শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় রাজধানীর খিলগাঁও কবরস্থানে শায়িত হলেন গণসংগীতশিল্পী ফকির আলমগীর। গতকাল জোহরের পর খিলগাঁও চৌধুরীপাড়া জামে মসজিদে (মাটির মসজিদ) দ্বিতীয় জানাজা শেষে এই শিল্পীকে বেলা আড়াইটায় খিলগাঁও কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।
এর আগে বেলা ১১টায় খিলগাঁওয়ের পল্লীমা সংসদ প্রাঙ্গণে ঢাকা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে ‘গার্ড অব অনার’ দেওয়া হয়। সেখানে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম জানাজা। পরে দুপুর ১২টার দিকে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য একুশে পদকপ্রাপ্ত এই কণ্ঠযোদ্ধার মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নেওয়া হয়।
কঠোর লকডাউনের মধ্যে মুষলধারে বৃষ্টি উপেক্ষা করে গণমানুষের এ শিল্পীকে শেষবারের মতো শ্রদ্ধা জানাতে শহীদ মিনারে এসেছিলেন তার দীর্ঘদিনের সহকর্মী, রাজনৈতিক নেতা, নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। দুপুর ১টা পর্যন্ত তার মরদেহ শহীদ মিনারে রাখা হয়। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের আয়োজনে প্রথমেই আওয়ামী লীগের পক্ষে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন দলটির সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন, সাংস্কৃতিক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল, মহিলাবিষয়ক সম্পাদক মেহের আফরোজ চুমকি, দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া। এ ছাড়া তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, নৌ পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক আখতারুজ্জামান, গণস্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা স্ট্রাস্টি জাফরুল্লাহ চৌধুরীসহ অনেকে ব্যক্তিগতভাবে শ্রদ্ধা জানান। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, গণসংগীত সমন্বয় পরিষদ, পথনাটক পরিষদ, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, কৃষক লীগ, ছাত্রলীগ, দনিয়া সাংস্কৃতিক জোট, মহাকাল নাট্য সম্প্রদায়, স্পন্দন, আদি ঢাকা সাংস্কৃতিক জোট, যুব ইউনিয়ন, কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর, জাসদ, ছাত্রমৈত্রী, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন ফুলেল শ্রদ্ধা জানায় তার প্রতি।
এ সময় ফকির আলমগীরের স্ত্রী সুরাইয়া আলমগীর বলেন, ‘ফকির আলমগীর ছিলেন গণমানুষের শিল্পী। তার জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চাই। তার একটি আফসোস ছিল, স্বাধীনতা পদক দেখে যেতে পারলেন না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যেন এই পদকটি দেন, তার আত্মার শান্তির জন্য। গণসংগীতের প্রজ্জালিত মশাল রেখে গেছেন তিনি, আগামী প্রজন্ম যেন তার গানগুলোকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে দেয়।’
শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ বলেন, ‘ফকির আলমগীর শুধু গণসংগীতশিল্পীই ছিলেন না, তিনি আমাদের স্বাধীনতাসংগ্রামে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে, স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের শিল্পী হিসেবে কাজ করেছেন। এ দেশের গণসংগীতকে সমৃদ্ধ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির জন্য লড়াই এবং আশির দশক ও নব্বইয়ের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তার অবদান স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।’
নৌ পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘ফকির আলমগীর গানের মধ্য দিয়ে খেটে খাওয়া মানুষের কথা বলেছেন। মানুষের অধিকার আদায়ের কথা গানে গানে তুলে ধরেছেন। মানুষের অধিকার আদায়ের কথাগুলো বাংলাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে গেছে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ফকির আলমগীরকে স্মরণ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আখরুজ্জামান বলেন, ‘গণমানুষের সংগীত পরিবেশনে যে অনন্য অবদান রেখেছেন, এর জন্য তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।’
গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় মানুষ যখন দুঃখ-দুর্দশায়, তখন গানের মাধ্যমে আশা জাগিয়েছেন ফকির আলমগীর।’
এর আগে ফকির আলমগীরের মৃত্যুতে শোক জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য এবং কেন্দ্রীয় ১৪ দলের সমন্বয়ক আমির হোসেন আমু, তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসান, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও বিরোধীদলীয় উপনেতা গোলাম মোহাম্মদ কাদের, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ প্রমুখ। এ ছাড়া ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠী, জাতীয় কবিতা পরিষদ, থিয়েটার পত্রিকা ‘ক্ষ্যাপা’, অভিনয় শিল্পী সংঘ, নাট্যদল অনুস্বরসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন শোক জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে।
করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর ‘হার্ট অ্যাটাক’ হয়ে শুক্রবার রাতে ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।