গতকাল শনিবার সকাল সাড়ে ৯টা। গাবতলী ব্রিজের ওপর দেখা গেছে ব্যাগ হাতে মানুষের সারি। কেউবা কোলে শিশু-সন্তান নিয়ে। শত শত মানুষ ঢাকায় প্রবেশ করছে। যেসব মানুষ ওইপথ দিয়ে ঢাকায় ঢুকছেন তারা সবাই গ্রামের বাড়িতে গিয়েছেন ঈদ করতে। শুক্রবার ফিরতে না পারার কারণে তারা গতকাল ফিরেছেন। অধিকাংশ মানুষই ঢাকার আশপাশের জেলার। আবার কিছু লোকজন দক্ষিণাঞ্চলের। গাবতলী ব্রিজ পার হওয়ার পরেই তারা পড়ছেন বেকায়দায়। কোনো গণপরিবহন না থাকার কারণে অনেকেই হেঁটে গন্তব্যস্থলে রওনা দিয়েছেন। অনেকেই নিরুপায় হয়ে কয়েকগুণ বেশি ভাড়া দিয়ে রিকশায় গেছেন। গাবতলীর মতোই ঢাকার উত্তরা, মহাখালী, আব্দুল্লাহপুরসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় দেখা গেছে মানুষের জটলা ও যানবাহন।
অপরদিকে, গাবতলী ব্রিজের ওপারে আটকা পড়েছিল শত শত যানবাহন। বিধিনিষেধে যেসব যানবাহন চলাচল নিষেধ আছে সেগুলোকে উল্টো দিকে ফিরিয়ে দিচ্ছে পুলিশ। আমিনবাজারের সামনে যানবাহনের প্রবল চাপ। গতকাল ঢাকায় লকডাউনের দ্বিতীয় দিনে ওই এলাকায় সরেজমিনে দেখা গেছে এসব চিত্র।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) জানিয়েছে, গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত বিধিনিষেধ না মানায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৩৮৩ জনকে। তাছাড়া ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা করা হয়েছে ১৩৭ জনকে। তাদের কাছ থেকে আদায় হয়েছে ৯৫ হাজার ২৩০ টাকা। পাশাপাশি ৪৪১টি গাড়িকে জরিমানা করা হয়েছে ১০ লাখ ৮৩ হাজার টাকা। র্যাবের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সারা দেশে র্যাবের ১৮০টি টহল ও ১৮৬টি চেকপোস্ট পরিচালনা করা হয়। জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে দেশব্যাপী ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে এলিট ফোর্সটি। বিধিনিষেধ অমান্য করায় দেশব্যাপী পরিচালিত ২৭টি ভ্রাম্যমাণ আদালতে ২১২ জনকে ১ লাখ ৯১ হাজার ৪৪৭ টাকা জরিমানা করা হয়। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে উদ্বুদ্ধকরণে বিনামূল্যে দেড় হাজারের বেশি মাস্ক বিতরণ করা হয় এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে হ্যান্ড স্যানিটাইজার সরবরাহ করা হয়। বিধিনিষেধের প্রথম দিনে বিধিনিষেধ ভেঙে বের হওয়ায় রাজধানীতে ৪০৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এসময় জরিমানা আদায় হয়েছে প্রায় পৌনে ১২ লাখ টাকা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বিধিনিষেধের দ্বিতীয় দিনে পুরো ঢাকায় ছিল পুলিশের কড়া নজরদারি। সড়কের মোড়ে মোড়ে ছিল চেকপোস্ট। পুলিশ ‘ব্যারিকেড’ বসিয়ে চেকপোস্টগুলোতে ডিউটি করতে দেখা গেছে। যারাই বিনা কারণে গাড়ি নিয়ে বাইরে বের হয়েছেন তারাই পড়েছেন পুলিশের জেরার মুখে। এছাড়াও র্যাব ও সেনাবাহিনীর সদস্যদের ঢাকার বিভিন্নস্থানে টহল দিতে দেখা গেছে। ছিল ভ্রাম্যমাণ আদালতের