ট্যানারি পল্লীতে শ্রমিক সংকট চামড়া নষ্টের আশঙ্কা

পবিত্র ঈদুল আজহা শেষ হওয়ার দুই দিন পরেও গতকাল শুক্রবার দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে সাভারের ট্যানারিপল্লীতে এসেছে কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়া। করোনা ও বন্যার কারণে চামড়া সরবরাহ কিছুটা কম হলেও সংকট হবে না বলে মনে করছেন ট্যানারি মালিকরা। তবে কেনা চামড়া নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে ট্যানারিপল্লী থেকে শুরু করে আড়ত সব জয়গায়েই। মূলত লকডাউনের কারণে শ্রমিক সংকট ও মেঘলা আবহাওয়ার কারণে চামড়া পচে যাওয়ার ঝুঁকি দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মৌসুমি ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, এবারও লোকসানের মুখে পড়েছেন তারা। সরকার নির্ধারিত দামে আড়তদাররা চামড়া কিনছেন না।

শুক্রবার সকালে সাভার চামড়া শিল্পনগরী ঘুরে দেখা যায় প্রায় প্রতিটি ট্যানারির মূল ফটক বন্ধ রয়েছে। হাতেগোনা মাত্র কয়েকটি ট্যানারির মূল ফটক খোলা থাকলেও সেখানে গিয়ে লক্ষ করা যায়নি ট্যানারি শ্রমিকদের কর্মব্যস্ততা। এরই মাঝে দেখা যায় কালু লেদার কারখানায় ষাটোর্ধ্ব মো. মফিজ মিয়া বসে বসে চামড়ায় লবণ লাগাচ্ছেন। শ্রমিক সংকটের বিষয়ে তিনি বলেন, করোনা এবং লকডাউনের কারণে কারিগর পাওয়া যাচ্ছে না। ঢাকা থেকে কারিগর না আসায় অনেক চামড়ায় লবণ লাগানো সম্ভব হয়নি। এ কারণে সাত হাজার পিস গরুর মাথার চামড়া পচে যাওয়ায় ফেলে দিতে হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আমি হাজারীবাগ থেকে ৩০ টাকার ভাড়া ১৫০ টাকা দিয়ে সাভারে এসেছি। এখানে যারা কাজ করে সবাই স্বল্প আয়ের লোক, তাই অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে অনেকে কাজে আসেনি। তাই লোকবলের অভাবে প্রায় প্রতিটি ট্যানারির বিপুলসংখ্যক চামড়া নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

মেসার্স গোল্ডেন লেদার ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবসায়িক অংশীদার জাফর চৌধুরী বলেন, গত দুদিন ধরে বৃষ্টির কারণে অনেক চামড়া নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বৃষ্টির পানি চামড়ার জন্য ক্ষতিকর, এটা এসিডের মতো কাজ করে। তাই সরকারের উচিত রক্তমাখা চামড়া কেনাবেচা বন্ধ করে দেওয়া।

তিনি আরও বলেন, ঈদের দিনের চামড়া লবণ না মাখিয়ে পড়ের দিন সকালে ট্যানারিতে বিক্রি করতে নিয়ে আসেন একজন মৌসুমি ব্যবসায়ী। সেই চামড়া নামাতে নামাতে বিকেলে দেখি সবগুলোই নষ্ট হয়ে গেছে। ২৫০ টাকা করে ৫০০ পিস চামড়া কিনেছি। এর মধ্যে ৫০০ টাকার কেমিক্যাল ব্যবহার করা হলেও এর গুণগত মান পাওয়া যাবে না।

অন্যদিকে হঠাৎ করেই বৃহস্পতিবার সাভারের বিসিক চামড়া শিল্পনগরী পরিদর্শন করেছেন শিল্প সচিব জাকিয়া সুলতানা। এ সময় তিনি বিসিক চামড়া শিল্পনগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি) পরিদর্শন করেন। পরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, হঠাৎ চামড়া শিল্পনগরী পরিদর্শনের উদ্দেশ্য হলো মৌসুমি ব্যবসায়ীরা সঠিক মূল্য পাচ্ছে কিনা, চামড়ায় সঠিকভাবে লবণ যুক্ত করা হচ্ছে কিনা এবং লবণের কোনো সিন্ডিকেট তৈরি হচ্ছে কিনা এ বিষয়গুলো তদারকি করা।

