সংস্কারের পর ফের উড়ল উপহারের ঘরের চালা, ঠিকাদার পলাতক

জমির মাঝখানে ঘর, মূল রাস্তা থেকে সেখানে যাওয়ার জন্য করা হয়নি কোনো রাস্তা। নেই সুপেয় পানি ও বিদ্যুতের ব্যবস্থা। অনেক ঘরের পাকা মেঝেতে দেখা দিয়েছে ফাটল, কোনো কোনো ঘরের দেয়ালেও বড় ফাটল। ভেঙে পড়েছে কারও কারও রান্নাঘরও। ব্যবহারের আগে নড়বড়ে অনেক ঘরের জানালা-দরজা। দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার আলাদীপুর ইউনিয়নের বাসুদেবপুরের আশ্রয়ণ প্রকল্প-২ সুবিধাভোগীদের অভিযোগ, দায়সারাভাবে খুবই নিম্নমানের কাজ হয়েছে এখানে। বেশিরভাগ ঘরই বসবাসের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। বাইরের লোক দিয়ে কাজ করানোয় কোনো মানই বজায় রাখা হয়নি। ‘চুক্তিভিত্তিক ঠিকাদার’ দিয়ে কাজ করানোর কথা স্বীকার করে উপজেলা প্রশাসন বলছে, কাজের মান খারাপ হওয়ায় শ্রমিকদের ওই ঠিকাদারকে বকাঝকা করা হয়। পরে তিনি টাকা নিয়ে পালিয়ে যান। তবে যার বিরুদ্ধে এই অভিযোগ, সেই রফিকুল ইসলামের ভাষ্য, তিনি সবকিছুই করেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিয়াজ উদ্দীনের নির্দেশে। এখন দোষ চাপানো হচ্ছে তার ওপর।

ঈদের আগে সরেজমিনে দেখা যায়, দৈনিক ভিত্তিতে ৪০-৪৫ জন শ্রমিক দিয়ে বাসুদেবপুর আশ্রয়ণ প্রকল্পের ‘জয় বাংলা পল্লীত’ মেরামতের কাজ চলছে। তবে দেখা মেলেনি প্রশাসনের কোনো লোকজনের। তদারকির দায়িত্বে রয়েছেন নতুন চুক্তিভিত্তিক ঠিকাদার শফিকুল ইসলাম। তার বাড়ি নীলফামারীর ডোমার উপজেলায়। ১৮ জুলাই পর্যন্ত শফিকুল ইসলাম তার লোকবল নিয়ে ঈদের ছুটিতে চলে যান। শনিবার পর্যন্ত ওই প্রকল্পে কাজ শুরু হয়নি।

স্থানীয়রা জানান, এর আগে গত ১০ মে সামান্য ঝড়ে উড়ে যায় আলাদীপুর ইউনিয়নের বাসুদেবপুরের ‘জয় বাংলা পল্লীর’ বেশ কয়েকটি ঘরের টিনের চালা, ভেঙে পড়ে আধা পাকা বারান্দার পিলার। এক মাসের মাথায় গত ১০ জুন আবারও বাসুদেবপুর আশ্রয়ণ প্রকল্পের নির্মাণাধীন ঘরের রডসহ টিনের চালা উড়ে যায়। 

নতুন ‘ঠিকাদার’ শফিকুল ইসলামের দাবি, ঘরগুলো নির্মাণ করেছেন ঠিকাদার রফিকুল ইসলাম, কিন্তু কাজের মান ভালো না হওয়ায় ইউএনও তাকে গালিগালাজ করেন। তখন তিনি কাজ ছেড়ে পালিয়ে যান।

তবে এ বিষয়ে রফিকুল দেশ রূপান্তরকে বলেন, তিনি যা করেছেন তার সবটাই করেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশেই। এ নিয়ে খবর প্রকাশিত হওয়ার পরই তার একার ওপর দোষ চাপানো হচ্ছে। 

