গ্রামে শনাক্তের চেয়ে উপসর্গে মৃত্যু বেড়েছে

ঈদুল আজহার পরে দেশে শনাক্ত হওয়া করোনা রোগীদের মৃত্যু কিছুটা কমেছে। গতকাল শুক্রবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দেশে ১৭ দিনের মধ্যে সবচেয়ে কম মৃত্যুর খবর দিয়েছে। তবে দেশ রূপান্তরের নিজস্ব প্রতিবেদক, প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর বলছে, দেশে এই সময় করোনার উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু বেড়েছে। খুলনা, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, রংপুর বিভাগে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু বেড়েছে। অনেক জেলা শহরের চলতি জুলাই মাসেই উপসর্গে মৃত্যু করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়াদের প্রায় দ্বিগুণ। ওইসব অঞ্চলে স্বাস্থ্যবিধি মানার প্রবণতা নেই বললেই চলে। নেই টেস্ট করানোর আগ্রহও। ফলে তারা সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বাড়াচ্ছে।

বরিশালে করোনায় মৃত্যু বেড়েছে : বরিশালে গতকাল শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় করোনা আক্রান্ত ও করোনা উপসর্গ নিয়ে ২০ জন মারা গেছেন। এর আগে গত ১২ জুলাই উপসর্গসহ এক দিনে সর্বোচ্চ ২২ জনের মৃত্যু হয়েছিল। গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগটিতে নতুন করে করোনা আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছেন ১৮৩ জন। এ হিসাবে নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে শনাক্ত হার ৪০ দশমিক ৬৭ শতাংশ বলে জানিয়েছে বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভাগীয় পরিচালক ডা. বাসুদেব কুমার দাস জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগের ছয় জেলায় মোট ৪৫০ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। ১৮৩ জনের পজিটিভ পাওয়া গেছে। এছাড়া পজিটিভ শনাক্ত হয়ে মারা গেছেন সাতজন। বাকিরা মারা গেছেন উপসর্গ নিয়ে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিভাগের ছয় জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হার বরিশাল ও ভোলা জেলাতে। বরিশালে ২৩১ জনের নমুনা পরীক্ষায় ১০৯ জন শনাক্ত হন। জেলায় শনাক্ত হার ৪৭ দশমিক ১৯ শতাংশ। প্রায় একই ভোলা জেলাতেও; ৪৭ দশমিক ১২ শতাংশ।

রাজশাহী মেডিকেলে ২২ জনের মৃত্যু : রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে গত ২৪ ঘণ্টায় (বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) আরও ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃতদের মধ্যে রাজশাহীর ১১, পাবনা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের ৪ জন করে, নাটোরের ২ এবং নওগাঁর ১ জন রয়েছেন। তাদের মধ্যে ছয়জন করোনায় মারা গেছেন। করোনা পজিটিভ মৃত ব্যক্তিদের মধ্যে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের দুজন করে এবং পাবনা ও নাটোরের একজন করে। এছাড়া রাজশাহীর একজন নেগেটিভ হয়ে মারা গেছেন। বাকি ১৫ জন করোনার উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন।

আগের ২৪ ঘণ্টায় করোনা ওয়ার্ডে মারা গেছেন ২২ জন। এর মধ্যে গত ১৩ জুন থেকে এ পর্যন্ত মৃত্যু ১০ থেকে ২৫-এর মধ্যে ওঠানামা করছে। ২৯ জুন ও ১৪ জুলাই ২৫ জন করে মারা গেছেন। এ মাসে এ পর্যন্ত মারা গেলেন ৪১৫ জন। জুনে মারা গেছেন ৩৪৬ জন।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার শামীম ইয়াজদানি জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় করোনা ওয়ার্ডে নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন ৬১ জন। ছাড়পত্র নিয়ে চলে গেছেন ৬২ জন। এখনো হাসপাতালে ভর্তি ৪১২ জন। এর মধ্যে করোনা পজিটিভ ১৮৬, সন্দেহভাজন ১৭৩ ও নেগেটিভ ৫৩ জন। আগের দিনে রোগী ছিল ৪৩৪ জন। গতকাল মোট রোগীর মধ্যে শুধু রাজশাহী জেলার রোগীই ২১৬ জন। দ্বিতীয় অবস্থানে নাটোর। এই জেলার রোগী ৬২ জন। পাবনা রয়েছে তৃতীয় স্থানে, রোগীর সংখ্যা ৫২ জন। এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে হাসপাতালের রোগীদের মধ্যে রাজশাহীর পরই থাকছে নাটোর। এরপরই পাবনা। বর্তমানে হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে শয্যাসংখ্যা রয়েছে ৪৫৪।

