করোনাভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে কোরবানি ঈদের পর সরকারঘোষিত কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যে শিল্পকারখানা খোলা রাখার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)। গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলামের সঙ্গে বৈঠক করে এ দাবি জানান বিজিএমইএ ও বস্ত্র খাতের অন্যান্য সংগঠনের নেতারা।
বৈঠক শেষে বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান সাংবাদিকদের বলেন, শিল্পকারখানা খোলা রাখার দাবি জানিয়েছি। মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানিয়েছেন, আগামীকাল শনিবার তারা বিষয়টি নিয়ে বৈঠক করবেন। বৈঠকের পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানানো হবে।’
গতকালের বৈঠকে বাংলাদেশে এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ইএবি) সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী, বিকেএমইএ, বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিল অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ গার্মেন্টস এক্সেসরিজ অ্যান্ড প্যাকেজিং ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন এবং বাংলাদেশ টেরিটাওলে অ্যান্ড লিনেন ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
ফারুক হাসান বলেন, আমরা শিল্পকারখানা খোলা রাখার দাবি জানিয়েছি, কারণ শিল্পকারখানা যদি খোলা রাখা না যায়, তাহলে অর্থনীতিতে এটার একটা মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। সরকার নতুন করে লকডাউনের যে ঘোষণা দিয়েছে, এটার সার্বিক পরিস্থিতিটা আমরা তুলে ধরেছি। মন্ত্রিপরিষদ সচিবের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীকে আমরা চিঠি দিয়েছি। লকডাউনের মধ্যে যে সময়টুকু কারখানা বন্ধ থাকবে তার মধ্যে রপ্তানিমুখী শিল্পগুলো আন্তর্জাতিকভাবে কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে সে বিষয়গুলো জানিয়েছি।’
তিনি বলেন, করোনার প্রথম ধাক্কাতে অনেক অর্ডার বাতিল হয়েছিল। অর্ডারগুলো আমাদের কাছে ফিরে এসেছে। এই অর্ডারগুলো এখন আমরা রপ্তানি করছি। গত বছর আমাদের প্রায় চার বিলিয়ন ডলারের অর্ডার বাতিল হয়েছিল। কিন্তু অর্ডারগুলো আস্তে আস্তে আমরা ফিরে পেয়েছি। কারণ তখন পশ্চিমা বাজারও বন্ধ ছিল। এখন ওখানে (পশ্চিমা বাজার) মার্কেট ওপেন হয়ে গেছে। সে কারণে তারা কিন্তু আমাদের জন্য বসে থাকবে না। তারা আরেক দেশে অর্ডার দেবে, আরেক জায়গায় অর্ডার দেবে এবং সেই অর্ডারগুলো তারা দেওয়া শুরু করেছে।’
বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, আমরা অর্ডার পেয়েছি। কিন্তু লকডাউনের ঘোষণার পর থেকে আন্তর্জাতিক মিডিয়া, সোশ্যাল মিডিয়াতে তথ্য যাওয়ার কারণে ক্রেতারা আবার অর্ডার বন্ধ করে দিয়েছে। আমরা এখান থেকে বের হয়ে আসতে চাই। সে কারণে আমরা সচিবের কাছে অনুরোধ করেছি। আমরা আশা করি তারা এটি বিবেচনা করবেন।’
তিন বলেন, ‘শীতের অর্ডারগুলো জুলাইয়ের শেষ থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে শিপমেন্ট করতে হয়। শীতের আইটেম সোয়েটার, জ্যাকেট এবং নিটের মধ্যে হুডি খুব অল্প সময়ের জন্য সিজন থাকে। সে কারণে এই শিপমেন্টগুলো আমরা যদি দিতে না পারি, তাহলে ক্রেতাদের কাছ থেকে আমরা যে অর্ডারগুলো নিয়ে এসেছি তাতে ফ্যাক্টরিগুলো সম্পূর্ণভাবে দেউলিয়ার অবস্থায় চলে যাবে। এর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত অন্যান্য শিল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তৈরি পোশাকের সম্পূর্ণ সেক্টরটা সমস্যার মধ্যে পড়ে যাবে। এ কারণে আমরা জীবন-জীবিকার সমন্বয় করে সিদ্ধান্ত নিতে বলেছি।’
ফারুক হাসান বলেন, রপ্তানির মাধ্যমে যে বৈদেশিক মুদ্রা আসে, তা টাকাতে কনভার্ট হয়ে অর্থনীতিতে আসে। দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য বা যে বাই-সেল হয় তা ওই বৈদেশিক মুদ্রা আসার কারণে। আর একটা হলো ওয়েজ আর্নারের মাধ্যমে যে টাকা আসে তা দিয়েই অর্থনীতি মুভ করে। সুতরাং এই সময়ে আমরা ওনাকে অনুরোধ করেছি এটা বিবেচনা করার জন্য। আগামী পরশুদিন (আগামীকাল শনিবার) একটা মিটিং আছে, ওই মিটিংয়ে ওনারা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন।’
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আমরা কোনো টাইম ফ্রেমের কথা বলিনি। ওনারা (সরকার) যে সিদ্ধান্ত দেবে, সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমরা কাজ করব। আমরা মনে করি আমাদের কোনো অর্ডার বাতিল হবে না। সুতরাং আমরা এখন কোনো অর্ডার বাতিলের চিন্তা করছি না। বাতিল হয়ে যাবে যদি আমরা শিপমেন্ট করতে না পারি। আমরা যেন শিপমেন্ট করতে পারি, সেই সহযোগিতা আমরা চাচ্ছি।
উল্লেখ্য, নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে ২৩ জুলাই থেকে পরবর্তী ১৪ দিন সব ধরনের শিল্পকারখানা বন্ধ রাখার নির্দেশনা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। তবে বর্তমান বিধিনিষেধ চলাকালে যেভাবে শিল্পকারখানা খোলা ছিল, ঈদের পরও তেমনভাবে কাজ চালিয়ে যেতে চান রপ্তানিমুখী শিল্পোদ্যোক্তারা। তারা মনে করছেন, সরকারের সিদ্ধান্তে রপ্তানিমুখী শিল্প খাতে গভীর সংকট তৈরি হবে। তাই আগামী কঠোর লকডাউনেও রপ্তানিমুখী শিল্প-কারখানাগুলো খোলা রাখার বিষয়টি বিবেচনা করার দাবি জানিয়ে আসছেন তারা। তারা জানান, পোশাক উৎপাদকদের জন্য জুলাই-আগস্ট মাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি করা মোট পোশাকের ৪০ শতাংশই এ দুই মাসে রপ্তানি করা হয়।