গ্যাস থেকে সংকট ছড়িয়েছে বিদ্যুতে। শহরে সিএনজি স্টেশনের বাইরে লম্বা লাইন আর গ্রামে গ্রামে চলছে ভয়াবহ লোডশেডিং। কোথাও কোথাও ১২ ঘণ্টার বেশি লোডশেডিং হচ্ছে। তবে গ্যাসের পরিস্থিতি আজ থেকে খানিকটা উন্নতির আশা করা হচ্ছে। যদিও এর আগে মঙ্গলবারের মধ্যে পুড়ে যাওয়া এলএনজি টার্মিনাল চালুর সময়সীমা নির্ধারণ করেও কাজ শেষ করতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি।
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ সূত্র জানায়, ৩ আগস্ট সোমবার দিবাগত রাত ১২টায় সারা দেশে লোডশেডিং হয়েছে ৩ হাজার ২৩২ মেগাওয়াট। সোম এবং মঙ্গলবার মিলিয়ে এটি সর্বোচ্চ লোডশেডিং বলে উল্লেখ করেছে পাওয়ার গ্রিড। তবে পিডিবি এবং পাওয়ার গ্রিড যা স্বীকার করে তাকে কাগুজে লোডশেডিং হিসেবেই দেখা হয়। সরবরাহের তুলনায় চাহিদা কম দেখিয়ে লোডশেডিং কম দেখানোর অভিযোগ বেশ পুরনো। সরকারি এই দুই প্রতিষ্ঠানই নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে এ ধরনের ভুল তথ্য প্রচার করে।
মাঠ পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, সবখানেই ভয়াবহ লোডশেডিং হচ্ছে। কয়েকটি জেলার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার এমনকি উপজেলার ডিজিএমদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে তারা চাহিদার অর্ধেকের বেশি বিদ্যুৎ পাচ্ছে না। ঘণ্টায় ঘণ্টায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে। গত কয়েক বছরের মধ্যে এবার মে এবং জুলাই মাসে লোডশেডিং ভয়ংকর আকার ধারণ করেছে। আকস্মিক এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন কমেছে। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে তরল জ্বালানির বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন যতটা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন ছিল তা করা হয়নি। এতে জনগণের দুর্ভোগ মাত্রা ছাড়িয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুতের দাবিতে মানুষ রাস্তায় নেমেছে। খোদ ঢাকায় সরকারের এই ব্যর্থতার প্রতিবাদে মানুষ ‘হারানো’ হারিকেন হাতে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করেছে। যদিও সরকারের তরফ থেকে এ বিষয়ে টুঁ শব্দটি করা হয়নি। দিনের পর দিন একই খুদে বার্তায় দুঃখ প্রকাশ করেছে বিতরণ কোম্পানিগুলো।
দিন-রাতের ১২ ঘণ্টাই লোডশেডিং কি শুরু হলো গ্রামে : ময়মনসিংহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ২-এর সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার মো. আকমল হোসেনকে ফোনে তার এলাকার লোডশেডিংয়ের অবস্থা জানতে চাইলে তিনি বলেন, তিনি চাহিদার তুলনায় ৩০ থেকে ৫০ ভাগ বিদ্যুৎ কম পাচ্ছেন। গড়ে প্রতিদিন একজন গ্রাহক ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎবিহীন থাকছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আট ঘণ্টার ওপরে লোডশেডিং করতেই হচ্ছে। তিনি জানান, বরমিতে বিআর পাওয়ার জোনের একটি তেলচালিত কেন্দ্র রয়েছে। সেটি বন্ধ থাকলে লোডশেডিং বেশি হয়।
পরিস্থিতি শুধু ময়মনসিংহতেই খারাপ তা নয়। পাবনার দাশুড়িয়ার ডিজিএম প্রকৌশলী রথীন্দ্র নাথ বর্মণের কাছে তার এলাকার চিত্র জানতে চাইলে বলেন, প্রচুর লোডশেডিং হচ্ছে। দিনের বেলায় তার এলাকার চাহিদা ২২ মেগাওয়াট, পাচ্ছেন ১০ মেগাওয়াট। অর্থাৎ চাহিদার অর্ধেকেরও কম। রাতে যখন চাহিদা বেড়ে ২৫ মেগাওয়াট হয় তখন তিনি পান ১৫ মেগাওয়াট। তাহলে কীভাবে সামাল দিচ্ছেন জানতে চাইলে বলেন, ঘণ্টায় ঘণ্টায় লোডশেডিং করতেই হচ্ছে।
সিরাজগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ২-এর জেনারেল ম্যানেজার প্রকৌশলী মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ বলেন, তার এলাকায় ৪৬ শতাংশ লোডশেডিং হচ্ছে। তার এলাকার চাহিদা ১০৩ মেগাওয়াট, পাচ্ছেন ৫৬ মেগাওয়াট। তাহলে তো কিছুটা ভালো তার এলাকার পরিস্থিতি এমন প্রশ্নে বলেন, কোথায় ভালো। প্রায় ৫০ ভাগের কাছাকাছি কি লোডশেডিং কি ভালো, তিনিই উল্টো প্রশ্ন ছুড়ে দেন। সাধারণত পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলো উপজেলা সদর এবং গ্রামে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে।
