ডিসেম্বর পর্যন্ত হাতে সময় রাখছেন শিক্ষামন্ত্রী

দেশে সচরাচর এসএসসি ও এইচএসসি এবং সমমানের পরীক্ষা হয় ফেব্রুয়ারি ও এপ্রিল মাসে। ইতিমধ্যে যা তিন থেকে পাঁচ মাস গত হয়েছে। এরই মধ্যে আবার করোনা সংক্রমণ হার অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় ঊর্ধ্বমুখী। এমন পরিস্থিতিতে বছর শেষে দেশের সবচেয়ে বড় এ দুই পাবলিক পরীক্ষা নেওয়ার আশা করছেন শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি। যদিও এর আগেও পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে পিছু হটতে হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে দীপু মনি বলেছেন, করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হলে নভেম্বরে এসএসসি ও ডিসেম্বরে এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়া হবে।

তবে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে পরীক্ষা হবে না। তখন বিকল্প কায়দায় ফলাফল মূল্যায়ন করা হবে। এজন্য সংক্ষিপ্ত সিলেবাসের ওপর শিক্ষার্থীদের ১৫ সপ্তাহের অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া হবে। যা পরীক্ষার প্রস্তুতি হিসেবে কাজ করবে। পরীক্ষা না হলে অ্যাসাইনমেন্ট থেকে পাওয়া নম্বর ও পূর্ববর্তী পরীক্ষার নম্বরের সঙ্গে (সাবজেক্ট ম্যাপিং) মিলিয়ে ফল দেওয়া হবে।

করোনা সংকটের মধ্যে ১৫ মাসের বেশি সময় বন্ধ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এ পরিস্থিতিতে চলতি বছরের এসএসসি ও এইচএসসি সমমান পরীক্ষা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। এ অনিশ্চয়তা নিরসনে গতকাল সংবাদ সম্মেলনে আসেন দীপু মনি। এ সময় তিনি জানান, কভিড পরিস্থিতি অনুকূলে এলে সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা এবং ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হতে পারে। এজন্য এসএসসির শিক্ষার্থীদের ১৮ জুলাই থেকে ও এইচএসসি শিক্ষার্থীদের ২৫ জুলাই থেকে অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া হবে।

যেভাবে হবে পরীক্ষা : নিজ বাসভবন থেকে অংশ নেওয়া সংবাদ সম্মেলনে জোরের সঙ্গে চলতি বছরের এসএসসি-এইচএসসি সমমান পরীক্ষা নেওয়ার আশা প্রকাশ করেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, এসএসসি পরীক্ষার ক্ষেত্রে বাংলা, ইংরেজি, গণিত, আইসিটি ও ধর্ম এসব আবশ্যিক বিষয়ে পরীক্ষা নেওয়া হবে না। শিক্ষার্থীদের আগে দেওয়া জেএসসি পরীক্ষার ফলের ওপর মূল্যায়ন করা এসব বিষয়ের নম্বর দেওয়া হবে। কারণ সব শিক্ষার্থী এসব বিষয়ে পড়াশোনা করে। ২৩-২৪ লাখ শিক্ষার্থী একসঙ্গে এ পরীক্ষায় অংশ নিলে করোনা সংক্রমণ বেড়ে যেতে পারে। ঐচ্ছিক বিষয়ের ওপর তৈরি করা সংক্ষিপ্ত সিলেবাস অনুযায়ী ১৮ জুলাই থেকে পরবর্তী ১২ সপ্তাহে ২৪টি অ্যাসাইনমেন্ট করতে হবে। প্রতি সপ্তাহে দুটি করে অ্যাসাইনমেন্ট করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জমা দিতে হবে। অন্যদিকে এইচএসসির জন্য সংক্ষিপ্ত সিলেবাসের ওপর ২৫ জুলাই থেকে ১৫ সপ্তাহে ৩০টি অ্যাসাইনমেন্ট করতে হবে। তাদেরও প্রতি সপ্তাহে দুটি করে পাঁচটি পত্রের ওপর ৩০টি অ্যাসাইনমেন্ট করে কলেজে জমা দিতে হবে। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ঐচ্ছিক বিষয়গুলোর সংক্ষিপ্ত আকারে পরীক্ষা নেওয়া হবে।

দীপু মনি বলেন, ‘এই অ্যাসাইনমেন্টগুলোই শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতি। এসব অ্যাসাইনমেন্ট মূল্যায়ন করবেন নিজ নিজ বিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষকরা। এরপর তারা প্রাপ্ত নম্বর শিক্ষা বোর্ডগুলোতে জমা দেবেন। এই নম্বরের স্বচ্ছতা নিয়ে যাতে প্রশ্ন না উঠতে পারে এজন্য দৈবচয়নের ভিত্তিতে শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তারা মূল্যায়ন করে দেখবেন। এই অ্যাসাইনমেন্ট থেকে মাত্র ১০-১৫ শতাংশ নম্বর শিক্ষার্থীদের মূল ফলাফলের সঙ্গে যুক্ত হবে।’

