দায়সারার কমিটিতেও মন্ত্রী-সচিবের পিএস

শ্রম আইনে বিশেষ বিধান নামে একটি ধারা আছে। যেখানে অগ্নিকান্ডের কারণ ও পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে সরকার কোনো যোগ্য ব্যক্তিকে দিয়ে তদন্ত করাতে পারে। এই ‘যোগ্য’ ব্যক্তিকে আইনে ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তিনি যে কোনো ব্যক্তিকে তদন্তের স্বার্থে জেরা করতে পারবেন বা তলব করতে পারবেন। তদন্তের সময় সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষ জ্ঞানসম্পন্ন কোনো ব্যক্তিকে এসেসর বা নিরীক্ষক হিসেবে কাজ করার জন্য নিয়োগ করার বিশেষ বিধানও রাখা হয়েছে।

শ্রম আইনের এই বিশেষ বিধানের কোনো প্রতিফলন নেই নারায়ণগঞ্জের হাসেম ফুড অ্যান্ড বেভারেজের কারখানায় অগ্নিকান্ডের তদন্তে গঠিত অর্ধ ডজন কমিটির। এতগুলো কমিটি না করে সরকার একটি কমিটি গঠন করেই দুর্ঘটনার আদ্যোপান্ত জানতে পারত এবং দেশবাসীকে জানাতে পারত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। শ্রম আইন বিশেষজ্ঞ জাফরুল হাসান শরীফ গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শ্রম আইনে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিকে দিয়ে তদন্ত করানোর যে বিশেষ বিধান রয়েছে তা আমলে নেয়নি কেউই। বিশেষ বিধানে এসেসর নিয়োগের বিধানও রয়েছে। এই বিশেষ বিধানের আলোকে তদন্ত কমিটি করা হলে এতগুলো কমিটির দরকার হতো না।’

শ্রম আইন, শ্রম বিধিমালা এবং বিভিন্ন সেক্টরের ন্যূনতম মজুরি বোর্ড আইনের খসড়া প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাফরুল হাসান শরীফ আরও বলেন, ‘বারবার বলা হচ্ছে জনবল সংকটের কথা। অথচ যে জনবল আছে তাদের পরিদর্শন প্রতিবেদন যদি প্রকাশ করা হয় তাহলে স্থানীয় প্রশাসন সংশ্লিষ্ট কারখানার সমস্যা কী তা জানতে পারেন। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও সমস্যাগুলো সম্পর্কে অবগত হতে পারেন এবং সমাধানের চেষ্টা করতে পারেন। সবচেয়ে বড়কথা হচ্ছে শ্রম মন্ত্রণালয়ও বুঝতে পারবে কোথায় কী সমস্যা। সাধারণ মানুষ বুঝতে পারবে। একটা ওয়েবসাইটে এ সংক্রান্ত রিপোর্ট প্রকাশ করলে জবাবদিহি তৈরি হবে। এভাবে প্রতিবেদন প্রকাশ করলে সমস্যার অনেকটাই সামাধান হয়ে যাবে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলওর সহযোগিতায় একটি সফটওয়্যারও তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু তা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না।’

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন শ্রম পরিদর্শক দেশ রূপান্তরকে জানান, ‘কারখানার তথ্য প্রকাশ করতে হলে আইনি সংশোধনী প্রয়োজন। কারণ শ্রম আইনে কিছু তথ্য প্রকাশের বিষয়ে কারখানা মালিককে সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে।’

সরকার গঠিত মূল কমিটি হচ্ছে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের গঠন করা কমিটি। গুরুত্বপূর্ণ এই কমিটির ছয় সদস্যের মধ্যে রয়েছেন শ্রম প্রতিমন্ত্রী মুন্নুজান সুফিয়ান এবং শ্রম সচিব কে এম আবদুস সালামের একান্ত সচিব বা পিএস। প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিব আবু হাসনাত মো. মঈনউদ্দিন। তিনি একজন উপসচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা। শ্রম সচিবের একান্ত সচিব মো. মামুন খন্দকার। তিনি একজন সিনিয়র সহকারী সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা। মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মো. হুমায়ুন কবীরের নেতৃত্বে গঠিত কমিটির অপর সদস্যরা হচ্ছেন সিনিয়র সহকারী সচিব অশোক কুমার বিশ্বাস, শ্রম অধিদপ্তরের পরিচালক আবু আশরাফ মাহমুদ এবং উপসচিব মোহাম্মদ আবদুল কাদের। অগ্নিকা-ের চারদিন পর শ্রম মন্ত্রণালয় এ কমিটি গঠন করে।

শ্রম মন্ত্রণালয় ও কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের কমিটির কার্যপরিধির চারটি দায়িত্ব হুবহু এক ও অভিন্ন। উভয় কমিটির কার্যপরিধি অনুযায়ী কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের পরিদর্শক যে পরিদর্শন প্রতিবেদন তৈরি করেছেন তার সুপারিশ মানা হয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখা। তারা ঝুঁকি নিরূপণ ও নিরসনের সুপারিশের পাশাপাশি দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করবে। অগ্নিদুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান এবং সুপারিশ প্রণয়ন করবে এ কমিটি। উভয় কমিটির চার নম্বর কার্যপরিধি হচ্ছে, অন্যান্য সুপারিশ (যদি থাকে)। অধিদপ্তর কমিটিকে সময় দিয়েছে ৫ কর্মদিবস আর মন্ত্রণালয় দিয়েছে ১০ কর্মদিবস। অধিদপ্তর সদস্য কো-অপ্ট করার বিধান রাখলেও মন্ত্রণালয় তা রাখেনি।

