কবি মুহম্মদ নূরুল হুদার জন্ম ৩০ সেপ্টেম্বর ১৯৪৯ কক্সবাজারের পোকখালী গ্রামে। লেখাপড়া করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে। মূলত কবি হলেও কথাসাহিত্য, মননশীল রচনা, অনুবাদ, লোকসাহিত্য, মেধাস্বত্ব ইত্যাদি বিচিত্র বিষয়েও লিখেছেন। প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা শতাধিক। তার কবিতা বিশ্বের নানা ভাষায় অনূদিত হয়েছে।
স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন বেশ কিছু পুরস্কার ও সম্মাননা। তার মধ্যে আলাওল পুরস্কার, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, আহসান হাবীব কবিতা পুরস্কার, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট সম্মাননা এবং রাষ্ট্রীয় একুশে পদক উল্লেখযোগ্য। সম্প্রতি বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা ও অন্যান্য প্রসঙ্গে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সম্পাদকীয় বিভাগের এহ্সান মাহমুদ
দেশ রূপান্তর : বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ায় শুরুতেই আপনাকে অভিনন্দন জানাই। যদিও এর আগে আপনি এই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থেকে পরিচালক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেছিলেন।
মুহম্মদ নূরুল হুদা : ধন্যবাদ আপনাকে। প্রথমেই আমি বলব যে, ঘরের ছেলে ঘরে ফিরেছি। ঘরে ফেরার সুযোগ করে দিয়েছে সদাশয় সরকার। সারা জীবন তো বাংলা একাডেমিতেই কাটিয়ে দিলাম। ১৯৭৩ সালে আমি প্রথম বাংলা একাডেমিতে যোগদান করেছিলাম। মাঝে বাংলা একাডেমিতে থাকাকালীনই নজরুল ইনস্টিটিউটের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছিলাম। সেটিও এখনকার সরকারের আরেক মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর। আমি যখন বাংলা একাডেমিতে যোগদান করি সেই সময়ে মহাপরিচালক ছিলেন শ্রদ্ধেয় মযহারুল ইসলাম। তিনি আমার সরাসরি শিক্ষক ছিলেন না বটে, তবে তাকে শিক্ষকের মতোই জানতাম। সেই সময়ে আরও বেশ কিছু কবি-সাহিত্যিক, গবেষক বাংলা একাডেমিতে যোগ দিয়েছিলেন। শ্রদ্ধেয় শামসুজ্জামান খান, কবি রফিক আজাদ, কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন বাংলা একাডেমিতে যোগ দিয়েছিলেন। তাদের সঙ্গে আমিও যোগ দিয়েছিলাম। কাশীনাথ রায়ও যোগ দিয়েছিলেন। আমাকে অনুবাদ বিভাগে কাজ দেওয়া হয়েছিল। ২০০৬-এ আমি বাংলা একাডেমি থেকে অবসর গ্রহণ করি। তাই দেখা যাচ্ছে, কর্মজীবনের পুরোটা সময়ে আমি বাংলা একাডেমিতেই কাজ করেছি। অবসরের পরে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছি। আবার এখন এই সময়ে বাংলা একাডেমিতে নতুনভাবে ফিরে আসার সুযোগ হয়েছে। তাই বাংলা একাডেমি বিষয়ে আমার জানাশোনা নতুন নয়। বেশ পুরনো ও অন্তরের সম্পর্ক আমাদের। এখানে দায়িত্ব পালন করাটা আমার জন্য গর্বের ও আনন্দের। আমি বাংলা একাডেমির যে বিভাগ দিয়ে কাজ শুরু করেছিলাম, সেই অনুবাদ বিভাগে এখনো কাজ করার অনেক সুযোগ আছে। অনুবাদ বিভাগকে একটি পরিপূর্ণ বিভাগ হিসেবে বিশ্বের অন্যতম একটি অনুবাদ বিভাগে পরিণত করতে চাই। এটা করা গেলে আমাদের জন্য একটি বড় কাজ হবে বলে বিশ্বাস করি।
দেশ রূপান্তর : করোনা মহামারীতে সবকিছুই কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। উৎসব অনুষ্ঠান আয়োজনের ক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে এসেছে এমন একটা সময়ে আপনি বাংলা একাডেমির দায়িত্ব পেলেন। বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?
