২৫ মার্চ ১৯৭১-এর ভয়াল ও নির্মম দৃশ্য যারা প্রত্যক্ষ করেছেন সেই বিদেশি সাংবাদিকরা যখন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে কার্যত বন্দি এবং ঢাকা থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার অপেক্ষায় তখন পাকিস্তানি মেজর সিদ্দিক এসে জানালেন তাদের জীবনের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করেই তাদের সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। লন্ডনের ডেইলি টেলিগ্রাফের ২৬ বছর বয়সী সংবাদদাতা সায়মন ড্রিং মেজরকে জিজ্ঞেস করলেন, না গেলে কী হবে? মেজরের উত্তর, বিদ্রোহী বাঙালিরা হত্যা করবে। যখন হোটেলের লবিতে সাংবাদিকদের জড়ো করা হলো সায়মন তখন থেকে যাওয়ার কৌশল খুঁজছেন। বিদেশি সাংবাদিকদের যখন গাড়িতে তোলা হচ্ছে তিনি তখন ইন্টারকন্টিনেন্টালের ছাদে এয়ার কন্ডিশনার প্ল্যান্টের নিচে লুকিয়ে। মাঝেমধ্যে ওপর থেকে উঁকি দিয়ে দেখছেন সাংবাদিকদের গাড়ি ছেড়ে গেল কিনা। গাড়িগুলো ছেড়ে যাওয়ার পরও আশঙ্কামুক্ত হলেন না। যখন গুনতিতে কম পড়বে কিংবা পত্রিকার নাম ধরে হাজিরা নেবে তার অনুপস্থিতির খবরটি ফাঁস হয়ে যাবে, তাকে ধরে নিতে সেনাবাহিনী আবার হাজির হবে। গাড়ি ছাড়ার দেড় ঘণ্টা পর তিনি সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলেন। রিসেপশনের বাঙালিরা তাকে দেখে চিন্তিত। তিনি সরেজমিন দেখে রিপোর্ট করবেন এবং তখনই বেরিয়ে পড়তে চাচ্ছেন। তারাই তাকে জানায়, আরও একজন বিদেশি সাংবাদিক সেনাবাহিনীকে ফাঁকি দিয়ে রয়ে গেছেন। সেই বিদেশি হচ্ছেন অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের ফটোগ্রাফার মিশেল লরেন্ট, (১৯৭২-এ পুলিৎজার বিজয়ী, ১৯৭৫-এর এপ্রিলে ভিয়েতনাম যুদ্ধের শেষ প্রান্তে সায়গনে নিহত) দুজন একসঙ্গে বেরোলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরান ঢাকার হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা ঘুরে ছবি তোলার সময় টহলরত সেনাবাহিনীর চোখে পড়ে যান। তারপর অবস্থান পরিবর্তন করে কোনোভাবে বেঁচে গিয়ে যখন হোটেলে ফিরে আসেন জানতে পারেন সেনাবাহিনী অনুসন্ধান করতে এসেছিল। রাতেও তারা দুবার আসে। কিন্তু নিরাপদ আশ্রয়ে থাকায় ধরা পড়েননি। তারপর কেমন করে ছবি ও নোট নিয়ে ঢাকা ছাড়লেন, উদোম তল্লাশির পরও ধরা পড়লেন না, করাচি পৌঁছালেন যেকোনো সময় গ্রেপ্তার ও মৃত্যুর আশঙ্কা নিয়ে; সেখান থেকে ব্যাংকক পৌঁছে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। ২৯ ও ৩০ মার্চ রক্তাক্ত ঢাকা নিয়ে তার বেশ কটি টেলিগ্রাফ প্রতিবেদন সেনাবাহিনীর হত্যাযজ্ঞ তুলে ধরে পৃথিবীকে জানিয়ে দিল।
