করোনাভাইরাসের নতুন ভ্যারিয়েন্ট ডেল্টার সামাজিক বিস্তার বা কমিউনিটি ট্রান্সমিশন ঘটায় জুনের শুরু থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সংক্রমণ ও মৃত্যু আবার বাড়তে শুরু করেছে। এই দফায় শহরের তুলনায় গ্রামেই সংক্রমণ ও মৃত্যু বেশি হচ্ছে। দেশের একেক অঞ্চল একেক দিন গড়ছে সর্বোচ্চ শনাক্ত কিংবা মৃত্যুর রেকর্ড। তবে এর পরও মফস্বল এলাকায় স্বাস্থ্যবিধি মানার প্রবণতা নেই বললেই চলে। দেশ রূপান্তরের নিজস্ব প্রতিবেদক, প্রতিনিধি ও সংবাদদাতারা জানিয়েছেন গ্রামাঞ্চলের ঘরে ঘরে করোনার উপসর্গযুক্ত রোগী থাকলেও টেস্টে তাদের আগ্রহ নেই। অবস্থা খারাপ হলেই তারা হাসপাতালে যাচ্ছেন। এর ফলে একদিকে যেমন তাদের মৃত্যুঝুঁকি বাড়ছে, অন্যদিকে তাদের সংস্পর্শে যারা আসছেন তারাও সংক্রমিত হচ্ছেন। তাদের মাধ্যমে রোগটির সামাজিক সংক্রমণও হচ্ছে। এ অবস্থায় স্বাস্থ্যবিধি মানা না হলে করোনা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয় বলে মনে করেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকও স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে মেনে চলার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। স্বাস্থ্যবিধি পালনে জনসাধারণকে উদ্বুদ্ধ করতে ইউনিয়নের ওয়ার্ড পর্যায়ে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে করোনাভাইরাস প্রতিরোধ কমিটি গঠন করার কথাও বলেছেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রী পলক বলেন, সংক্রমণ এখন শহর থেকে গ্রামে ছড়িয়ে পড়ছে। তিনটি স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। নিয়মিত মাস্ক ব্যবহার করা, সাবান-পানি দিয়ে হাত ধোয়া এবং নিরাপদ সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা।
জনসাধারণকে এসব স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণে উদ্বুদ্ধ করতে পৌরসভা এবং ইউনিয়নের ওয়ার্ড পর্যায়ের জন্য প্রত্যেক ইউনিয়ন ও পৌরসভার ওয়ার্ড পর্যায়ে জনপ্রতিনিধি, ধর্মীয় নেতা, শিক্ষক, সাংবাদিক, সামাজিক মর্যাদাবান ব্যক্তিদের সমন্বয়ে করোনাভাইরাস প্রতিরোধ কমিটি গঠন করে দ্রুত সক্রিয় হতে হবে। এ ব্যাপারে জনপ্রতিনিধি এবং দলের নেতাকর্মীদের অগ্রণী ভূমিকা পালন করার আহ্বান জানান তিনি।
বরিশাল বিভাগে শনাক্তের নতুন রেকর্ড : বরিশালে আবারও ২৪ ঘণ্টায় করোনা শনাক্তের সংখ্যা বেড়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগে ২ হাজার ৯৯২ জনের নমুনা পরীক্ষায় ৮৯১ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে, যা শনাক্তের সংখ্যার দিক থেকে নতুন রেকর্ড। এ ছাড়া ২৪ ঘণ্টায় সোমবার সকাল পর্যন্ত বিভাগে করোনা ও উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন ১২ জন। মারা যাওয়া ১২ জনের ৩ জন করোনা পজিটিভ হয়ে এবং বাকি ৯ জন মারা যান উপসর্গ নিয়ে। নতুন ৯ মৃত্যু নিয়ে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে উপসর্গে মারা যান ৬৬৯ জন। এর আগের ২৪ ঘণ্টায় রবিবার সকাল পর্যন্ত শনাক্তের এই সংখ্যা ছিল ৬০০ এবং করোনায় ও উপসর্গ নিয়ে মারা যান ১৩ জন।
রাজশাহীতে ১৪ মৃত্যু : রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের করোনা ইউনিটে এক দিনে ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। রবিবার সকাল থেকে সোমবার সকালের মধ্যে তাদের মৃত্যু হয়। এদের মধ্যে নারী ৮ জন এবং পুরুষ ৬ জন। এ নিয়ে চলতি মাসের ১৯ দিনে রামেক হাসপাতালের করোনা ইউনিটে মোট ৩২৯ জনের মৃত্যু হলো। এর মধ্যে করোনা পজিটিভ ছিলেন ১০৬ জন আর উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন ছিলেন ২২৩ জন। রামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী জানান, মৃতদের মধ্যে করোনা আক্রান্ত হয়ে ৫ জন ও উপসর্গে ৯ জন মারা গেছেন।
খুলনা বিভাগে আরও ৫২ জনের মৃত্যু : খুলনা বিভাগে করোনায় আরও ৫২ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত রবিবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাদের মৃত্যু হয়। একই সময়ে করোনা শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ১৬৫ জনের। গতকাল সোমবার দুপুরে বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। এর আগে গত রবিবার খুলনা বিভাগে ৫১ জনের মৃত্যু হয়। স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তর সূত্র জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগের মধ্যে কুষ্টিয়া জেলায় সর্বোচ্চ ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া খুলনায় ১২ জন, যশোরে ১১ জন, মেহেরপুরে পাঁচজন, ঝিনাইদহে তিনজন, বাগেরহাট, মাগুরা ও নড়াইলে দুজন করে এবং সাতক্ষীরায় একজন মারা গেছেন।
