উপসর্গে মৃত্যুর পরিসংখ্যান না থাকায় ভয়হীন মানুষ

বাংলাদেশে গ্রাম পর্যায়ে করোনার উপসর্গ নিয়ে মারা যাচ্ছেন অনেকে। মৃতের সংখ্যা বাড়লেও পরীক্ষা না হওয়াতে করোনার সরকারি পরিসংখ্যানে তা উঠে আসছে না। যে কারণে গ্রামের মানুষ পরিস্থিতি আঁচ করতে পারছেন না বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

চলতি মাসের ২৩ দিনে করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা আগের সব মাসের রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে। সরকারের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৩ দিনে দুই লাখ ৫৬ হাজার ১৯৬ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। আর করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ৪ হাজার ৩৪৭ জন মারা গেছেন। সরকারি হিসাবে প্রতিদিন যে মৃত্যুর সংখ্যা বলা হচ্ছে সেটি উদ্বেগজনক। এর বাইরেও সারা দেশে করোনা উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। আর মৃত্যুর সংখ্যা গ্রামে সবচেয়ে বেশি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনাধীন ‘বাংলাদেশ পিস অবজারভেটরি’ সারা দেশে করোনার  উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া মানুষের তালিকা করছে। চলতি মাসের তালিকা এখনো সম্পন্ন হয়নি বলে জানায় প্রতিষ্ঠানটি। ফলে এই মুহূর্তে সঠিক সংখ্যাটি বলা সম্ভব না হলেও উপসর্গ নিয়ে মৃতের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে বলে জানায় তারা। এ পর্যন্ত যে তালিকা হয়েছে তাতে গত মাসের তুলনায় এই মাসে উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা দ্বিগুণের  বেশি হতে পারে। এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য-উপাত্তে সে ইঙ্গিতই দিচ্ছে বলে দাবি তাদের।

গ্রামে আক্রান্তদের বেশিরভাগই নমুনা পরীক্ষা করাতে আগ্রহী নন। তবে শুধু আগ্রহের ঘাটতি আছে তা নয়। সব এলাকায় করোনা পরীক্ষার ব্যবস্থাও নেই বলে জানা গেছে। যে কারণে অনেকেই ঘরে বসে চিকিৎসা নিচ্ছেন। যাদের শরীরে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো তারা হয়তো কিছুদিন পর সুস্থ হয়ে উঠছেন। আবার সর্দি, কাশি, জ্বর, শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি নিয়ে মারা যাওয়ার ঘটনার খবরও পাওয়া যাচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেন, ‘উপসর্গ দেখা দিলেও গ্রামের মানুষ করোনা পরীক্ষা করাতে চান না। আমি নিজে ঈদের দিন গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখেছি, মানুষের ভয় অনেক কমে গেছে। স্বাস্থ্যবিধি মানার আগ্রহ নেই তাদের। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের উদ্যোগে গ্রামের মানুষকে করোনার বিষয়ে সচেতন করতে জনপ্রতিনিধি, স্বাস্থ্যকর্মী ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। ঈদের আগেই এই কমিটি করা হয়েছে। উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসা নেওয়া, ঘরে থাকা, আইসোলেশনে রাখা এসব কাজে সহযোগিতা করবে ওই কমিটি।’

রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও বর্তমান উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর তদন্ত হওয়া উচিত। সরকারের আইনেও আছে, প্রতিটি মৃত্যুর কারণ জানতে হবে। এই মৃত্যুর কারণগুলো যদি করোনা হয়, তাহলে কিন্তু গ্রামের মানুষ ভয় পাবে। যেটা এখন তাদের মধ্যে কাজ করছে না। আসলে সবকিছু মিলিয়ে মানুষকে সচেতন করার বিকল্প নেই। এখনো তো গ্রামের অধিকাংশ মানুষ টিকা নেয়নি। তাদের দ্রুত টিকার আওতায় আনতে হবে।’

রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এ এস এম আলমগীর বলেছেন, অনেক সময় দেখা যায় রোগীর অবস্থা খুব জটিল হওয়ার পর হাসপাতালে আসছেন। এরপর চিকিৎসা শুরু হয়। পাশাপাশি রোগীর নমুনা নিয়ে করোনা পরীক্ষার জন্য ল্যাবে পাঠানো হয়। ফলে রিপোর্ট আসার আগেই হয়তো কারও মৃত্যু ঘটে। তখন হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ সেটাকে উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে বলে তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিবেদন দিয়ে থাকে।