ভিয়েতনাম যুদ্ধ কভার করার সময় সায়গনে থাকা অবস্থায় টেলিগ্রাফ হেডকোয়ার্টার্স থেকে নির্দেশ পেয়ে ৬ জানুয়ারি ১৯৭১ ঢাকা আসেন। ৯ মাস পর আবার ফিরে আসেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভ প্রত্যক্ষ করেন। ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে যান এবং মেজর সিদ্দিককে বলেন, মার্চে যদি ধরা পড়তেন তাহলে কী হতো! মেজর তেমন ভণিতা না করেই বললেন, সম্ভবত হত্যা করা হতো। ৭ মার্চ রেসকোর্সে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ যারা খুব কাছ থেকে শুনেছেন, তিনি তাদের অন্যতম। ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু যখন স্বদেশে ফিরলেন, সায়মন ড্রিং সেদিনও ঢাকায়, তার মনে হলো একটি বৃত্ত সম্পন্ন করেছেন।
সায়মন জন ড্রিং ১১ জানুয়ারি ১৯৪৫ দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শেষ বছরে ইংল্যান্ডের নরফোক কাউন্টির বাজার শহর ফাকেনহামে জন্মগ্রহণ করেন। উডব্রিজ বোর্ডিং স্কুলে পড়তেন, কিন্তু মধ্যরাতে ডেবেন নদীতে সাঁতার কাটার অপরাধে স্কুল থেকে বহিষ্কৃত হন, তারপর কিংস লিন টেকনিক্যাল কলেজে। ১৭ বছর বয়সে বিশ্বভ্রমণে বাড়ি ছাড়লেন ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণপূর্ব এশিয়া এবং ভারত ঘুরে ১৯৬৩ সালে ১৮ বছর বয়সে ব্যাংকক পোস্ট পত্রিকায় প্রুফ রিডারের চাকরি নিলেন, তারপর ফিচার রাইটার; ১৯৬৪ সালে ১৯ বছর বয়সে ডেইলি মেইল এবং নিউ ইয়র্ক টাইমসের ফ্রিল্যান্স কন্ট্রিবিউটর। ১৯৬৪-এর শেষে নিয়োগ পেলেন রয়টারের সর্বকনিষ্ঠ স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, তার দায়িত্ব ভিয়েতনাম যুদ্ধ কভার করা। ১৯৭০, ১৯৮০ এবং ১৯৯০-এর দশকে তিনি রয়টার্স, ডেইলি টেলিগ্রাফ, সানডে টাইমস, নিউজ উইক, বিবিসি রেডিও এবং বিবিসি টিভির হয়ে কাজ করেন। ক্রিস ল্যাঙ্গ ও স্যার বব গোল্ডফ-এর সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করেন স্পোর্ট এইড আফ্রিকার দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের জন্য এর মাধ্যমে ৩৬ মিলিয়ন ডলার উত্তোলন করেন। বিবিসি টেলিভিশনে তার ২৯০০০ কিলোমিটার জিপ ও ল্যান্ড রোভার ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে উপস্থাপনা করেছেন ‘অন দ্য রোড এসেইন’। ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশে টেলিভিশন নিউজ নেটওয়ার্ক সৃষ্টি ও একুশে টেলিভিশনে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। তার আগ্রহেই টেলিভিশন সাংবাদিকতার একটি নতুন পর্ব এখানে শুরু হয়। একাত্তরের বাংলাদেশ প্রতিবেদন তাকে করেছে ইউকে রিপোর্টার অব দ্য ইয়ার। বলিষ্ঠ সাংবাদিকতার জন্য আরও অনেক পুরস্কার তিনি লাভ করেছেন। ১৬ জুলাই ২০২১ একটি অপারেশন-উত্তর হার্ট অ্যাটাকে ৭৬ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়। উগান্ডায় ইদি আমিনের আমলে তার মৃত্যুদন্ড হয়েছিল। তিনি পালিয়ে বেড়িয়েছেন। বাংলাদেশবান্ধব সায়মন ড্রিংকে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মানিত করেছে।
ট্যাংক পাকিস্তানে বিদ্রোহ গুঁড়িয়ে দিয়েছে
ঢাকার প্রত্যক্ষদর্শী সায়মন ড্রিং-এর ব্যাংকক থেকে পাঠানো প্রতিবেদন :
[৩০ মার্চ ১৯৭১ ডেইলি টেলিগ্রাফে প্রকাশিত সায়মন ড্রিং-এর প্রতিবেদনটি ভাষান্তরিত করা হলো]
