ঈদুল আজহার ছুটি শেষে গতকাল শুক্রবার রাজধানীতে ফেরেন অসংখ্য মানুষ। তারা পা ফেলেই অন্য নগরী দেখতে পান। করোনা মোকাবিলায় জারি করা সরকারি কঠোর বিধিনিষেধে ভোর ৬টা থেকে বন্ধ সব ধরনের পরিবহন। এরই সুযোগ নিয়েছেন নগরীর রিকশাচালকরা। স্বাভাবিক সময়ে যে গন্তব্যে সর্বোচ্চ ৫০ টাকা ভাড়া, তার জন্য হাজার টাকাও হাঁকা হয়। হেঁটে যাওয়া সম্ভব নয় জেনে পরিবারের নারী-শিশুদের নিয়ে অসহায় অনেকে বাধ্য হয়ে গুনেছেন চড়া ভাড়া।
গতকাল রাজধানীর গাবতলী, মহাখালী, গুলিস্তান, সদরঘাট ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। স্ত্রী-সন্তানসহ চার সদস্য নিয়ে তাঁতিবাজার মোড়ে বসে আছেন বেসরকারি চাকরিজীবী মনির হোসেন। বরিশাল থেকে লঞ্চে করে ভোর ৬টায় নেমেছেন সদরঘাট। এরপর আর রিকশা পাননি। যা দুই-একটা পেয়েছেন চালক ভাড়া চেয়েছেন অনেক বেশি। ফলে গন্তব্য বনশ্রীর উদ্দেশে হেঁটে তাঁতিবাজারে এসে সবাই ক্লান্ত। মনির হোসেন বলেন, ‘তাঁতিবাজার থেকে বনশ্রী সর্বোচ্চ ৮ কিলোমিটার। আমরা হেঁটে যেতে পারতাম। কিন্তু ছোট ছেলেমেয়ে আর পারছে না। ৮০০ টাকা চেয়েছেন রিকশাওয়ালা, বলেকয়ে ৬০০ টাকায় রাজি করিয়েছি।’
তার মতোই সদরঘাট থেকে রামপুরা যেতে ফরিদ উদ্দিনের কাছে ভাড়া দেড় হাজার টাকা চান রিকশাচালক। এক হাজার টাকায় রাজি করিয়ে তিন সদস্য নিয়ে রওনা হন তিনি। অথচ স্বাভাবিক সময়ে সদরঘাট থেকে রামপুরা যেতে রিকশায় ৮০-১০০ টাকা লাগে।
সদরঘাটের শ্রমিক আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘এরশাদের কার্ফু (কারফিউ) এইরম ছিল না। তহন দোকান খোলা আছিল, আওন-যাওনের গাড়ি এইবায় বন্ধ আছিল না। ভাবন (ভাবা) যায় এক হাজার টাকায় যাইতো হইব রিকশায়? ভোর তে (থেকে) দেখতেসি হাজার টাকার নিচে কোনো রিকশার ভাড়াই নাই।’
একই চিত্র রাজধানীর গাবতলী বাস টার্মিনালে। পাবনা থেকে স্ত্রীকে নিয়ে আমিনবাজার পর্যন্ত আসতে জহিরের খরচ হয়েছে ৫ হাজার টাকা। তিনিও উপায় না পেয়ে ৪০০ টাকা রিকশা ভাড়া দিয়ে গন্তব্য যাত্রাবাড়ীর উদ্দেশে রওনা হন।
দেশ রূপান্তরকে জহির বলেন, ‘লকডাউনের সুযোগ নিয়ে আজ (গতকাল) রিকশাচালকরা যা করেছেন, তা রীতিমতো ক্রাইম। আমার স্ত্রী অসুস্থ, তাই বাধ্য হয়ে এ ক্রাইম মেনে নিয়েছি।’
বেসরকারি আইটি ফার্মে খণ্ডকালীন কাজ করা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী হুমায়ূন কবীর বলেন, ‘লকডাউনে রিকশা চালুর জন্য আমরা সব সময় সরব থেকেছি। রিকশাচালক ও তাদের পরিবারের কথা চিন্তা করেই এমনটি করেছি। অথচ তারা আজ পুরো নগরীতে ভাড়ার নামে নৈরাজ্য করেছে।’
বেশি ভাড়া আদায়ের বিষয়ে গাবতলী বাস টার্মিনাল এলাকার রিকশাচালক সুলতান বলেন, ‘সারা বছর তো আর এই ইনকাম অয় (হয়) না। ঘুরেফিরি এই একই দাঁড়ায়। যহন না খাইয়ে থাকি, তখন কেউ দেয় না। আমরা তো আর ইঞ্জিন বাস না। গতর খাটাই তাই ভাড়া একটু বেশি নিতাসি।’
গতকাল রিকশাচালকদের বিরুদ্ধে বেশি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে ঢাকামুখী প্রায় প্রত্যেক সংযোগ সড়ক, টার্মিনাল ও সদরঘাটে। ভাড়া আদায়ের পরিমাণ ১০ থেকে ২০ গুণও হয়েছে জায়গাভেদে।