পরীক্ষার সময় ও প্রশ্নপত্রের বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘তিন ঘণ্টার পরীক্ষা দেড় ঘণ্টায় নেওয়া হবে। আর ১০০ নম্বরের পরীক্ষা হবে ৫০ নম্বরে। আগে পরীক্ষায় যেমন ১০টি প্রশ্নের মধ্যে ৮টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হতো। এখন সেই ১০টি প্রশ্নই থাকবে, কিন্তু উত্তর দিতে হবে মাত্র তিন-চারটি প্রশ্নের। সে ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের অপশন বেড়ে যাবে। তাই পরীক্ষা দিতে সুবিধা হবে। মানবণ্টনও ১০০ নম্বরের জায়গায় ৫০ নম্বর করে দেওয়া হবে। মূল্যায়নের সময় সেটাকে ১০০ নম্বরে কনভার্ট করে নেওয়া হবে।’

শিক্ষার্থীরা ভালোভাবে অ্যাসাইনমেন্টগুলো করলে সবার জন্য এ পরীক্ষা সহজ হবে উল্লেখ করে এজন্য শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সবাইকে এই অ্যাসাইনমেন্টগুলো ঠিকঠাকভাবে করতে সহযোগিতার জন্য অনুরোধ করেন দীপু মনি।

পরীক্ষা না হলে যেভাবে মূল্যায়ন : করোনা পরিস্থিতির কারণে গত বছর এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হয়নি জানিয়ে দীপু মনি বলেন, ‘আমরা পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত ছিলাম। সাবজেক্ট ম্যাপিং করে ফলাফল দেওয়া হয়। যা অটোপাস বলে সমাজের বড় একটা শ্রেণি প্রচারণা চালিয়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের ছোট করা হয়েছে। এজন্য আমরা এবারের পরীক্ষা নেওয়ার চেষ্টায় আছি। তবে নভেম্বর-ডিসেম্বর নাগাদ করোনা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হবে না।’

পরীক্ষা না হলে যে পদ্ধতিতে মূল্যায়ন হবে তা জানাতে গিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, এ ক্ষেত্রে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল জেএসসি এবং এইচএসসির ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর এসএসসির ফলের ৫০ শতাংশ, জেএসসির ২৫ শতাংশ এবং অ্যাসাইনমেন্টের ফলের ২৫ শতাংশ সমন্বয় করে ফল প্রকাশের কথা প্রস্তাবে বলা হয়েছে। অনিয়মিত শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মতোই তাদের অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে দৈবচয়ন পদ্ধতিতে তাদের মূল্যায়ন করা হবে।

ঈদের পরে ফরম পূরণ : শিক্ষামন্ত্রী জানান, ঈদুল আজহার পর এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের ফরম ছাড়ার পাশাপাশি পূরণের কার্যক্রম শুরু হবে। অনলাইন ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ফরমের টাকা নেওয়া হবে। ফলে কোনো শিক্ষার্থীকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে হবে না। এবার যেহেতু কম বিষয়ে পরীক্ষা নেওয়া হবে, সে ক্ষেত্রে ফরম পূরণেও অল্প টাকা দিতে হবে।

সংক্রমণ কিছুটা কমলেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলবে : শিক্ষা খাতের ক্ষতি বিবেচনায় সম্প্রতি জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। এ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, ‘আমরা শিক্ষার্থীদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে চাই না বলে দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখেছি। এজন্য বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে টেলিভিশনে ক্লাস সম্প্রচার, অনলাইনে ক্লাস ও অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সিলেবাস শেষ করা হচ্ছে। বিকল্প কার্যক্রমে যারা যুক্ত হতে পারেনি তাদের নিয়েও ভাবা হচ্ছে। কিন্তু যত যাইহোক, এসব শ্রেণিকক্ষের চেয়ে উত্তম হতে পারে না। এজন্য বেশকিছু পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হচ্ছে। গত দেড় বছরের মধ্যে যাদের স্কুলে ভর্তি হওয়ার কথা ছিল কিন্তু হতে পারেনি, তাদের জন্যও আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে। কীভাবে এ ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে সেই চেষ্টা করা হচ্ছে।’

এনটিআরসিএর ফলাফল প্রকাশ : সংবাদ সম্মেলন শেষে শিক্ষামন্ত্রী দেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৫৪ হাজারের বেশি শিক্ষক পদে নিয়োগের ফল প্রকাশের ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, আজ (গতকাল) সন্ধ্যা থেকে প্রার্থীরা টেলিটকের এসএমএসের মাধ্যমে ফল পাবেন। এছাড়া এনটিআরসিএর ওয়েবসাইটেও ফল প্রকাশ করা হবে। দীপু মনি বলেন, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৫৪ হাজার শূন্যপদে শিক্ষক নিয়োগ দিতে আবেদন প্রক্রিয়া শেষ করা হলেও আদালতে মামলার কারণে আবেদনকারীদের ফল প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী ৫১ হাজার ৭৩১টি পদে নিয়োগ দেওয়া হবে।

সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মাহবুব হোসেন, কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব আমিনুল ইসলাম, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সৈয়দ গোলাম ফারুক, ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান নেহাল আহমেদসহ অন্যান্য বোর্ডের চেয়ারম্যানরা উপস্থিত ছিলেন।