‘আল্লাহ এবং অখন্ড পাকিস্তানের নামে।’ ঢাকা এখন বিধ্বস্ত ও আতঙ্কিত শহর। পাকিস্তানি সেনাবানিহীর টানা ২৪ ঘণ্টা শীতল মস্তিষ্কের নির্বিচার গোলাবর্ষণে ৭০০০ মানুষের হত্যাকান্ড ও বিশাল এলাকা গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর নির্মমভাবে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতার লড়াই স্তব্ধ করা হয়েছে। পাকিস্তানের সামরিক সরকারের প্রধান প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের দাবি, পরিস্থিতি এখন শান্ত, তা সত্ত্বেও হাজার হাজার মানুষ গ্রামের দিকে পালিয়ে যাচ্ছে, শহরের রাস্তাগুলো প্রায় পরিত্যক্ত এবং প্রদেশের অন্যান্য অংশে এখন হত্যাকা- অব্যাহত রয়েছে। তবে এতে কোনো সন্দেহ নেই ট্যাংকের সমর্থনপুষ্ট সেনাবাহিনীই এখন প্রধান শহর প্রধান লোকালয় নিয়ন্ত্রণ করছে এবং প্রতিরোধ যৎসামান্য এবং এখন পর্যন্ত সে প্রতিরোধ অকার্যকর। তার পরও নামমাত্র প্ররোচনাতেই জনতার ওপর গুলিবর্ষণ করা হচ্ছে এবং কোনো বাছবিচার না করে ভবনসমূহ ধ্বংস করা হয়েছে। পাকিস্তানের পূর্বাংশের ৭ কোটি ৩০ লাখ বাঙালির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য সেনাবাহিনীকে প্রতিদিনই আরও বেশি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে মনে হচ্ছে। কত নিরীহ মানুষের মৃত্যু হয়েছে ও ধ্বংসযজ্ঞে আসলে কত ক্ষতি হয়েছে তা নির্ধারণ করা অসম্ভব। চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও যশোর থেকে যে মৃত্যুর প্রতিবেদন পাওয়া যাচ্ছে তাতে ঢাকাসহ পূর্বাঞ্চলের মৃতের সংখ্যা ১৫০০০ বলে অনুমান করা হচ্ছে। সামরিক অভিযানের ভয়াবহতা সঠিকভাবে আঁচ করতে হলে জানা দরকার হলের ছাত্ররা তাদের বিছানায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত, বাজারে দোকানের পেছনে দোকানিরা খুন হয়েছে, নারী ও শিশু তাদের ঘরে পুড়ে অঙ্গার হয়েছে, হিন্দু পাকিস্তানিদের বাড়ি থেকে বের করে নিয়ে লাইন ধরে হত্যা করা হয়েছে, বাজার ও দোকানপাট আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, আর এখন রাজধানীর প্রতিটি ভবনের ওপর পাকিস্তানের পতাকা উড়ছে। পাকিস্তানি সৈন্যের মৃত্যুর কোনো খতিয়ান পাওয়া যায়নি। তবে অন্তত একজন নিহত ও দুজন আহত হয়েছে। অন্তত এ সময়ের জন্য হলেও বাঙালিদের অভ্যুত্থান সত্যিই শেষ হয়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে। সেনাবাহিনীর হাতে শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার হতে দেখা গেছে। আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারাও আটক হয়েছেন।
সশস্ত্র আক্রমণ : নেতৃত্বস্থানীয় সক্রিয় রাজনীতিবিদদের জেলে ঢোকানো হয়েছে। অন্যদের হত্যা করা হয়েছে। শেখের আন্দোলনকে সমর্থনকারী দুটি সংবাদপত্র অফিস ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। কিন্তু ২৫ তারিখ রাতে যখন ঢাকায় কামান নামানো হয় তখন সেনাবাহিনীর প্রথম টার্গেট ছিল ছাত্ররা। ঢাকায় আক্রমণের জন্য আনুমানিক তিন ব্যাটালিয়ন সৈন্য ব্যবহার করা হয়েছে। একটি সাঁজোয়া, একটি গোলন্দাজ এবং একটি পদাতিক। রাত ১০টা বাজার