সারা দেশে হু হু করে বাড়ছে করোনাভাইরাস সংক্রমণ আর মৃত্যু। প্রতিদিনই মৃত্যু অথবা শনাক্তের নতুন রেকর্ড হচ্ছে দেশে। বিশেষ করে ভাইরাসটির ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে শহর-গ্রাম-মফস্বল সব জায়গায়ই লাগামহীন করোনা। ঢাকার বাইরে কোনো জেলায় এক দিন শনাক্তে রেকর্ড হলে আরেক জেলায় হচ্ছে সর্বোচ্চ মৃত্যু। প্রায় দুই মাসের এ ধারাবাহিকতায় প্রথমবারের মতো এক দিনে সর্বোচ্চ রোগী দেখল চট্টগ্রাম। চট্টগ্রামে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১ হাজার ৩ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে। করোনা শুরুর পর অঞ্চলটিতে এত রোগী আর কখনো শনাক্ত হয়নি। আগের ২৪ ঘণ্টায় দেশের অনেক এলাকায় মৃত্যুরও রেকর্ড হয়েছে। তবে গত এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে সর্বোচ্চ মৃত্যুর তালিকায় থাকা খুলনা বিভাগে আগের ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যু কমেছে।
দেশ রূপান্তরের নিজস্ব প্রতিবেদক, প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবরে বিস্তারিত
চট্টগ্রামে শনাক্তের হার ৩৫ শতাংশ : মহামারী শুরুর পর থেকে চট্টগ্রামে এক দিনে সর্বোচ্চসংখ্যক ব্যক্তির করোনা শনাক্ত হলো গত ২৪ ঘণ্টায়। এ সময়ে নতুন করে ১ হাজার ৩ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে। করোনা পরীক্ষার তুলনায় শনাক্তের হার ৩৫ শতাংশ। চট্টগ্রামে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হয়ে ১০ জন মারা গেছে।
গতকাল চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো করোনাসংক্রান্ত সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। সরকারি হিসাব অনুসারে, চট্টগ্রামে এখন পর্যন্ত ৬৭ হাজার ৭৮৭ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে, মারা গেছে ৮০০ জন।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ২ হাজার ৮৬৯ জনের করোনার নমুনা পরীক্ষা করা হয়। গত ২৪ ঘণ্টায় শনাক্তদের মধ্যে নগরের ৬৫২ জন। নগরের বাইরের বিভিন্ন উপজেলার ৩৫১ জন। চট্টগ্রামে গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়াদের মধ্যে চারজন শহরের, ছয়জন বিভিন্ন উপজেলার বাসিন্দা।
খুলনা বিভাগে করোনায় আরও ৩৬ জনের মৃত্যু : খুলনা বিভাগে করোনায় মৃতের সংখ্যা কমলেও বেড়েছে শনাক্তের সংখ্যা। গত ২৪ ঘণ্টায় করোনা আক্রান্ত হয়ে ৩৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ৬২১ জনের। গতকাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। এর আগে গত মঙ্গলবার বিভাগে ৪৮ জনের মৃত্যু এবং ১ হাজার ৫৮৮ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছিল।
স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তর সূত্র জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগের মধ্যে সর্বোচ্চ কুষ্টিয়া জেলায় ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া খুলনায় ৯, ঝিনাইদহে ৭, যশোরে ৫, মেহেরপুরে ২, চুয়াডাঙ্গা ও সাতক্ষীরায় ১ জন করে মারা গেছে।
খুলনা বিভাগের মধ্যে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয় চুয়াডাঙ্গায় গত বছর ১৯ মার্চ। করোনা সংক্রমণের শুরু থেকে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত বিভাগের ১০ জেলায় শনাক্ত হয়েছে ৭৬ হাজার ৪০১ জন। আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ১ হাজার ৭২৫ জন। এছাড়া সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৪৮ হাজার ৮২৭ জন।
রামেক হাসপাতালে ২৫ মৃত্যু : রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের করোনা ইউনিটে এক দিনে আরও ২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে সাতজনের করোনা পজিটিভ ছিল। বাকিরা উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। এদের মধ্যে চারজন মারা যায় করোনামুক্ত হওয়ার পর করোনা-পরবর্তী জটিলতা নিয়ে। মঙ্গলবার সকাল থেকে বুধবার সকালের মধ্যে এই ২৫ জনের মৃত্যু হয়।
রামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় মৃত ২৫ জনের মধ্যে ১২ জনের বাড়ি রাজশাহী জেলায়। এছাড়া চাঁপাইনবাবগঞ্জের ৩, নাটোরের ৩, নওগাঁর ২, পাবনার ৩, কুষ্টিয়ার ১ ও যশোর জেলার ১ জন। এদের মধ্যে ১৫ জন পুরুষ এবং ১০ নারী।
