংস্কারকাজ সম্পন্ন হলে এটি যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়। পরে ধীরগতিতে এ সড়কে যানবাহন চলতে শুরু করে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কে যানজট : গত মঙ্গলবার সকাল থেকেই কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কের ব্রাহ্মণবাড়িয়া অংশে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। কাঁচপুর ও মেঘনা সেতুর মাঝামাঝি লাঙ্গলবন্দ সেতুর ক্ষতিগ্রস্ত ডেক স্ল্যাম মেরামতের কাজ চলায় দেশের অন্যতম ব্যস্ত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। ফলে বিকল্প সড়ক হিসেবে কাঁচপুর-ভুলতা-নরসিংদী-ভৈরব ব্রিজ-সরাইল-ব্রাহ্মণবাড়িয়া-কুমিল্লা মহাসড়কে যানবাহন চলাচল করছে। গতকাল সকাল থেকেই এই যানজটে আটকা পড়ে ট্রাক, কন্টেইনার, কাভার্ডভ্যানসহ হাজারও যানবাহন।