মুহম্মদ নূরুল হুদা : করোনার প্রভাবে সত্যিকার অর্থেই সবকিছু স্থবির হয়ে পড়েছে। এই করোনাতেই আমরা অনেক প্রিয়জনকে হারিয়েছি। বাংলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক ও সভাপতি শ্রদ্ধেয় শামসুজ্জামান খানকে হারালাম করোনার এই সময়ে। আবার আমার বন্ধু ও একাডেমিতে আমার আগে মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা হাবীবুল্লাহ সিরাজীকেও করোনার দুঃসময়ে হারিয়েছি। তাই অনেকটা প্রতিকূল অবস্থাতেই আমাকে মহাপরিচালকের দায়িত্বভার গ্রহণ করতে হয়েছে। করোনার প্রভাবে ঠিকমতো এখনো অফিস শুরু করতে পারছি না। এর মধ্যেই দুয়েকটি সভা করেছি। নতুন পরিস্থিতিতে কাজ করার জন্য তৈরি হচ্ছি।
দেশ রূপান্তর : বাংলা একাডেমিকে অ্যাকাডেমিক দায়িত্বও পালন করতে হয়, আবার একই সঙ্গে সৃষ্টিশীল দায়িত্বও পালন করতে হয়। এখানে ‘তরুণ লেখক প্রকল্প’ ছিল, এখন আর নেই। দায়িত্ব পেয়ে এখন নতুন কী ভাবছেন?
মুহম্মদ নূরুল হুদা : বাংলা একাডেমি সৃজনশীল কাজও করে, মননশীল কর্মও করে। নির্ধারিতভাবে, নির্দিষ্টভাবে বলেছেন ‘তরুণ লেখক প্রকল্পের’ কথা। এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা কিছু নতুন তরুণদের পেয়েছি যারা নতুনভাবে লেখেন নতুনভাবে কবিতা লেখেন, গদ্য লেখেন এবং মননশীল কাজ করেন। কেউ কেউ প্রকাশনা সংস্থায় চাকরি করছে, কেউ নিজেই প্রকাশক হিসেবে ক্যারিয়ার গড়েছে। তরুণ লেখক প্রকল্পটি নিয়ে আমরা ভাবছি, এটা আবার নতুভাবে কীভাবে চালু করা যায় তা নিয়ে কাজ করতে হবে। এছাড়া আমরা একটি পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেছি। যার মাধ্যমে পৃথিবীর নানান ভাষার সাহিত্য বাংলা ভাষায় অনুবাদ করা হবে। আবার বাংলা ভাষার লেখাও বিদেশি ভাষায় অনুবাদ করা হবে। এটা করতে পারলে আমাদের একটি বড় কাজ শুরু হবে বলে আমি মনে করি।
দেশ রূপান্তর : বাংলা একাডেমি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
মুহম্মদ নূরুল হুদা : ১৯৪৭ সালে পূর্ববাংলায় শুরু হয় বাঙালির জাতিসত্তা ও মাতৃভাষার অধিকারের ওপর আক্রমণ। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ ১৯৪৮ সালে ঢাকায় এসে রমনা রেসকোর্স ময়দানে বলেন : টৎফঁ ধহফ ড়হষু ঁৎফঁ ংযধষষ নব ঃযব ংঃধঃব ষধহমঁধমব ড়ভ চধশরংঃধহ। এই বক্তব্যের সঙ্গে সঙ্গেই ছাত্ররা চিৎকার করে বলেন ঘড়, ঘড়। সেই মুহূর্তেই পূর্ববাংলায় রোপিত হয় বাঙালি জাতিসত্তা, বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠনের সম্ভাবনা এবং বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠার বীজ। ধাপে ধাপে আন্দোলন ১৯৪৮-এ শুরু হয়ে ১৯৫২-এ ছাত্র-জনতার মরণপণ সংগ্রাম ও আত্মবলিদানের মাধ্যমে ঐতিহাসিক পটপরিবর্তনের সূচনা হয়। ১৯৫৪ সালে পূর্ব বাংলার সাধারণ নির্বাচনে এ. কে. ফজলুল হক, মওলানা ভাসানী এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে গঠিত হয় রাজনৈতিক মোর্চা : ‘যুক্তফ্রন্ট’। নির্বাচনে সাম্প্রদায়িক সরকারি দল মুসলিম লীগকে পরাজিত করে যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠিত হয়। যুক্তফ্রন্ট সরকার ১৯৫৫ সালের ৩ ডিসেম্বর বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠা করে। বাংলা একাডেমির প্রতিষ্ঠা বাঙালির জাতিসত্তা, নিজস্ব রাষ্ট্র গঠন ও জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। পরবর্তীকালে এরই ধারাবাহিকতায় নানা সংগ্রামের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা লাভ করে। তাই বাংলা একাডেমির প্রতিষ্ঠা বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ইতিহাসেরই একটি অংশ। এ প্রতিষ্ঠানের অনন্যতা এজন্যই। এখন এই প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব গ্রহণ করে তাই নিজেকে ইতিহাসের যাত্রী হিসেবে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছি।