বরিশালে উপসর্গ নিয়ে ৭২০ মৃত্যু

বরিশাল বিভাগে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনা ও উপসর্গ নিয়ে ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ২ জন করোনা পজিটিভ ও বাকি ১০ জন মারা যান উপসর্গ নিয়ে বরিশাল শের ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডের আইসোলেশনে। এছাড়াও গত ২৪ ঘণ্টায় বরিশাল বিভাগে ৩৮৫ জনের নমুনা পরীক্ষায় করোনা শনাক্ত হয়েছে ১৫০ জনের। নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে বিভাগে শনাক্তের হার ৩৮ দশমিক ৯৬ শতাংশ।

এর আগের ২৪ ঘণ্টায় এই বিভাগে করোনায় ৭ জনের এবং উপসর্গ নিয়ে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছিল। পাশাপাশি ১৮৩ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছিল।

২৪ ঘণ্টায় করোনা পজিটিভ হয়ে মারা গেছেন ২ জন। এ নিয়ে বিভাগে করোনা পজিটিভ হয়ে মারা গেছেন ৪১৬ জন। উপসর্গ নিয়ে ১০জন মারা যান বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডের আইসোলেশনে। এ নিয়ে এই হাসপাতালে উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন ৭২০ জন।

বগুড়ায় করোনা ও উপসর্গে ২৬ জনের মৃত্যু

বগুড়ার দুটি হাসপাতালের করোনা ইউনিটে ২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে করোনা আক্রান্ত হয়ে ৮ জন এবং উপসর্গে মারা গেছেন আরও ১৮ জন। এছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে করোনা শনাক্ত হয়েছে ১৪৪ জনের। একই সময়ে সুস্থ হয়েছেন ১৩৬ জন। শনিবার বগুড়ার ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. মোস্তাফিজুর রহমান তুহিন অনলাইন ব্রিফিংয়ে এই তথ্য জানান। 

খুলনা বিভাগে করোনায় আরও ৩৩ জনের মৃত্যু

খুলনা বিভাগে মহামারী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে আরও ৩৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাদের মৃত্যু হয়। একই সময়ে করোনা শনাক্ত হয়েছে ২৪৯ জনের। গতকাল শনিবার দুপুরে বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। এর আগে গতকাল শুক্রবার খুলনা বিভাগে ৩০ জনের মৃত্যু এবং ৩৬১ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছিল।

স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তর সূত্র জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগের মধ্যে কুষ্টিয়ায় সর্বোচ্চ ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে । এছাড়া খুলনায় আটজন, যশোরে ছয়জন এবং নড়াইল, মাগুরা, ঝিনাইদহ ও মেহেরপুরে একজন করে মারা গেছেন।

সাতক্ষীরা মেডিকেলে উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু ৫০০ ছাড়াল

করোনা ডেডিকেটেড সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে করোনার উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু ৫০০ ছাড়াল। গত ২৪ ঘণ্টায় করোনার উপসর্গ নিয়ে এ হাসপাতালে আরও চারজন মারা গেছেন। করোনার উপসর্গ নিয়ে জেলায় এ পর্যন্ত ৫০২ জন মারা গেছেন। আর করোনায় জেলায় এ পর্যন্ত ৮২ জন মারা গেছেন। শনিবার জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।

করোনা ডেডিকেটেড সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্র জানায়, চলতি মাসে করোনার উপসর্গ নিয়ে ১৫২ ও করোনায় ৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর আগে জুন মাসে করোনার উপসর্গ নিয়ে ১২২ ও করোনায় ২৮ জনের মৃত্যু হয়। এখন করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা কমলেও উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে।

সাতক্ষীরা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের চিকিৎসা কর্মকর্তা জয়ন্ত সরকার বলেন, গত শুক্রবার সকাল আটটা থেকে গতকাল শনিবার রাত আটটা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় করোনার উপসর্গ নিয়ে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তিনজন নারীসহ চারজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়াল ৫০২।

সাতক্ষীরা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের চিকিৎসা কর্মকর্তা জয়ন্ত সরকার আরও জানান, ২৩ জুলাই পর্যন্ত করোনার উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন ১৫২ জন। এই সময়ে করোনায় মারা গেছেন ৮ জন।

রাজশাহী বিভাগে ১৩ জনের মৃত্যু

রাজশাহী বিভাগে গত শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় করোনা আক্রান্তদের মধ্যে আরও ১৩ জন মারা গেছেন। এর আগের দিন আক্রান্তদের মধ্যে মারা যান ৫ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ৪৩২ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ৪০৭ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। শনাক্তের হার ২৮ দশমিক ৪২ শতাংশ। এ নিয়ে বিভাগে করোনা রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৭ হাজার ২৮৯। গতকাল শনিবার রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক নাজমা আক্তার স্বাক্ষরিত প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।