ময়মনসিংহ মেডিকেলে ১৫ জনের মৃত্যু : আগের ২৪ ঘণ্টায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ইউনিটে আরও ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে করোনা আক্রান্তে ৫ জন এবং করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা যান ১০ জন। করোনা ইউনিটের ফোকাল পারসন ডা. মহিউদ্দিন খান মুন জানান, করোনা ডেডিকেটেড ইউনিটে নতুন ৫৫ জন ভর্তিসহ এখন পর্যন্ত ৩৮১ জন এবং আইসিইউতে ২০ জন চিকিৎসাধীন আছেন।
ফরিদপুর মেডিকেল ১৯ দিনে ১৯৭ মৃত্যু : করোনাভাইরাসের এই মহামারীতে ফরিদপুর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত ১৯ দিনে ১৯৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে করোনায় ৮৮ এবং উপসর্গ নিয়ে ১০৯ জন। ফরিদপুর বঙ্গবন্ধু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. সাইফুর রহমান বলেন, এবারের করোনার ধরনটাই ভিন্ন। আক্রান্ত ব্যক্তির দ্রুত শরীরের অবস্থার অবনতি হচ্ছে। আমরা প্রত্যেক রোগীকে সাধ্যমতো সেবা দিয়ে যাচ্ছি। আমাদের চেষ্টার ত্রুটি নেই কোথাও। হাসপাতালের এই পরিচালক আরও বলেন, ১৯ দিনের মধ্যে সব থেকে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে ১৭ জুলাই। এই দিন মারা গেছে ২১ ব্যক্তি।
বর্তমানে ৫১৬ শয্যার এই মেডিকেল কলেজের পুরোটাই করোনা রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। সোমবার বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত ৩৪৫ জন ভর্তি রোগী রয়েছেন। এর মধ্যে আইসিইউতে রয়েছেন ১৬ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় করোনা শনাক্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন ৩৯ জন।
বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) ফরিদপুর শাখার সভাপতি ডা. আ স ম জাহাঙ্গীর চৌধুরী টিটো বলেন, এই ভ্যারিয়েন্টটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। আক্রান্ত ব্যক্তি অল্প সময়েই খারাপ দিকে চলে যাচ্ছেন আর এজন্য মৃত্যু বাড়ছে। তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তির শরীরে সামান্য জ্বর, ঠা-া বা অন্য কোনো সমস্যা হলেই দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। এ ছাড়া স্বাস্থ্যবিধি মেনে সবাইকেই চলতে হবে।
ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক অতুল সরকার বলেন, করোনার এই দুর্যোগে সবাইকে স্বাস্থ্যবিধির মধ্যে আসতে হবে। শুধু আইন প্রয়োগ করে নয়, করোনাযুদ্ধে সব শ্রেণির মানুষের সহযোগিতা দরকার।
কমলগঞ্জে ছড়িয়ে পড়ছে সংক্রমণ : করোনা শনাক্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের পাঁচজন মারা গেছেন। করোনার নমুনা দিয়ে পাওয়া তথ্য ও সরেজমিন পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, উপজেলায় ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়ছে করোনা সংক্রমণ। করোনার উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা চলছে কমলগঞ্জের সর্বত্র। কমলগঞ্জের বিভিন্ন এলাকার চিকিৎসকরা জানান, উপজেলার সর্বত্রই ঘরে ঘরে সর্দি, কাশি, জ্বর ও মাথা ব্যথা রোগী রয়েছেন। এসব করোনার উপসর্গ দাবি করে চিকিৎসকরা বলেন, এদের নমুনা পরীক্ষা করলে করোনা পজিটিভ হবে।
এ বিষয়ে কমলগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মাহবুবুল আলম ভূঁইয়া বলেন, কমলগঞ্জের সর্বত্রই করোনা উপসর্গের রোগী রয়েছে। মানুষজন মানছে না কোনো স্বাস্থ্যবিধি ও সতর্কতা। এতে করে কমলগঞ্জের অবস্থা আরও ভয়াবহ হতে পারে।’
কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আশেকুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঈদের জন্য সরকার লকডাউন শিথিল করেছে। উপজেলায় করোনার সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে। তাই সবাইকেই সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে।’