একটু আগে তারা ব্যারাক ছাড়তে শুরু করে। রাত ১১টায় গুলিবর্ষণ শুরু হয়; জনগণ তখন তাড়াতাড়ি গাড়ি উল্টে, গাছের গুঁড়ি, আসবাব, কংক্রিটের পাইপ ইত্যাদি ফেলে রাস্তায় ব্যারিকেড দেওয়ার চেষ্টা করছিল, তারাই গুলিতে বলি হয়। শেখ মুজিবকে ফোন করে জানানো হয় কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে, কিন্তু তিনি বাড়ি ছাড়তে অস্বীকার করেন। গ্রেপ্তার এড়াতে সমর্থ হয়েছেন এমন একজন সহযোগীকে তিনি বলেছেন ‘আমি যদি লুকিয়ে যাই তাহলে আমার খোঁজে ঢাকার সব বাড়িঘর পুড়িয়ে ফেলবে।’
২০০ ছাত্র নিহত : ছাত্রদেরও সতর্ক করা হয়েছিল, কিন্তু তার পরও যারা ছিল তারা ভেবেছে বড়জোর তাদের গ্রেপ্তার করা হবে। অস্ত্রের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের জোগান দেওয়া দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকালের এম-২৪ কামান, মধ্যরাতের ঠিক পরপরই কামানের পেছনে সৈন্যরা ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের দিকে এগোয়। তারা ব্রিটিশ কাউন্সিল লাইব্রেরি দখল করে নেয় এবং এখানেই ভিত্তি গেড়ে আশপাশের ডরমেটরিতে সেল নিক্ষেপ করতে শুরু করে। সম্পূর্ণ হতবাক ২০০ ছাত্র ইকবাল হলে নিহত হয়। ইকবাল হলেই সরকারবিরোধী জঙ্গি ছাত্র সমিতির সদর দপ্তর। তাদের দেয়ালে গোলা আঘাত করেছে আর দরজায় মেশিনগানের গুলি। দরজার বাইরে দুটো পোড়া দেহ, বাইরে অনেক ছড়ানো-ছিটানো মৃতদেহ, অনেকগুলো নিকটবর্তী খালে ভাসমান। ইজেলের ওপর উপুড় হয়ে পড়ে আছে চিত্রকলার একজন ছাত্র। সাতজন শিক্ষককে তাদের বাড়িতে হত্যা করা হয়েছে; বাইরের একটি বাড়িতে লুকিয়ে থাকা ১২ জনের সবাইকে হত্যা করেছে। সেনাবাহিনী অনেক মৃতদেহ সরিয়ে নিয়েছে। কিন্তু ইকবাল হলের করিডরে তখনো পড়ে থাকা ৩০টি মৃতদেহ হয়তো গোনায় ধরেনি। অন্য একটি হলে গণকবর খনন করে সৈন্যরা মৃতদেহ মাটিচাপা দিয়ে তার ওপর বুলডোজার চালিয়ে দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে যাদের বসবাস আগুন থেকে তারা নিষ্কৃতি পায়নি। রেললাইনের গা-ঘেঁষা ২০০ বাড়ি তারা পুড়িয়ে ফেলেছে।
সেনা প্যাট্রল তাদের কাছাকাছি বাজার এলাকা জ্বালিয়ে দিয়েছে, দোকানের গলিপথ দুদিকে গুলি করে ঘুমন্ত দোকানদারদের হত্যা করেছে। দুদিন পর বেরিয়ে যখন এসব দৃশ্য দেখা সম্ভব হলো, মনে হলো কাঁধের ওপর কাঁথা টেনে কেউ কেউ তখনো ঘুমিয়ে আছে। একই এলাকায় ঢাকা মেডিকেল কলেজে সরাসরি কামানের অগ্নিগোলা আঘাত করেছে, একটি মসজিদও বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তর আক্রান্ত : যখন বিশ্ববিদ্যালয় আক্রান্ত হয় তখন সৈন্যের বহর পূর্ব পাকিস্তান পুলিশের সদর দপ্তর রাজারবাগের দিকে এগিয়ে যায়। প্রথম ট্যাংক থেকে গোলাবর্ষণ করা হয়, তারপর সৈন্যরা ভেতরে ঢুকে পড়ে, ঘুমন্ত কোয়ার্টারগুলো গুঁড়িয়ে দেয়, ভবনগুলোর ভেতরে অগ্নিবোমা নিক্ষেপ করে। এমনকি উল্টোদিকে যারা থাকেন তারাও জানেন না কজন নিহত হয়েছে। তবে তা ছিল ১১০০ পুলিশের ঘাঁটি, সেখানে তেমন বেশি কেউ মৃত্যু এড়াতে পেরেছে বলে মনে হয় না।