শহরের চিত্র খানিকটা আলাদা : রাজধানী ঢাকায় লোডশেডিং নেই বললেই চলে। কোথাও কোথাও কদাচিৎ বিদ্যুৎ গেলেও ফিরে আসে সারা দেশের তুলনায় ত্বরিত গতিতে। কোথাও ১০, ১৫ কিংবা আধা ঘণ্টার মধ্যে। তবে রাজধানীর বিতরণ এলাকা বড় হওয়াতে এলাকাভেদে ১৫ মিনিট করে লোডশেডিং করলে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ সাশ্রয় হয়। দিনে বা রাতে দুই-এক দফা ১৫ থেকে ৩০ মিনিট বিদ্যুৎ না থাকলে পরিস্থিতি খুব খারাপ বলে কেউ মনেও করে না। যদিও কোনো কারিগরি ত্রুটি ছাড়া পাঁচ মিনিটের বেশি বিদ্যুৎ না থাকাকেই লোডশেডিং বলে ধরা হয়।
রাজধানীর বাইরে যেসব বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি রয়েছে সেগুলোতেও মোটামুটি ভালো বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। সাধারণত বিভাগীয় শহর এবং জেলা সদরে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে এই কোম্পানিগুলো। রাজধানীতে দুটি, খুলনা এবং বরিশাল অঞ্চলের জেলাগুলোতে একটি, উত্তরাঞ্চলে একটি ছাড়া অন্য এলাকা এখনো পিডিবির দখলে রয়েছে।
খুলনা ও বরিশালের ২১ জেলায় বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি ওজোপাডিকোর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ সূত্র গতকাল বিকেলে জানায়, ৩ তারিখ সোমবার রাত ৯টায় ওজোপাডিকোর চাহিদা ছিল ৭০১ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ করা হয়েছে ৬২১ মেগাওয়াট। অর্থাৎ ওই সময়ে ৮০ মেগাওয়াট লোডশেডিং ছিল। আবার একই দিন রাত ১২টায় বিদ্যুৎ কোম্পানির চাহিদা ছিল ৫৪৫ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ ছিল ৩৯৯ মেগাওয়াট। লোডশেডিং ছিল ১৪৬ মেগাওয়াট।
উৎপাদনে হতশ্রী অবস্থা : দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা আছে ২৯ হাজার মেগাওয়াট। এর মধ্যে ১৬ হাজার মেগাওয়াট চাহিদা উঠলেই সামাল দিতে পারে না বিদ্যুৎ বিভাগ। স্বাভাবিক সময়ে সাধারণত ৫ থেকে সাড়ে ৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ গ্যাস থেকে উৎপাদন করা হয়। কিন্তু এখন তা কমিয়ে সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াটে নামানো হয়েছে। দেশে গ্যাস না থাকলে তেল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। কিন্তু মঙ্গলবার বিকেল ৩টায় দেখা গেছে তেল দিয়ে ১ হাজার ৮৯৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে।
তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের বেশিরভাগই বেসরকারি। সরকার তেলের দাম আলাদা এবং ক্যাপাসিটি পেমেন্ট আলাদা পরিশোধ করে। সব মিলিয়ে বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানির মালিকরা এখন ২৫ হাজার কোটি টাকা পাবে সরকারের কাছে। সংকটময় পরিস্থিতিতে সরকার বিদ্যুৎ চাইলে উদ্যোক্তারা বকেয়া পরিশোধ করতে বলছে। এতে করে চাইলেই বকেয়া পরিশোধ না করে সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে পারছে না।
গ্যাসের লাইন ক্রমেই লম্বা হচ্ছে : গ্যাস সংকটে রাজধানীর নিম্ন আয়ের সিএনজি চালকরা ভয়াবহ বিপদে পড়েছে। প্রত্যেকটি সিএনজি স্টেশনের বাইরে ক্রমেই লাইন দীর্ঘ হচ্ছে। একবার গ্যাসের লাইনে দাঁড়ালে কেটে যাচ্ছে দুই ঘণ্টা। সেই হিসেবে দুইবার সিএনজির লাইনে দাঁড়ালে ৪ ঘণ্টা সময় নষ্ট হচ্ছে।
রাজধানীর হাজীপাড়া সিএনজি স্টেশনের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা সিএনজি চালক মো. হাজেম জানান, তিনি অনেক দিন ধরেই রাজধানীতে সিএনজি চালান। কিন্তু এমন সংকট এর আগে কোনো দিন দেখেননি। একবার গ্যাস নিতে এলেই দুই ঘণ্টা বসে থাকতে হচ্ছে। একবার গ্যাস নিলে ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা সিএনজি চালানো যায়। প্রতিদিন যদি কেউ আট ঘণ্টা চালাতে চায় তাহলে তার দুবার গ্যাস নিতে এলে ৪ ঘণ্টা সময় ব্যয় হচ্ছে। তিনি বলেন, সারা দিন চালিয়ে জমা ওঠানো কঠিন। নিজের পকেটে থাকে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা।
একই কথা জানালেন, রংপুরের এমদাদ এবং জামালপুরের আব্দুর রহিম। তারা জানান, কোনেভাবেই এখন সংসার চলছে না। গ্যাস নিতেই দিন পার হয়ে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও গ্যাস নিতে আবার বাড়তি অর্থও দিতে হচ্ছে সিএনজি স্টেশনের কর্মীদের।
আজ চালু হতে পারে এলএনজি টার্মিনাল : মঙ্গলবারের মধ্যে এলএনজি টার্মিনাল উৎপাদনে আসবে বলে আরপিজিসিএলের পক্ষ থেকে আগেই জানানো হয়েছিল। কিন্তু সেদিন সারা দিনেও টার্মিনালটি উৎপাদনে আসার মতো পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি আরপিজিসিএলের চট্টগ্রাম কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, মঙ্গলবার সম্ভব হয়নি। বুধবার রাতে টার্মিনালটি চালু হতে পারে বলে জানান তিনি।