দুর্ঘটনার পরদিনই যুগ্মমহাপরিদর্শক ফরিদ আহাম্মদকে প্রধান করে তদন্ত কমিটি গঠন করে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর। এতে রয়েছেন সহকারী মহাপরিদর্শক মো. মিজানুর রহমান জনি, মো. আতিকুর রহমান শাওন, শিল্পাঞ্চল পুলিশের প্রতিনিধি, বিভাগীয় শ্রম দপ্তরের উপপরিচালক মহব্বত হোসাইন এবং উপমহাপরিদর্শক মো. কামরুল হাসান।

কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান যুগ্মমহাপরিদর্শক ফরিদ আহাম্মদ গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা আরও সাত কর্মদিবস সময় নিয়েছি। ইতিমধ্যে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। আরও দুজন সদস্যকে কো-অপ্ট করেছি। তারা হলেন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ও ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। আশা করি সময়মতো প্রতিবেদন জমা দিতে পারব।’

নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ যে তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন তাতে কমিটির কোনো কার্যপরিধি উল্লেখ নেই। শুধু বলা হয়েছে কমিটি সরেজমিন তদন্ত করে মতামতসহ ৭ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেবে। এডিসি জেনারেলের নেতৃত্বে গঠিত এ কমিটির সদস্যরা হলেন জেলা পুলিশ সুপার ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ সুপারের প্রতিনিধি, বিএসটিআইএর প্রতিনিধি, রূপগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, তিতাস গ্যাসের উপমহাপরিদর্শক, ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা এবং কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক।

জেলা কমিটি সবচেয়ে অনভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের দিয়ে গঠিত হয়েছে। এখানে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের নারায়ণগঞ্জ জেলার নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা কী ধরনের ভূমিকা রাখবেন তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দায়সারা গোছের এ কমিটিতে জুনিয়র কর্মকর্তাদের সমাবেশ ঘটানো হয়েছে। তাছাড়া কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক সৌমেন বড়ুয়ার বিরুদ্ধে যথাযথ তদারকি না করার অভিযোগ উঠেছে। সেই অভিযুক্ত কর্মকর্তাকেই করা হয়েছে জেলা প্রশাসনের কমিটির সদস্য সচিব। এখনো পর্যন্ত হাসেম ফুডসের কারখানা পরিদর্শনের সঙ্গে জড়িত কোনো কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়নি। উল্টো সৌমেন বড়ুয়াকে জেলা প্রশাসনের কমিটির সদস্য সচিব রাখায় তদন্তে প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ঘটনার দিনই ফায়ার সার্ভিস তদন্ত কমিটি করেছে। পঁাঁচ সদস্যের এই তদন্ত কমিটিকে সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিল্লুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটির সদস্যরা হলেন উপপরিচালক নূর হাসান আহমদ, সহকারী পরিচালক মানিকুজ্জামান, উপসহকারী পরিচালক তানহারুল ইসলাম ও পরিদর্শক মো. শাহ আলম।

এছাড়া নিহত ও আহত শ্রমিকদের আর্থিক সহায়তা, চিকিৎসা সংক্রান্ত বিষয় সুষ্ঠুভাবে তদারকি করার জন্য মন্ত্রণালয় একটি সমন্বয় সেল গঠন করেছে। এ সেল তদন্ত কমিটির সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যবস্থা নেবে। দেশি মিডিয়ার সঙ্গে সমন্বয় করবে এবং আন্তর্জাতিক মিডিয়ার প্রতিক্রিয়া লক্ষ করবে এ সেল। তিন সদস্যের এ সেলের দায়িত্বে রয়েছেন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মোহাম্মদ আবদুল কাদের।

গতকাল রাতে যোগাযোগ করা হলে সমন্বয় সেলের প্রধান মোহাম্মদ আবদুল কাদের বলেন, ‘আমরা মূলত আহত শ্রমিকদের চিকিৎসার বিষয়টি দেখছি। চিকিৎসার বিষয়টিই গুরুত্ব দিচ্ছি।’

সরকারের এসব কমিটির পাশাপাশি নাগরিক কমিটি নামে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার ব্যক্তিদের নিয়ে।

বিভিন্ন সংগঠনের শ্রমিক নেতারা বলেছেন, একের পর এক অগ্নিকান্ড, ভবন ধসের ঘটনায় হাজার হাজার শ্রমিকের প্রাণ ঝরে গেলেও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা হয়নি। গত ৯ বছরে তাজরীন ফ্যাশনে অগ্নিকান্ড, স্পেকট্রাম কারখানায় ধস, রানা প্লাজায় ধস, স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের কারখানায় আগুন, হামীম গ্রুপের কারখানায় আগুন, নিমতলীর কেমিক্যাল কারখানাসহ বিভিন্ন কারখানায় নিহত ও আহত শ্রমিকরা যথাযথ ক্ষতিপূরণ পায়নি। শুধুমাত্র ২০২০ সালেই কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় সহস্রাধিক শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। বেশিরভাগ ঘটনার বিচার হয়নি, যার কারণে মালিকদের বেপরোয়া শোষণের শিকার হতে হচ্ছে শ্রমিকদের। অথচ প্রতিটি অগ্নিকান্ডের পর তদন্ত কমিটি গঠন এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নানা রকম আলোচনা হলেও কিছুদিন পরই তা থেমে যায়। শ্রমিকরা অনিরাপদ পরিবেশে জীবিকার তাগিদে জীবনকে তুচ্ছ করে কাজ করতে বাধ্য হয়। কারখানা থেকে বের হওয়ার গেটে তালা বন্ধ করে রাখায় এবং অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা না থাকার কারণে এত মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। এ রকম হত্যাকান্ডের জন্য মালিকদের পাশাপাশি সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোনোভাবেই দায় এড়াতে পারে না।