আশা করি আগামী দিনে বাংলা একাডেমি হবে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের তীর্থস্থান। আমার আগের মহাপরিচালক কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী, যিনি আমার দীর্ঘদিনের বন্ধু ছিলেন, তিনি বেশ কিছু প্রকল্প নতুন করে শুরু করেছিলেন সেগুলো এখন অসমাপ্ত হয়ে আছে। সেসব আগে সম্পন্ন করতে চাই। সিরাজী নতুন প্রকল্প খুব বেশি শুরু করেননি, কিন্তু আগে ছিল কিন্তু দীর্ঘদিন বন্ধ হয়ে পড়েছিল এমন কাজগুলো নতুন মাত্রায় শুরু করেছিল, সেসব আমরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চালু করতে চাই। একাডেমির কর্মপরিবেশ আরও সুন্দর ও সুগঠিত করতে কাজ করতে হবে। এছাড়া অবকাঠামোগত উন্নয়নও করতে হবে। তিন বছর হয়তো খুব বেশি সময় নয়, আবার একেবারে কমও নয়। তাই এই সময়ে এমন কিছু কাজ শুরু করতে চাই, যাতে পরবর্তী সময়ে এখানে যারা আসবেন তারা কাজটি এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেন।
চলতি বছর আমাদের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং একইসঙ্গে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ উদযাপিত হলো। এসব নিয়ে একাডেমির বেশ কিছু কর্মসূচি রয়েছে। যা চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই শেষ করতে হবে। এসব কাজের মধ্যে রয়েছে বই প্রকাশ, সেমিনার আয়োজনসহ নানা কিছু। এসব এখন এই মহামারীকালে শেষ করাটাও চ্যালেঞ্জ।
দেশ রূপান্তর : নতুন কর্মসূচি বিষয়ে শুনতে চাই।
মুহম্মদ নূরুল হুদা : চলতি বছরে আমাদের জন্য বড় কাজ নির্ধারিত সময়ে এই কর্মসূচিগুলো শেষ করা। বাংলা একাডেমিতে মহাপরিচালক হিসেবে আসার আগেও আমি এই কাজের সঙ্গে জড়িত ছিলাম। সিরাজী আমাকে কাজের বিষয়ে বিস্তারিত জানাত। তাই এই কাজগুলোর বিষয়ে আমার জানাশোনা আছে। আগামী দিনের নতুন কর্মসূচি প্রণয়নে আমরা কাজ শুরু করছি। এর মধ্যে একটি কাজের কথা এখন বলা যেতে পারে ইউনেস্কোর কাছে তরুণ লেখকদের নিয়ে একটি বৃহৎ কাজের জন্য সহযোগিতার জন্য চিঠি পাঠিয়েছি। এটা করা গেলে একটি মাইলফলক কাজ হবে। এছাড়া আরও বেশ কিছু নতুন কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে শিগগিরই।
দেশ রূপান্তর : একটি আলোচনা প্রায়ই শোনা যায়, বইমেলার আয়োজন করতে গিয়ে একাডেমির নিয়মিত কাজে বিঘœ ঘটে। মেলার আয়োজন প্রকাশকদের কাছে ছেড়ে দেওয়ার দাবিও প্রায়ই শোনা যায়। বিষয়টাকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
মুহম্মদ নূরুল হুদা : প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাস জুড়ে বাংলা একাডেমি একটি বইমেলার আয়োজন করে যা অমর একুশে গ্রন্থমেলা নামে আখ্যায়িত। ১৯৫২-এর ফেব্রুয়ারি মাসের ২১ তারিখ বাংলা ভাষার জন্য আত্মোৎসর্গের যে করুণ ঘটনা ঘটে, সেই স্মৃতিকে অমøান রাখতেই এই মাসে এই বইমেলার নামকরণ করা হয় ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’। ১৯৮৪ সাল থেকে বাংলা একাডেমি আয়োজিত বইমেলাকে অমর একুশে গ্রন্থমেলা নামকরণ করা হয়। বছরে কেবল একটি মাস মেলা হয়, বাকি এগারো মাস একাডেমির স্বাভাবিক কাজ হয়। তাই মেলা আয়োজনের ফলে একাডেমির কাজ ব্যাহত হয় এটা পুরোপুরি ঠিক নয়।
দেশ রূপান্তর : অশেষ ধন্যবাদ, আপনাকে।
মুহম্মদ নূরুল হুদা : আপনাকেও ধন্যবাদ।