নজরদারি। ঈদ-পরবর্তী লকডাউনের দ্বিতীয় দিন সকালে ছিল হালকা বৃষ্টি। তারমধ্যে শনিবার ছিল সরকারি ছুটির দিন। স্বাভাবিক কারণেই সকাল থেকে যানবাহন ও মানুষের চলাচল কম রাজধানীর সড়কগুলোতে। যানবাহন বলতে ছিল রিকশা ও প্রাইভেট কার। ঢাকার বড় তিন টার্মিনাল মহাখালী, গাবতলী ও সায়দাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে দূরপাল্লার কোনো বাস ছেড়ে যায়নি। এছাড়াও বাইরে থেকে আসা কোনো যানবাহনকে ঢাকায় ঢুকতে দেওয়া হয়নি। ঢাকার প্রবেশপথগুলোতে কঠোর নজরদারি বসিয়েছে পুলিশ। তবে ঢাকার বিভিন্ন অলিগলিতে মানুষের জটলা এবং কারণ ছাড়াই আড্ডা দিতে ও অলস সময় কাটাতে দেখা গেছে।
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে বাড়তে থাকায় ২৩ জুলাই সকাল ৬টা থেকে আবার সরকার ঘোষিত কঠোর লকডাউন শুরু হয়েছে। এই বিধিনিষেধ চলবে আগামী ৫ আগস্ট রাত ১২টা পর্যন্ত। তবে লকডাউন বাড়বে নাকি উঠিয়ে নেওয়া হবে তা সরকারের পক্ষ থেকে কিছু বলা হয়নি।
গতকাল রাজধানীর বিভিন্নস্থানে ঘুরে আরও দেখা যায়, লকডাউনে সরকারের কঠোর বিধিনিষেধ বাস্তবায়নে রাস্তায় রয়েছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি সেনাবাহিনীর সদস্য ও বিজিবি। গতকাল দুপুরে কারওয়ানবাজার পাইকারি মার্কেটে ভিড় দেখা যায়। সেখানে স্বাস্থ্যবিধি তেমন কাউকে মানতে দেখা যায়নি। ঢাকার চেকপোস্টগুলোতে গাড়ি থামিয়ে জিজ্ঞাসা করা হলেও সাধারণ মানুষকে তেমন জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে না। গতকাল বিজয় সরণির মোড়ে চেকপোস্টে দেখা গেছে, পুলিশ সড়কে আসা গাড়িগুলো সিগন্যাল দিয়ে গাড়ির চালকদের জিজ্ঞাসা করছিল পরিচয় এবং কেন বের হয়েছেন। যারাই যৌক্তিক কোনো উত্তর দিতে না পেরেছেন তারাই হয়েছেন গ্রেপ্তার। কারও বিরুদ্ধে করা হয়েছে ট্রাফিক আইন অনুযায়ী মামলা। সাদ্দাম নামে এক প্রাইভেট গাড়িচালক জানান, তার মালিক অসুস্থ। মালিকের বাড়ি মিরপুর হলেও এখন আছেন চিটাগাং রোডে বোনের বাড়িতে। তিনি আরও জানান, গাড়ি নিয়ে বের হওয়ার কারণে তিনটি চেকপোস্টে জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হয়েছেন। গাড়ি নিয়ে বের হওয়ার কারণে তার নামে দেওয়া হয়েছে ট্রাফিক মামলা। ইসলাম নামে এক প্রাইভেট কোম্পানির চাকরিজীবী জানান, তার অফিস লকডাউন দেওয়া হয়েছে। মহাখালীতে ব্যক্তিগত কাজে এক আত্মীয়ের বাসায় যাবেন বলে বাইরে বের হয়েছেন। তবে রিকশাচালকরা তিন ডাবল ভাড়া হাঁকার কারণে তিনি হেঁটেই মহাখালীতে আত্মীয়ের বাসায় রওনা দিয়েছেন।
ট্রাফিক সার্জেন্ট সুমন বলেন, সকাল থেকে গাড়ি ও মানুষের চাপ দুটিই কম। সড়কে দুই-চারজন মানুষ দেখা যায়, তারা জরুরি সেবার আওতায়। তবে যারাই বিনা প্রয়োজনে বাইরে বের হয়েছেন তারাই পড়েছেন পুলিশি জেরায়। আমরা কাউকে ছাড় দিচ্ছি না। সকাল থেকে সব গাড়ি থামিয়ে চেক করছি। কাউকে এখনো বিশেষ কারণ ছাড়া ঘর থেকে বের হতে দেখিনি। সরকারের নির্দেশনা শতভাগ বাস্তবায়নের চেষ্টা করছি।