শিল্প সচিব বলেন, চামড়া একটি পচনশীল পণ্য, এটাকে সময়মতো পর্যাপ্ত পরিমাণ লবণ যুক্ত করে যথাযথ প্রক্রিয়ায় সংরক্ষণ করতে হবে। সরকারের লক্ষ্য পরিবেশসম্মত চামড়া সংরক্ষণ করা। তাই জেলা-উপজেলা পর্যায়ে প্রশাসনের সহায়তায় অস্থায়ীভাবে কোরবানির চামড়া সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, বাণিজ্য এবং শিল্প মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে পবিত্র ঈদুল আজহায় কোরবানিকৃত পশুর চামড়া সংরক্ষণ ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকল্পে মনিটরিং টিম গঠন করা হয়েছে। এই টিমগুলো কেন্দ্রীয়ভাবে ও মাঠপর্যায়ে কাজ করছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের দিকনির্দেশনায় চামড়ার সঠিক দাম ও সংরক্ষণের বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে মনিটরিং করা হচ্ছে। কোরবানিকৃত পশুর চামড়া নিয়ে যেন কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা অব্যবস্থাপনা তৈরি না হয় সেটিও মনিটরিং টিমগুলো নিশ্চিত করছে।

এদিকে গতকাল ঢাকার লালবাগের পোস্তা এলাকায় চামড়া বেচাকেনা হতে দেখা যায়। সেখানে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা দাবি করেন, সরকারের বেঁধে দেওয়া নির্ধারিত দামে তারা চামড়া বিক্রি করতে পারছেন না। আড়তদাররা তাদের সঠিক দাম দিচ্ছেন না। তবে আড়তদারদের দাবি, এ বছর চামড়ার দাম তেমন একটা কমেনি।

মৌসুমি ব্যবসায়ীরা বলেন, প্রতিটি গরুর চামড়া তারা ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা দরে কিনেছেন। এর সঙ্গে তারা লবণ দিয়ে চামড়া সংরক্ষণ করছেন তাতে খরচ হচ্ছে আরও ৩০০ টাকা। এতে করে একটি গরুর চামড়ার দাম পড়ছে এক হাজার টাকা। কিন্তু আড়তদারদের কাছে গিয়ে একেকটি চামড়া আরও কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।

সরকার ঈদের আগে চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দেয়। গেল বছরগুলোতে চামড়ার ন্যায্য দাম না পাওয়ার অভিযোগ থেকে সরকার এবার চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৪০ থেকে ৪৫ টাকা নির্ধারণ করে ঢাকায়। ঢাকার বাইরে এ দাম ৩৩ থেকে ৩৭ টাকা নির্ধারিত হয়। এর থেকেও অনেক কম দামে চামড়া বিক্রি হয় বলে অভিযোগ করেন অনেকে। 

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, গত বছরের ন্যায় এবারও ৮০ লাখ গবাদি পশুর চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। চামড়া পরিবহন লকডাউনের আওতামুক্ত থাকায় ট্যানারিগুলোতে চামড়ার সঙকট হবে না বলে তিনি জানান।

তবে বিটিএ চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদ বলেন, করোনার কারণে অনেক মানুষ কোরবানি না দেওয়ায় চামড়ার সংগ্রহ কিছুটা কম হতে পরে। পরিস্থিতি উন্নতি না হলে চামড়া নিয়ে কিছুটা সংকটও দেখা দেবে বলে আশঙ্কা করেন তিনি।

লক্ষ্যমাত্রার এক-তৃতীয়াংশ চামড়া এসেছে চট্টগ্রামের আড়তে : চট্টগ্রামে লক্ষ্যমাত্রার এক-তৃতীয়াংশ চামড়া পৌঁছেছে আড়তগুলোতে। তবে আড়তদাররা বলছেন, নগরীর বাইরে উপজেলা পর্যায়ে বিভিন্ন এলাকায় বিপুল পরিমাণ চামড়া লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। সপ্তাহখানেক পর এসব চামড়া আড়তে এসে পৌঁছলে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে বলে আশা করছেন তারা। এদিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে কোরবানির আগে চামড়ার মূল্য নির্ধারণ করে দেওয়া হলেও আড়তদারদের কাছে কাঁচা চামড়া বিক্রি করে ন্যায্যমূল্য পাননি বলে অভিযোগ করেছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা।