খুলনা বিভাগে শনাক্ত ও হার বেড়েছে : খুলনা বিভাগে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময় ৩৬১ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। ১ হাজার ৯৩টি নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে শনাক্ত ৩৩ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। গত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় সুস্থ হয়েছেন ৯৮০ জন। খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদন সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, খুলনা বিভাগে বৃহস্পতিবার করোনায় ৪০ জনের মৃত্যু এবং ২১৩ জনের শনাক্ত হয়েছিল। অর্থাৎ আগের দিনের চেয়ে মৃত্যু কমেছে। তবে শনাক্তের সংখ্যা বেড়েছে। আর নমুনা পরীক্ষা বাড়ার পাশাপাশি বেড়েছে শনাক্তের হার। খুলনা জেলায় শনাক্তের সংখ্যা ২২ হাজার ছাড়িয়েছে।

বিভাগে এখন পর্যন্ত করোনা শনাক্ত হয়েছে ৮৫ হাজার ৫৩৫ জনের। শনাক্ত বিবেচনায় জেলাগুলোর মধ্যে শীর্ষে আছে খুলনা। এ জেলায় এখন পর্যন্ত ২২ হাজার ৯৫ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। এছাড়া যশোরে ১৭ হাজার ৫৯১, কুষ্টিয়ায় ১২ হাজার ৮৭১, ঝিনাইদহে ৬ হাজার ৮২৩, চুয়াডাঙ্গায় ৫ হাজার ৫৭৯, বাগেরহাটে ৫ হাজার ৪৮৩, সাতক্ষীরায় ৫ হাজার ১৯৬, নড়াইলে ৩ হাজার ৮২৬, মেহেরপুরে ৩ হাজার ৩৬২ ও মাগুরায় ২ হাজার ৭০৯ জন আছেন।

বিভাগে খুলনা জেলায় করোনায় সর্বোচ্চ ৫৪৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মৃত্যু হয়েছে কুষ্টিয়ায় ৪৬৫ জনের। এছাড়া যশোরে ২৯৯, ঝিনাইদহে ১৭৯, চুয়াডাঙ্গায় ১৪৯, মেহেরপুরে ১২০, বাগেরহাটে ১১৩, নড়াইলে ৮৩, সাতক্ষীরায় ৮২ ও মাগুরায় ৫৪ জন মারা গেছেন।

ময়মনসিংহে করোনা হাসপাতালে আরও ২০ জনের মৃত্যু : ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডেডিকেটেড করোনা ইউনিটে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে করোনায় আক্রান্ত হয়ে ৯ এবং বাকি ১১ জন করোনার উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন। এ নিয়ে জেলায় ১২৪ জনের করোনায় মৃত্যু হলো। শুক্রবার জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে।

গত বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত জেলায় ২৫৭ জনের নমুনা পরীক্ষায় নতুন করে ৭৪ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। নমুনা পরীক্ষার তুলনায় শনাক্তের হার ২৮ দশমিক ৭৯ শতাংশ। এখন পর্যন্ত জেলায় মোট করোনা শনাক্তের সংখ্যা দাঁড়াল ১২ হাজার ২১১।

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ইউনিটের ফোকাল পারসন মহিউদ্দিন খান জানান, বর্তমানে করোনা ইউনিটে নতুন ৭০ জনসহ মোট ৩৭৫ জন রোগী ভর্তি আছেন। এর মধ্যে আইসিইউতে রয়েছেন ২১ জন। এছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ৫৫ জন। এখন পর্যন্ত জেলায় মোট ৮ হাজার ৬১২ জন সুস্থ হয়েছেন।

করোনায় ফরিদপুর মেডিকেল ২২ দিনে ২৪৪ মৃত্যু : করোনাভাইরাস মহামারীতে ফরিদপুর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত ২২ দিনে ২৪৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে করোনায় ১১১ এবং উপসর্গ নিয়ে ১৩৩ জন। আর গত ২৪ ঘণ্টায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন ১৯ ব্যক্তি।

ফরিদপুর বঙ্গবন্ধু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. সাইফুর রহমান বলেন, ১ থেকে ২২ জুলাই পর্যন্ত করোনা এবং উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রাণহানি হয়েছে ২৪৪ জনের। যারা মারা গেছেন তারা ফরিদপুর, রাজবাড়ী, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, মাগুরা জেলা থেকে এই মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছিলেন।

এ চিকিৎসক আরও বলেন, দূরদূরান্ত থেকে যে রোগীগুলো আসেন তাদের শারীরিক অবস্থা একেবারে খারাপ নিয়ে আসেন। যে কারণে তাদের মধ্যেই মৃত্যুর হার বেশি। করোনার এ দুর্যোগে আমরা প্রত্যেক রোগীকে সাধ্যমতো সেবা দিয়ে যাচ্ছি। আমাদের চেষ্টার ঘাটতি নেই কোথাও।

হাসপাতালের এই পরিচালক আরও বলেন, ২২ দিনের মধ্যে সব থেকে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে ১৭ জুলাই। এই দিনে মারা গেছেন ২১ ব্যক্তি। এছাড়াও ২০ ও ২২ জুলাই ১৯ জন করে প্রাণহানি হয়েছে। বর্তমানে ৫১৬ শয্যার এ মেডিকেল কলেজে পুরোটাই করোনা রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।