৩২ নম্বর : একজন প্রতিবেশী বললেন, রাত ১টা ১০ মিনিটে একটি ট্যাংক, একটি সাঁজোয়া গাড়ি এবং ট্রাকভর্তি সৈন্য বাড়িটিতে গোলাগুলি করতে করতে এগিয়ে এসেছে। বাড়ির সামনে নেমে একজন অফিসার ইংরেজিতে চেঁচিয়ে বলেছেন, ‘শেখ আপনার নেমে আসা উচিত।’ ব্যালকনিতে বেরিয়ে এসে শেখ মুজিবুর রহমান বললেন, ‘হ্যাঁ আমি প্রস্তুত আছি, গোলাগুলি করার প্রয়োজন ছিল না। তোমাদের উচিত ছিল টেলিফোনে আমাকে ডাকা, আমি এসে হাজির হতাম।’ অফিসার তখন হেঁটে বাড়ির বাগানের ভেতরে গেলেন এবং বললেন, ‘আপনাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’
তাকে নিয়ে যাওয়া হয়। সঙ্গে তিনজন ভৃত্য, একজন সহযোগী এবং তার বডিগার্ড, বডিগার্ডকে ভীষণ মারধর করা হয়, কারণ তিনি অফিসারে ক অপমান করতে শুরু করেছিলেন।
দলিল-দস্তাবেজ তুলে নেয় : তাকে নিয়ে তারা রওনা হয়, সম্ভবত সেনা সদর দপ্তরের দিকে সৈন্যরা তার ঘরে ঢুকে সব দলিল-দস্তাবেজ তুলে নেয়। সামনে যা পায় ভাঙচুর করে। বাগানের গেটে তালা দেয়, সবুজ লাল ও হলুদ রঙের স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকায় গুলি চালায়, তারপর চলে যায়। সে রাত ২টায় (২৫ মার্চ দিবাগত, ২৬ মার্চ) গোটা শহর আগুনে জ্বলছে। সেনাবাহিনী বিশ^বিদ্যালয় ও সন্নিহিত এলাকার দখল নিয়ে ছাত্রদের গুলি করে ...... স্বাধীন বাংলার পতাকা লুকিয়ে পাকিস্তানের পতাকা ওঠাচ্ছে। তখনো কোনো কোনো এলাকায় সেনাবাহিনী সেল নিক্ষেপ করে চলেছে। যদিও লড়াইটার লক্ষণীয় হ্রাস ঘটেছে। ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের উল্টোদিকে ঢাকার (ইংরেজি দৈনিক) পিপল-এর জনশূন্য অফিসে ঝটপট ঢুকে পড়ে সৈন্যরা তাতে আগুন লাগিয়ে দেয়। আশপাশের বাড়িঘরেও আগুন লাগে, একজন নাইটগার্ডকে হত্যা করে। ভোরের সামান্য আগে গোলাগুলি থেমে আসে। ভয়ংকর এক নীরবতার শহরের ওপর সূর্য উদিত হয়; শহরটি বিরান এবং সম্পূর্ণ মৃত, কেবল কাক এবং সৈন্যদের গাড়িবহরের আওয়াজ ভেসে আসে। কিন্তু সবচেয়ে মন্দটি তখনো আসেনি। মধ্য-দুপুরে কোনো ধরনের সতর্কবার্তা ছাড়াই দলের পর দল সৈন্য পুরান শহরের দিকে ছুটল, সরু আঁকাবাঁকা গলিতে লক্ষাধিক মানুষের বসবাস। পরবর্তী ১১ ঘণ্টা তারা পদ্ধতিগতভাবে এই অঞ্চল ধ্বংস করে চলল। ঢাকার জনগণের মধ্যে এখানেই শেখ মুজিবের সমর্থন সবচেয়ে বেশি। ইংলিশ রোড, ফ্রেঞ্চ রোড, নাজিরা বাজার, সিটিবাজার অর্থহীন নাম কিন্তু সহস্র মানুষের নিবাস পুড়িয়ে মাটিতে মিশিয়ে দিল। ... অগ্রগামী সৈন্যদের হাতে পেট্রলের ক্যান। যারা পালাতে চেষ্টা করল, গুলিবিদ্ধ হলো। যারা ভেতরে রয়ে গেল আগুনে পুড়ে মরল। দুপুর ১২টা থেকে ২টার মধ্যে ৭০০ পুরুষ-নারী ও শিশু মৃত্যুবরণ করল। পুরান শহরের থানাও আক্রান্ত হলো। শনিবার সকালে একটি বাজারের ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যে একজন পুলিশ ইন্সপেক্টরও খুঁজে বেড়াচ্ছেন, বললেন, আমার জেলায় (এলাকায়) ২৪০ জন পুলিশ ছিল, মাত্র ৩০ জনকে পেয়েছি সবাই মৃত। [সংক্ষেপিত]
লেখক কথাসাহিত্যিক ও অনুবাদক