মুজিববর্ষের উপহার হিসেবে ফুলবাড়ী উপজেলায় নির্মাণ হয়েছে ১ হাজার বাড়ি। উপজেলার আলাদীপুর ইউনিয়নের বাসুদেবপুরে প্রথম ধাপের ঘরগুলো নিম্নমানের কাজের অভিযোগ উঠেছে, সেখানে উঠে গেছে বারান্দার প্লাস্টার, ঘরের ওয়াল ফাটা, চলাচলের অনুপযোগী রাস্তা। কিছু কিছু ঘরের কাজ নতুন করে ঠিক করা হচ্ছে। প্রকল্প এলাকায় প্রশাসনের কোনো লোকজন নেই, তদারকি ছাড়াই দৈনিক নির্মাণ শ্রমিকরা তাদের ইচ্ছেমতো কাজ করে যাচ্ছেন।

মুজিববর্ষ উপলক্ষে ‘আশ্রয়ণের অধিকার, শেখ হাসিনার উপহার’ ফুলবাড়ীতে প্রথম ধাপে ৭৬৯টি, ২য় পর্যায়ে ২০০টি এবং বিশেষ এলাকার জন্য (পার্বত্য চট্টগ্রাম ব্যতীত) ৩০টি, উপজেলা পরিষদের অর্থায়নে দুটিসহ মোট ১ হাজার বাড়ি নির্মাণ করা হচ্ছে।

এর মধ্যে প্রথম ধাপে নির্মিত বাড়িগুলোর নাম দেওয়া হয়েছে ‘জয় বাংলা পল্লী’। এই ধাপে ফুলবাড়ীতে ৭৬৯টি বাড়ি নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। এর মধ্যে বেশিরভাগ বসবাসকারী ঘরগুলোর নির্মাণকাজ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা। 

ফুলবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রিয়াজ উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, মুজিববর্ষে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া উপহারের ঘরগুলোয় প্রথম পর্যায়ে কিছু ত্রুটিবিচ্যুতি হয়েছে, যে কাজ করা হয়েছে তা নকশা অনুযায়ী করা হয়েছে। আলাদীপুর ইউনিয়নের বাসুদেবপুর আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরগুলো এখন মেরামত করা হচ্ছে। এরপরও কোনো সমস্যার অভিযোগ পেলেই তা সঙ্গে সঙ্গে সমাধানের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

এই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দাবি, বাইরের কাউকে দিয়ে কাজ করানো হয়নি, যারা এসব কাজে পারদর্শী তাদের দিয়েই কাজ করানো হয়েছে।

এদিকে ৯ জুলাই বিকেলে মুজিববর্ষ উপলক্ষে আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের আওতায় প্রথম ও ২য় পর্যায়ে নির্মিতব্য/নির্মিত একক গৃহসমূহের বর্তমান অবস্থা সরেজমিনে পরিদর্শন করেন অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) আবু তাহের মো. মাসুদ রানাসহ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উপ-প্রকল্প প্রকৌশলী মো. আনোয়ার হোসেন ও মনিটরিং কর্মকর্তা গোলাম মবিন মো. মাহতাবুল।

ইউএনও অফিস সূত্রে জানা গেছে, মুজিববর্ষ উপলক্ষে ২০২০-২১ অর্থবছরে আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পে ভূমি ও গৃহহীনদের বসবাসের লক্ষ্যে সরকারের ‘ক’ শ্রেণিভুক্ত জমিতে প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পে প্রথম ধাপে ফুলবাড়ী উপজেলায় প্রতিটি বাড়ির জন্য ১ লাখ ৭১ হাজার টাকা ব্যয়ে ৭টি ইউনিয়নে ৭৮২টি বাড়ি নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়। এরপর দ্বিতীয় ধাপে প্রতিটি ঘর ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা ব্যয়ে আরও ২০০টি বাড়ি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম ব্যতীত সমতলের ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীর জন্য ২০টি বাড়ি নির্মাণ করা হয়। বর্তমানে দ্বিতীয় ধাপের নির্মাণকাজ চলছে।