করোনা সংক্রমণের বিস্তার রোধে দেশজুড়ে কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যেই বাংলাদেশ সফরে আসছে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট দল। তাদের সফর ঘিরে কঠোর নিরাপত্তাবলয় গড়ে তোলা হচ্ছে। ২৯ জুলাই বাংলাদেশ সফরে আসার কথা রয়েছে অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দলের। আর তাদের জন্য করা হচ্ছে ‘বিশেষ ইমিগ্রেশন’-এর ব্যবস্থা। এ ক্ষেত্রে বিমান থেকে নেমে দলের প্রত্যেক সদস্য সরাসরি চলে যাবেন হোটেলে। হোটেলেই তাদের ইমিগ্রেশনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্নের চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। ফলে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন কাউন্টারে যেতে হবে না অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দলের সদস্যদের।
জানা গেছে, অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দলের সদস্যদের জন্য বিশেষ ইমিগ্রেশনের ব্যবস্থা করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড (বিসিবি)। তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ সদর দপ্তর ইতিমধ্যে প্রয়োজনীয় সব উদ্যোগ নিয়েছে বলে পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন।
এদিকে অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দলকে কঠোর নিরাপত্তাবলয়ে রাখতে কাজ করছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। এ নিয়ে ডিএমপির কমিশনারের নেতৃত্বে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কয়েক দফা বৈঠক করেছেন। অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দলের প্রত্যেক সদস্যকে যথাযথ নিরাপত্তা দেওয়ার পাশাপাশি স্টেডিয়াম এলাকায় থাকবে র্যাব ও পুলিশের বিশেষ দল। স্টেডিয়াম দর্শকবিহীন থাকলেও নিরাপত্তার ঘাটতি না রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে পুলিশকে। খেলোয়াড়রা যে হোটেলে থাকবেন সেখানেও থাকবে কঠোর নিরাপত্তাবলয়। খেলোয়াড়দের চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকবে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে। ইতিমধ্যে ওই হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছেন বিসিবির কর্ণধাররা।
অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দলের সদস্যদের নিরাপত্তার বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমপির কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট টিমের প্রতিটি সদস্যকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দেওয়া হবে। স্টেডিয়াম এলাকায়ও কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকবে। অস্ট্রেলিয়া টিমের নিরাপত্তার বিষয়ে বিসিবির কর্মকর্তারা আমাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। অস্ট্রেলিয়া টিমের খেলোয়াড়রা যেদিন বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখবেন, সেদিন থেকেই তাদের নিরাপত্তা দেওয়া হবে। ইতিমধ্যে নিরাপত্তার ছক আঁকা হয়েছে এবং নিরাপত্তার বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দল আগে থেকে জানিয়ে দিয়েছে তাদের জন্য বিশেষ ইমিগ্রেশনের ব্যবস্থা করতে হবে। করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতির মধ্যে তারা বাড়তি ঝামেলায় যেতে চাচ্ছেন না। তাদের শর্তের আলোকে সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন কর্র্তৃপক্ষের (বেবিচক) কাছে একটি আবেদন করেছে বিসিবি। ওই আবেদনে তারা অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দলের জন্য বিশেষ ইমিগ্রেশনের ব্যবস্থা করার অনুরোধ করেন। তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে নিরাপত্তার বিষয়ে বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
অজি টিমের সদস্যরা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সরাসরি হোটেলে চলে যাবেন জানিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা চাচ্ছি একটি নিদিষ্ট সার্ভারের মাধ্যমে বিমানবন্দরের ভিআইপি রুমে প্রতিটি খেলোয়াড়ের ইমিগ্রেশন করাতে। যদি তা সম্ভব না হয় তাহলে হোটেলে গিয়ে তাদের ইমিগ্রেশন করা হবে। এ জন্য আমরা আলাদা একটি ইমিগ্রেশন করতে যাচ্ছি। তবে শুধু করোনা পরিস্থিতির জন্যই এ বিষয়ে ছাড় দেওয়া হচ্ছে। পরিস্থিতি ভালো থাকলে এই উদ্যোগ নেওয়া হতো না।’
সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, অস্ট্রেলিয়া দলের বাংলাদেশ সফর নিয়ে কিছুটা টানাপড়েন চলে আসছিল বেশ কিছুদিন ধরেই; বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট বোর্ড বেশ কিছু শর্ত জুড়ে দিয়েছে। এর মধ্যে তিনটি শর্ত মেনে নিয়েছে বিসিবি। ২৯ জুলাই অজি ক্রিকেট দল বাংলাদেশ সফরে আসছে। সফরে তারা পাঁচ ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজ খেলবে। সব কটি ম্যাচই অনুষ্ঠিত হবে মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামে। সূচি অনুযায়ী আগামী ৩ আগস্ট মাঠে গড়াবে প্রথম ম্যাচ। ৪, ৬, ৭ ও ৯ আগস্ট সিরিজের বাকি চারটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। ১০ আগস্ট অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট টিম নিজ দেশে চলে যাবে। করোনা সংক্রমণ রোধে অজিদের বিমানবন্দর থেকেই ‘জৈব সুরক্ষাবলয়’ ব্যবস্থায় রাখবে বিসিবি। এ ব্যবস্থা যথাযথভাবে অনুসরণ করতে বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন চিঠি দিয়েছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে। চিঠিতে বাংলাদেশে আগমন ও বহির্গমনের সময় অস্ট্রেলিয়া দলের খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের বহনকারী বাসের জন্য হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের হার্ডস্ট্যান্ডে প্রবেশের অনুমতি চেয়েছেন। গত ১৪ জুন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠিতে বায়ো সেফটি বাবল বা জৈব সুরক্ষাবলয়ে থেকেই বিশেষ ব্যবস্থাপনায় অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটারদের ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ চেয়েছেন বিসিবি সভাপতি। চিঠিতে বলা হয়, কভিড-১৯ পরিস্থিতির কারণে অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দল তাদের ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফর শেষ করে সেখান থেকে জৈব সুরক্ষাবলয়ের মধ্য থেকেই চার্টার্ড বিমানে সরাসরি বাংলাদেশে আসবে। ফলে তাদের বাংলাদেশে আগমন ও বহির্গমনের সময় শাহজালাল বিমানবন্দরের হার্ডস্ট্যান্ড থেকে বিশেষ ব্যবস্থাপনায় ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করার উদ্যোগ নিলে ভালো হয়; বিশেষ ইমিগ্রেশনের ব্যবস্থা ইতিমধ্যে অস্ট্রেলিয়া জাতীয় ক্রিকেট দলের ইংল্যান্ড ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরকালে নিশ্চিত করা হয়েছে। অনুরূপ ব্যবস্থাপনা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে চেয়েছেন বিসিবি সভাপতি।
বেবিচক ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দুই কর্মকর্তা গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, করোনাকালে সবার আগে ক্রিকেট সিরিজ আয়োজন করে ইংল্যান্ড। বায়ো সেফটি বাবল তৈরি করে মাঠের ক্রিকেট চালু রাখে তারা। এ পদ্ধতিকে কাজে লাগিয়েই আয়োজিত হয় ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল)। করোনা সংক্রমণের এ সংকটকালে ক্রিকেটসহ বিশে^র অন্যসব ক্রীড়া সংস্থা বিভিন্ন ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে ধীরে ধীরে খেলায় ফিরছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) নির্দেশনায় ক্রিকেট খেলুড়ে দেশগুলো নিজস্ব পরিকল্পনার মাধ্যমে পেশাদার ক্রিকেটে ফিরছে। এরই ধারাবাহিকতায় বিসিবি জৈব সুরক্ষিত পরিবেশের মাধ্যমে খেলায় অংশ নেওয়া ক্রিকেটারদের ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করছে। বিসিবির মেডিকেল টিমের তৈরি করা সুরক্ষাবলয়ের আওতায় থাকবে খেলোয়াড়দের হোটেল, রেস্তোরাঁ, জিম, সুইমিং পুল, যানবাহন, মেডিকেল ট্রিটমেন্ট রুমসহ সবই। হোটেলের কর্মচারী ও মাঠকর্মী যাদেরই খেলোয়াড়দের কাছাকাছি আসার সম্ভাবনা আছে, তাদেরও করোনা পরীক্ষা করানো হবে। পরীক্ষায় নেগেটিভ হলে তারাও বায়ো-সেফটি বাবলের মধ্যে চলে আসবেন। সে ক্ষেত্রে ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ডের (ইসিবি) কার্যক্রমই অনুসরণ করবে বিসিবি।
ডিএমপির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়া ও বাংলাদেশে খেলাটি হবে দর্শকবিহীন। তারপরও আমাদের নিরাপত্তার কোনো ঘাটতি থাকবে না। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি বৈঠক করা হয়েছে। মাঠের ভেতর ও বাইরে কঠোর নিরাপত্তাবলয় গড়ে তোলা হবে। অস্ট্রেলিয়া টিম হোটেল সোনারগাঁও বা রূপসী বাংলায় অবস্থান করবে। আজ-কালের মধ্যেই একটি হোটেল চূড়ান্ত করবে বিসিবি। তা ছাড়া অজিদের কোনো সদস্য অসুস্থ হলে এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হবে। প্রয়োজনে আইসিউর ব্যবস্থা থাকবে সেখানে।’
অস্ট্রেলিয়া দলের খেলোয়াড়রা যে হোটেলে থাকবেন, তার আশপাশে বাইরের কেউ আসা-যাওয়া করতে পারবে না জানিয়ে ডিএমপির এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘এমনকি নির্দিষ্ট স্টাফদেরও করোনা পরীক্ষার পরই শুধু খেলোয়াড়দের কাছে যেতে দেওয়া হবে। রেস্টুরেন্টেও থাকবে একই ব্যবস্থা।’