চট্টগ্রামের একাধিক আড়তদারের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, চলতি মৌসুমে সাড়ে তিন লাখ চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল চট্টগ্রামের আড়তদারদের। সেভাবেই যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন ছিল। কিন্তু ঈদের দিন আড়তগুলোতে কাঁচা চামড়া জমা হয়েছে এক লাখ থেকে সোয়া লাখের মতো। তবে ঈদের দিন আড়তে পৌঁছাতে না পারায় নগরীর বাইরে বিভিন্ন জায়গায় মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কেনা প্রচুর চামড়া স্থানীয়ভাবে লবণজাত করে রাখা হয়েছে। সপ্তাহ খানেক পরে এসব চামড়া আড়তে আসতে শুরু করবে।

বৃহত্তর চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার সমবায় সমিতির সভাপতি মুসলিম উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, এবারের ঈদে সাড়ে তিন লাখ পিস চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও এখন পর্যন্ত মোট ১ লাখ ১৫ হাজার পিস চামড়া আড়তে এসেছে।

তিনি জানান, গত বছর মোট ৩ লাখ ৫৬ হাজার চামড়া সংগ্রহ করেছিল আড়তদাররা। তবে এবার করোনা ও লকডাউন পরিস্থিতির কারণে কিছুটা কম হবে বলে ধারণা তাদের।

ঈদের দিন নগরীর মুরাদপুর এলাকায় কথা হয় মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ী পতেঙ্গার আবুল হাশেমের সঙ্গে। তিনি জানান, স্থানীয়ভাবে গড়ে ৩৫০ টাকায় সংগ্রহ করে ১৫০টি চামড়া নিয়ে তিনি আতুরার ডিপোতে আড়তদারদের কাছে বিক্রি করেছেন। এর মধ্যে ১০০টি চামড়ার দাম দেওয়া হয়েছে গড়ে ৪০০ টাকা করে। আর ৫০টির দাম দেওয়া হয়েছে গড়ে ২৫০ টাকা করে। অনেক দেনদরবার করার পরও এর চেয়ে বেশি দাম মিলেনি আড়তদারদের কাছ থেকে। তার মতো অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ী চামড়া কিনে লোকসানে পড়েছেন।

তবে কম দামে চামড়া কেনার বিষয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন আড়তদার সমবায় সমিতির সভাপতি মুসলিম উদ্দিন। তিনি জানান, সরকার চামড়ার যে দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে সেটা লবণজাত চামড়া। আমরা কিনছি কাঁচা চামড়া। প্রতিটি চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য লবণ, শ্রমিক মজুরি ও গুদাম ভাড়া মিলে ১৪ থেকে ১৫ টাকা খরচ পড়ে। তাই প্রতি বর্গফুট চামড়া ১৮ থেকে ২২ টাকার বেশি দামে কিনতে পারি না। না বুঝে চামড়া কিনে এ ধরনের ব্যবসায়ীরা লোকসানের শিকার হতে পারেন।

এদিকে চামড়া সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের পর তা বিক্রির জন্য ঢাকার ট্যানারি মালিকদের দিকে তাকিয়ে আছেন চট্টগ্রামের আড়তদাররা। একসময় চট্টগ্রামে ২২টি ট্যানারি থাকলেও একে একে সব বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এখন ‘রিফ লেদার’ নামে একটি মাত্র ট্যানারি রয়েছে চট্টগ্রামে। তাদের স্থানীয়ভাবে ৫০ হাজার থেকে ৬০ হাজার পিস চামড়া কেনার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানালেন রিফ লেদার লিমিটেডের পরিচালক মোখলেসুর রহমান। দেশ রূপান্তরের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, আমরা সারা বছরই নিয়মিতভাবে চামড়া কিনে থাকি। স্বাভাবিকভাবেই কোরবানির মৌসুমে একসঙ্গে বেশি চামড়া পাওয়া যায়। স্থানীয় আড়ত ছাড়াও বগুড়া, সিরাজগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থান থেকে ওই ট্যানারিতে চামড়া আসে বলে জানান তিনি। তার মতে, একসঙ্গে সব চামড়া আড়তে না এনে স্থানীয়ভাবে লবণ দিয়ে রাখলে চামড়া নষ্ট হওয়ার আশংকা থাকে না। সেই সঙ্গে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া থেকে রক্ষা পেতে পারেন।