বয়স বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৯ জনের বয়স ৬১ বছরের ওপরে, ৫১ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে ৫, ৪১ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে ৭, ৩১ থেকে ৪০ বছর বয়সের মধ্যে ৩ ও ২১ থেকে ৩০ বছর বয়সের মধ্যে ১ জন। এ নিয়ে চলতি মাসের ১৪ দিনে রামেক হাসপাতালের করোনা ইউনিটে ২৪৮ জনের মৃত্যু হলো।
রামেক হাসপাতাল পরিচালক জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় এখানকার করোনা ইউনিটে ভর্তি হয়েছে ৭২ জন। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৫৪ জন। বুধবার সকাল পর্যন্ত এ হাসপাতালের করোনা ইউনিটের ৪৫৪টি বেডের বিপরীতে ভর্তি ছিল ৫০০ জন। এদের মধ্যে ২৩২ জনের করোনা পজিটিভ রয়েছে। বাকিরা উপসর্গ নিয়ে ভর্তি রয়েছে।
বরিশালে ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যু ১৯ : বরিশাল বিভাগে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনা শনাক্তের সংখ্যা কমেছে। তবে বেড়েছে মৃত্যুর সংখ্যা। গত ২৪ ঘণ্টায় গতকাল সকাল পর্যন্ত বিভাগে ১ হাজার ৩২২ জনের নমুনা পরীক্ষায় বিভাগে ৫৩৩ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। এ সময় করোনা ও উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ১৯ জন।
এর আগে মঙ্গলবার ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ৮৫৫ জনের নমুনা পরীক্ষায় ৮৭৯ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছিল, যা ছিল বিভাগে এক দিনে সর্বোচ্চ সংক্রমণের রেকর্ড। মঙ্গলবার ২৪ ঘণ্টায় করোনা পজিটিভ ও উপসর্গ নিয়ে মারা যায় ১৫ জন।
বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, মারা যাওয়া ১৯ জনের মধ্যে ৯ জন করোনায় ও বাকি ১০ জন উপসর্গ নিয়ে মারা যায়। হাসপাতালের আইসোলেশনে উপসর্গ নিয়ে ১০ ও আক্রান্ত হয়ে ৩ জন মারা গেছে। বাকি ৬ জনের মধ্যে ৪ জন বরগুনায় ও ২ জন পটুয়াখালীর। এ নিয়ে বিভাগে করোনায় মোট মৃত্যুর সংখ্যা ৩৬৫।
সিলেটে করোনায় আরও ৯ জনের মৃত্যু : সিলেট বিভাগে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে আরও ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং নতুন আরও ৪৩৩ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে। গত মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টার করোনা সংক্রান্ত প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগীয় পরিচালক ডা. সুলতানা রাজিয়া স্বাক্ষরিত প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া ৯ জনসহ সিলেট বিভাগে এ পর্যন্ত করোনায় মারা গেছে ৫৪৩ জন। মৃতদের মধ্যে সিলেট জেলার ৪৩৭, সুনামগঞ্জের ৩৯, মৌলভীবাজারের ৪২ ও হবিগঞ্জের ২৪ জন রয়েছে। নতুন শনাক্ত হওয়া ৪৩৩ জনসহ এ পর্যন্ত সিলেট বিভাগে করোনা প্রমাণিত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার ৮৯১ জনে। এদের মধ্যে সিলেট জেলার ১৭ হাজার ৭২২, সুনামগঞ্জের ৩ হাজার ৪৩১, মৌলভীবাজারের ৩ হাজার ৮৫০ ও হবিগঞ্জের ৩ হাজার ৩৮৪ জন রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় করোনা আক্রান্ত ৮১ জন রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৪৪৫ জন। একই দিনে সিলেট বিভাগে করোনা থেকে সুস্থ হয়ে উঠেছে আরও ২৪১ জন। এদের নিয়ে এ পর্যন্ত করোনা থেকে মোট সুস্থ হয়েছে ২৫ হাজার ৬১৮ জন।
কুমিল্লায় সর্বোচ্চ ১৬ জনের মৃত্যু : নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে পরিস্থিতি। গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ৪৪৩ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্তের হার ৪০ দশমিক ৯ শতাংশ। ২৪ ঘণ্টায় করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে আরও ১৬ জন। গত ১০ দিনে কুমিল্লায় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ৭২ জন। আক্রান্ত হয়েছে ৩ হাজার ৯৯৬ জন। এসব তথ্য বুধবার সন্ধ্যায় দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেছেন জেলার সিভিল সার্জন মীর মোবারক হোসাইন।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার (১৩ জুলাই) বিকেল থেকে বুধবার (১৪ জুলাই) বিকেল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ল্যাবে ১ হাজার ৮৩টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪৪৩ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে।
কুমিল্লা জেলায় এখন পর্যন্ত ১৮ হাজার ৯৭৩ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ৫৬২ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ হয়েছে ৮০ জন। এ নিয়ে জেলায় সুস্থ ব্যক্তির সংখ্যা দাঁড়াল ১২ হাজার ৬৬৭।